ছোটোমামার কত ছোটো আমার রাঙা মাসি। শাড়ি পরে। মেয়েরা বড়ো হলে ফ্রক পরে না। বড়োরা খারাপ পায় এতে। এত সুন্দরের মধ্যে ওটুকু খুঁত থাকবে কেন ভাবতেই কেন যেন বলে ফেললাম, তোমরা ফ্রক পর কেন? শাড়ি পরতে পার না!
রাণী আমাকে আবার জাপ্টে ধরতে এল। চুকচুক করল ঠোঁটে। বলল, হ্যাঁ পরি। রাতে পরি।
ভারি তাজ্জব কথা। রাতে শাড়ি পরে দিনে পরে না। ভ্যাবলুর মতো তাকিয়ে বললাম, রাতে শাড়ি পর কেন!
আবার খিলখিল হাসি দু-বোনের। ছোটোমামা পাশে হাঁটছে। রাণী ভবানী এমনই মামা যেন জানে। রাণী বলল, আয় পরিজ খাবি। বলে ভিতরে নিয়ে গেলে আরও বিস্ময়। ঘরের টেবিলে ফুলদানি। তাতে রজনীগন্ধা গুচ্ছ। জানালায় ভেলভেটের পর্দা। যেদিকে তাকাই সর্বত্র ছবির মতো এক সৌন্দর্য খেলা করে বেড়াচ্ছে। পরিজ কি জানি না। এত খাবার খেয়েছি পরিজ খাইনি কেন—এসব মনে হচ্ছিল। আর সেই বনটার ভিতর এই দুই মেয়ে ঘুরে বেড়ালে পৃথিবীর কোনো গোপন রহস্য ধরা পড়ে যায় এমন মনে হবার সময় দেখলাম, ভবানী তার মাকে ডেকে নিয়ে আসছে। চা-পরিজ কেক। একেবারে ভিনদেশি খাবার। লজ্জায় খেতে পারছিলাম না। আমার পায়ে জুতো নেই। শুধু হাফশার্ট-হ্যাফপ্যান্ট পরনে। কেমন এক অপরিচিত পৃথিবীতে ঢুকে কেবল বিস্ময়ের পর বিস্ময়ের সম্মুখীন হচ্ছি। হঠাৎ আমার কী হল জানি না, সহসা দৌড়ে ছুটে পালালাম। রাণী চিৎকার করে বলল, কী রে কী হল! কোথায় যাচ্ছিস! আমি বললাম, বাড়ি। আবার শুনতে পেলাম, যাস না বনটার মধ্যে দেখবি কে দাঁড়িয়ে আছে।
আমি বললাম, দুর্গাঠাকুরকে শাড়ি পরানো হবে দেখতে যাচ্ছি।
যাস না। বনটার মধ্যে তোকে দুর্গাঠাকুর দেখাব। তারপর বললে, খেতে দিলে না খেয়ে যেতে নেই।
তোমাদের বনটায় দুর্গাঠাকুর আছে!
থাকবে না। এমন সুন্দর বনে ঠাকুর-দেবতারাই তো থাকে।
বনের মধ্যে ঢুকে আমারও একথা মনে হয়েছিল। শিউলি ফুলের গন্ধে চারপাশ ম ম করছে। সকালবেলায় শিউলি ফুল সাদা হয়ে শতরঞ্চের মতো সেজে থাকে। ভাবলাম মহালয়ার দিন এখান থেকেই ফুল চুরি করে নিয়ে যাব। আর মহালয়ার দিন রাত থাকতে আমরা ক-ভাই বোন মিলে গেছিলাম সেই শিউলি গাছগুলোর নীচে ফুল তুলতে। আশ্চর্য আবছা অন্ধকারে দেখলাম বিরাট এক জন্তুর পিঠে পা দিয়ে এক দেবী শিউলি গাছে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। অস্পষ্ট আঁধারে মোমের মতো যেন জ্বলছিল দেবী। আমরা কাছে যেতে সাহস পাইনি। ফুল না নিয়েই দৌড়ে পালিয়েছিলাম। সেই আমার প্রথম ও শেষ সাক্ষাৎ দেবী দর্শন। তারপর সারাজীবন মণ্ডপে মণ্ডপে ঘুরেও আর তার দেখা পাইনি।
নিজের দেশে ম্যান্ডেলা
