ছোটোমামা বললেন, বিকেলে নিয়ে যাব। রেডি থাকিস। আর তখনই রাঙামাসি বলল, ঠাকুরের শাড়ি পরানো হবে, দেখবি না। বড়ো দোটানায় পড়া গেল। রং তুলি সব এনে সকাল থেকেই জড় করেছে নবীন আচার্য। যে ক-দিন ঠাকুর বানায়, নবীন আচার্য কারো হাতে খায় না। মণ্ডপের এক পাশে পেতলের হাঁড়িতে আতপ চালের ভাত, ঘি আর সেদ্ধ। নবীন আচার্যের ছেলেই ফুটিয়ে দেয়। বাপ-বেটায় খায়। আজ নাকি তাও হবে না। উপবাস। তিনটে দিন প্রতিমা তৈরিতে বড়ো সতর্ক থাকতে হয়। এক শাড়ি পরানোর দিন, দুই, চক্ষুদানের দিন এবং তিন, গর্জন লেপার সময়। নিয়ম অনিয়ম বলে কথা। কোথায় কখন খাঁড়া আটকে যাবে অনিয়মে সেই ভয়ে তটস্থ সবাই।
ছোটোমামাকে বললাম, শাড়ি পরানো হবে, দেখব না?
তবে তাই দেখ। আমি কিন্তু আর নিয়ে যেতে পারব না। সময় হবে না।
অগত্যা আর কী করা! বিকালেই ছোটোমামার সঙ্গে কবিরাজমামার বাড়ির দিকে হাঁটা দিলাম। মামা বললেন, ঘাবড়ে যাস না। শহরে থাকলে এমনই হয়।
এসব কথা কেন! শহরে থাকলে কী হয়? প্রশ্ন করলাম। আর কারা শহরে থাকে তাও জানতে চাইলাম।
মামা বললেন, কবিরাজদার দুই মেয়ে রাণী ভবানী। শহরে মামাবাড়িতে মানুষ। বাড়িতে জুতো পরে থাকে। ফ্রক গায়ে দেয়। সাদা ফ্রক। আমার দাদুর কথা তুলে বললেন, জানিস ত বাবা আমার সেকেলে। এসব পছন্দ করেন না। ফ্রক পরা দেখে কবিরাজদাকে ডেকে পাঠিয়েছিলেন। এটা ঠিক না হরিপদ। তোর মেয়েরা বড়ো হয়েছে। ফ্রক পরা ঠিক না।
দাদু আমার বড়ো রক্ষণশীল মানুষ জানি। কত বড়ো হলে ফ্রক পরতে হয় না এটি আমার তখনো ভালো জানা নেই। এসব নিয়েই বোধ হয় রেষারেষি আছে দুই পরিবারের মধ্যে। কিংবা হরিপদ কবিরাজ দাদুর চেয়েও প্রভাবশালী হয়ে যাচ্ছেন বলে বোধ হয় ভেতরে টান ধরেছে। সে যাহোক,-যেতে যেতে আবার মামা বললেন, জানিস ত মেয়ে দুটো বেড-টি খায়।
বেড-টি? সে আবার কী?
আরে সকালে উঠেই চা খায়।
চা খায়! বল কী মামা! বিস্ময়ে হতভম্ব! দাদুর এত পয়সা, কই চা হয় না তো! সকালে কলা মুড়ি দুধ, ছোটোরা ঘি ভাত আর কৈ মাছ ভাজা আলুসেদ্ধ না হয় পটল ঝিঙে সেদ্ধ। নরম সুগন্ধ আতপ চালের ভাত আর ঘি সে বড়ো সুস্বাদু আহার। এ-সব ফেলে চা খায়! তাও ওরা ছেলে নয়। ছেলে হলে অনেক কিছু মানিয়ে যায়। মেয়ে হয়ে এত বড়ো নেশা করে।
বললাম, কবিরাজমামা কিছু বলে না?
