হরিপদ কবিরাজ আমাদের গাঁয়ে বছরে, দুবার আসত। গ্রীষ্মে ঘোড়ায় চড়ে, বর্ষায় নৌকো করে। নৌকোয় দুজন মাঝি। কাঠের পাটাতনের উপর ছোটো জানালা দেওয়া কাঠের ঘর। জানালাটি আরও ছোটো। ভিতরে ইজিচেয়ার, তাতে তার কাজের শেষে বিশ্রাম। একপাশে আলমারি। তাতে কাচের সব বোয়েম। চ্যবনপ্রাশ থেকে ভাস্কর লবণ সব সাজানো। ঝড়জলে কবিরাজের ছোট্ট ময়ূরপঙ্খী নৌকো নদীর জলে ভেসে যাচ্ছে। ঘাটে ঘাটে নৌকো ভিড়িয়ে ওষুধ ও রুগীর খোঁজখবর, পথ্য সব ফিরি করে আবার যাত্রা। নৌকোতেই খাওয়াদাওয়া, ঘুম। মাস দু-মাসের জন্য কখনো পুরো বর্ষাকালটাই বাড়ির বাইরে। সারা পরগনা জুড়ে তার এই ওষুধ ফিরি।
ঘাটে নৌকো বাঁধলেই খবর হয়ে যায়, এসেছে। আমাদের কাজ ছিল তখন বাড়ি বাড়ি খবর পৌঁছে দেওয়া। ছোটোকাকা কবিরাজমামাকে বৈঠকখানায় নিয়ে বসাতেন। সাদা ফরাসে তিনি পদ্মাসনে বসে কার কী অসুখ, কী পথ্য হবে, ওষুধের বড়ির সঙ্গে কী অনুপান হবে, সব বলে দিতেন। নাড়ি দেখতেন চোখ বুজে। একটা লোক এলে গাঁয়ের সব রোগ-শোক-জরা কেমন নিমেষে উধাও হয়ে যেত। যারা মরে যাবে কথা ছিল, তারাও হরিপদ কবিরাজের নাম শুনে বিছানায় উঠে বসত। সাক্ষাৎ ধন্বন্তরি। আমাদের নিজের চোখে দেখা, হরিগোপালের বাবাকে তুলসীতলায় রাখা হয়েছে। হেঁচকি উঠছে। ওটা শেষ হলেই ব্রহ্মপুত্রের পাড়ে নিয়ে যাওয়া হবে। কানে কানে কে বলল, হরিপদ কবিরাজ এয়েছেন। সঙ্গে সঙ্গে কাজ। হেঁচকি বন্ধ হয়ে গেল।
এমন ধন্বন্তরি আমরাই দেখেছি। নৌকোটি চলে যাবার সময় শেষবারের মতো ধন্বন্তরির পরামর্শ। ঘাটে ভিড়। হরিপদ কবিরাজ কী গাছের কোনো মূলে সঞ্জীবনী সুধা আছে, তার খবর দিয়ে যেতেন। বলতেন, ঈশ্বর অসুখবিসুখ দিয়েছে, তার নিরাময়ের ব্যবস্থায় রেখেছেন সব তরুলতা, লতাগুল্ম। যা শুধু মাটিতেই জন্মায়। মধু খেতে বলতেন বয়স্কদের। মধু নাকি রক্ত উষ্ণ রাখতে ভারি সক্ষম। স্বর্ণসিন্দুর পুড়িয়া করে দিতেন বুড়োদের। দীর্ঘ জীবনলাভের এটা নাকি একটা মোক্ষম উপায়। দল বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকত সবাই। কিংবা আমাদের বৈঠকখানায় যে ক-দিন থাকতেন, প্রায় মেলা বসে যেত যেন। মানুষজন নৌকোয় আসছে। ঘাটে শুধু তখন নৌকো আর নৌকো। আর সেসব যে কত রকমের নৌকো। আমরা নৌকোয় উঠে লাফাতাম। একটা থেকে আর একটায় লাফিয়ে যেতাম। কবিরাজমামা বাড়িতে, জলে ডুবে গেলে ভয় নেই, আগুনে পুড়ে গেলে ভয় নেই। অসুখবিসুখ আমাদের বাড়িতে ঢুকতেই সাহস পাবে না। ফলে হরিপদ কবিরাজের মতো বিস্ময়কর মানুষ আর দুটো আছে পৃথিবীতে তখন আমাদের জানা ছিল না।