যেন কতকাল হয়ে গেল, ম্যান্ডেলা ঘরবাড়ি ছেড়ে কেবল আকাশে উড়ে বেড়াচ্ছে। পাঁচ-সাত দিনও হয়নি তবু কেন যে মনে হয় কত কাল। বেশিদিন সে তার মাকে ছেড়ে থাকতে পারে না। এটাই হয়েছে তার ভারি জ্বালা। মা ঠিক ছটফট করছে। আবার উধাও মেয়েটা! যায় কোথায়! সে যে তার নিখোঁজ বাবাকে খুঁজতে বের হয়ে কত দেশে চলে যায়, তা মা কিংবা বুচার মামা বিশ্বাস করবে কেন! সে বলেও না কিছু। চুপচাপ থাকে। আগে হম্বিতম্বি হত। পুলিশ থেকে শহরের বড়ো বড়ো কাগজগুলিতে তার নিখোঁজ হবার খবর চলে যেত। সে ফিরে এলেই, হাজার প্রশ্ন। কোথায় গেছিলে, কে তোমাকে নিয়ে গেছিল? কোনো দুষ্টচক্রের পাল্লায় পড়ে যে সে ঘর ছেড়ে চলে যাচ্ছে না, তাই বা বিশ্বাস করবে না কেন তারা।
আর তখন এক কথা, জানি না।
কোথায় গা ঢাকা দিয়েছিলে, জান না।
না জানি না।
আরে বলছ কি, তুমি বাচ্চা মেয়ে, বোঝ না—তোমার পক্ষে কোথাও এতদিন পালিয়ে থাকা সম্ভব নয়।
ম্যান্ডেলা সাড়া দিত না। করুক না বকবক, কতক্ষণ করতে পারে দেখা যাক। তবে এবারে বেশ কদিন সে ঘরছাড়া। উড়তে শুরু করলে তার এই হয়। ঘরবাড়ির কথা মনে থাকে না, মা-র কথা মনে থাকে না, এমনকী বুচার মামা যে তার এই বাঁদরামিতে ক্ষিপ্ত হয়ে থাকে তাও সে গ্রাহ্য করে না। উড়তে উড়তে সে সেবারে ফনের রাজত্বে ঢুকে গেছিল। সে না থাকলে মুম্বাটুকে যে পুড়িয়ে মারা হতো, কেউ বিশ্বাস করবে না। মা না, মামা না, কেউ না। আর এসব বলে সে তার সেই জাদুকরকে ছোটো করতে চায় না। জাদুকর তাকে পালকের টুপি না দিলে তার বাবাকে খুঁজে বের করাও মুশকিল। আর এমনভাবে ওড়ার আনন্দই বা সে পেত কোথায়!
সে তার বাবাকে খুঁজে বেড়াচ্ছে, বাবা না থাকলে কেউ থাকে না, এরা বুঝবে কী করে। জাহাজডুবি যে কোথায় হল, এটাই সে বুঝতে পারছে না। জাহাজ তলিয়ে গেলেও বোট থাকে জাহাজে-বাবা যে বোটে ভেসে পড়েনি কে বলবে! কোনো দ্বীপে কিংবা অরণ্যে বাবা তার বেঁচে আছে, কারণ মানুষের জন্য ঈশ্বর সর্বত্র বেঁচে থাকার ব্যবস্থা করে রেখেছেন। তার সেই বুড়ো হানসের কথাও মনে হয়। মানুষটা নির্জন দ্বীপে কতকাল কাটিয়ে দিল—সেই কবে সারা পৃথিবী জুড়ে যুদ্ধ হয়েছিল, হানস ছিল একজন সৈনিক—সে যুদ্ধজাহাজ থেকে পালিয়ে একটা দ্বীপে উঠে গেছিল। পালিয়ে না, জাহাজটা ডুবে যাচ্ছিল—কী যে খবর, সে আর এখন মনে করতে পারছে না। উড়তে উড়তে কোনো নির্জন দ্বীপে কেউ চুপচাপ বালুবেলায় দাঁড়িয়ে আছে দেখতে পেলে কার না বিশ্বাস হবে, নিশ্চয়ই সেই নিখোঁজ মানুষটি, সমুদ্রের ধারে দাঁড়িয়ে তার ছোট্ট মেয়ে ম্যান্ডেলার কথা ভাবছে! কিংবা সমুদ্রের কোথাও যদি কোনো জাহাজ কিংবা জেলে নৌকার সন্ধান পাওয়া যায়, সেই আশাতেও মানুষটা দাঁড়িয়ে থাকতে পারে।