জানিস না কবিরাজদাও চা খায়! দুপতারার বাজারের কৈলাস মুদি নারায়ণগঞ্জ থেকে ব্রুকবন্ডের প্যাকেট আনিয়ে দেয়।
সত্যি দেখছি, আমার কবিরাজমামার বিস্ময়ের অন্ত নেই। আর তখনই মামা বললেন, এসে গেছি। বনটার শুরু।
সত্যি বন বলা যায়। বড়ো বড়ো অর্জুন গাছ, চন্দন গোটার গাছ, হাতির শুড়ের গাছ, জায়ফল দারচিনি কি গাছ নেই। বনটার ভিতর দিয়ে যেতে যেতে মামা আমাকে গাছ চেনাচ্ছিলেন। একবার শুধু বললেন, ডালকুত্তা ঘুরছে না কেন! বনটার ভিতর দিয়ে যেতে গা আমার ছমছম করছিল—বাসক গাছের ঝোপ-আট দশটা বড়ো বড়ো শিউলি ফুলের গাছ, পাশে বিঘেখানেক জমি জুড়ে বাসক গাছের জঙ্গল, জায়ফল হরিতকীর গাছ সব প্রকাণ্ড প্রকাণ্ড। আর সব কাঠবেড়ালি এ-গাছ ও-গাছে। পাখপাখালি কত—কেমন এক তপোবনের মতো জঙ্গলের মধ্যে বাড়িটা উদ্ভাসিত হয়ে উঠলে আমার মুখে রা সরছিল না।
তারপরের দৃশ্যটা দেখে আরও মুহ্যমান অবস্থা। একটা লাল রঙের ঘোড়া, সবুজ লন, দুটো মেয়ে সাটিনের ফ্রক গায়ে দিয়ে ঘোড়া চড়া শিখছে। আমি আর হাঁটছি না। মামা ডাকলেন, এই আয়। দাঁড়িয়ে থাকলি কেন! আমি যে কেন দাঁড়িয়ে আছি মামা বুঝছে না। মেয়ে দুটো নীল রঙের চটি পরে আছে। কী লম্বা মেয়ে দুটো! টকটকে ফর্সা রং। ফ্রক গায়ে দিয়ে আছে যে বোঝাই যায় না। গায়ের রঙের সঙ্গে সাটিনের ফ্রক একেবারে মিশে গেছে। যেন ডানা লাগিয়ে দিলেই এক জোড়া পরি। পরিরা এমনই হয় বোধ হয়। নাকি দাদুর কথাই ঠিক। হরিপদ কবিরাজের বনটায় পরি ঘুরে বেড়ায়। সেখানে ছেলে ছোকরাদের ঘোরাঘুরি ঠিক নয়।
মামাকে দেখেই ওরা দৌড়ে এল। কীরে বোধাদিত্য, তুই!
মামা বললেন, আমার সেজ ভাগ্নে। তোদের বাড়িটা দেখতে এয়েছে।
তাই নাকি আয় আয় বলে আমাকে জড়িয়ে ধরল। কী সুন্দর গন্ধ শরীরে। আমার বড়ো লজ্জা লাগছিল। নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ছুটতে চাইলাম। কিন্তু ছোটোটা আমার হাত খপ করে ধরে ফেলল। বলল, তোকে আর ছাড়ছি না। কি মিষ্টি দেখতে রে তুই! বুধ ভিতরে যাবি না? বসবি না? এত বড়ো মেয়েরা মামার সঙ্গে এভাবে কথা বলতে পারে আমার মাথায় আসে না। ছোটোমামা বলল, কুকুর দুটো দেখছি না।
ওদের এখন মেটিংয়ের সময়। আকবর ঘরে আটকে রেখেছে।
আমি বললাম, মামা মেটিং কী?
আমার কথা শুনে রাণী ভবানী খিলখিল করে হাসতে থাকল।
মামা মেটিং বিষয়টা আমাকে না বুঝিয়ে অন্য কথায় এলেন। চল দেখবি ভিতরে একটা প্রকাণ্ড শিংয়ালা রামছাগল আছে।
রাণী বলল, সজারু দেখবি?
এত কিছু আছে বাড়িটাতে জানিই না। সজারু দিয়ে কী হয়! বড় শিংয়ালা রামছাগল দিয়ে কী হয় কিছুই জানা নেই।
বললাম, তোমরা ওগুলো রাখ কেন!
বারে, বাবার ওষুধে লাগে। কবিরাজি তেলে ওদের চর্বি দরকার হয়।
বাড়িটা সত্যি ছবির মতো। লাল ইটের দালান। সামনে বড়োলন। দাগ কাটা চুন দেওয়া। ব্যাডমিন্টন খেলার জায়গা। পাশে ডিসপেন্সারি। বারান্দায় অতিকায় সব উদূখল। বড়ো বড়ো শীতলপাটিতে গাছের শেকড় ছাল সব শুকানো হচ্ছে। একজন লোক উবু হয়ে হামানদিস্তায় ছাল শেকড়বাকড় গুঁড়ো করছে।