সেই কবিরাজমামার বাড়ি দেখার জন্য একবার বায়না ধরেছিলাম। পুজোর ছুটিতে মামাবাড়ি গেছি। ছোটোমামাকে বললাম, আমাকে কবিরাজমামার কাছে নিয়ে চলো। ছোটোমামা বললেন, বাড়ি নেই। ওষুধ ফিরি করতে বের হয়েছে শ্রাবণ মাসে। এখনো ফেরেননি। মহালয়ায় ফিরবেন। আমার ত বাড়িটা দেখার ইচ্ছে। মানুষটাকে ত দেখাই আছে। বললাম, চলো না মামা। দেখব। কেমন বাড়িতে থাকেন। এমন সুন্দর মানুষ আমার কবিরাজমামা, এমন বিস্ময়কর মানুষ আমার মামা, তার বাড়িটা না জানি কী! দাদু বললেন, যাবে তো, কিন্তু গিয়ে আবার আটকে না যাও। যা একখানা বাড়ি। হরিপদর নানারকমের গাছপালার বাই। ওটা ত বাড়ি না একখানা জঙ্গল। জঙ্গলে হারিয়ে গেলে খুঁজে পাওয়া যাবে না। দাদুর কথা শুনে আমার আরও কৌতূহল বেড়ে গেল। জঙ্গলে হারিয়ে যাবার ভয়েই হয়ত এতবার মামাবাড়ি এসেছি একবারও ছোটোমামা কবিরাজবাড়ির দিকে নিয়ে যায়নি। ছোটোমামাকে চেপে ধরলাম, চলো না মামা।
ছোটোমামা বললেন, মুশকিল। কামড়ে না দেয়!
কামড়ে দেবে কেন! বাঘ আছে জঙ্গলে।
বাঘই বলতে পারিস। দুটো ডালকুত্তা আছে। সারা বনটায় দাপাদাপি করে বেড়ায়। চোরের উৎপাত খুব। গাছপালা সব কে চুরি করে নিয়ে যায়। কত কষ্ট করে সব সংগ্রহ করা। কেউ গাছের ছাল তুলে নিয়ে যায়। ছাল দিয়ে সালসা বানালে পরমায়ু বাড়ে। পরমায়ু কার না বাড়াবার ইচ্ছে।
আমরা মামাবাড়ি এসেছি মহালয়ার আগে। মণ্ডপে দুর্গাঠাকুর বানাচ্ছে নবীন আচার্য আর তার ছেলে। খড়বিচলির কাজ কবেই শেষ। এক মেটের কাজও শেষ। দোমেটের কাজ চলছে। আসলে স্কুল ছুটি না হতেই মার সঙ্গে মামাবাড়ি আসার একটাই কারণ। মণ্ডপে ঠাকুর বানানো দেখার বড়ো কৌতূহল। আমরা সেজন্যে এবারে আগেই চলে এসেছিলাম। কত রকমের লোকজন আসছে। দিবাকরমামা দাদুর তালুকের আদায়পত্র করে। তাঁর সারাদিন ছোটাছুটি। আমরা ভাইবোনেরা দঙ্গল বেঁধে বসে থাকি মণ্ডপে। সাদা রং দেবার সময় হলেই নাওয়া-খাওয়ার কথা ভুলে যাই। একটা ঝুড়িতে ঠাকুরের মুণ্ডু সব আলগা করা। মুণ্ডু বসিয়ে দেবার দিন কাকভোরে উঠে পড়তাম। কী জানি যদি মুণ্ডু বসানো দেখা শেষ পর্যন্ত ভাগ্যে না জোটে।
বড়ো উঠোনের একপাশে দোতলা বাড়ি। উঠোনের পুবে আটচালা মণ্ডপ। পশ্চিমে চক-মেলানো টিনের চালাঘর। অতিথি অভ্যাগতরা এলে থাকে। দক্ষিণে একতলা বিশাল একখানা দালান। ওটার একটায় সাদা ফরাস পাতা। মাথায় ঝাড়লণ্ঠন। তাকিয়ায় হেলান দিয়ে দাদু বসে থাকেন। পাশের ঘরটা বৈঠকখানা। নানারকম টেবিল চেয়ার বাতিদান। সব মিলে এক আশ্চর্য আতরের গন্ধ। এত সব বিস্ময়ের মধ্যেই কেন যে কবিরাজমামার বাড়িটা দেখার শখ হল বুঝি না।
