সিট দখলের জন্য ছোটাছুটি শুরু হয়ে গেল। সে কোনদিকে যাবে তাই বুঝতে পারছে না। নিতাই না এলে সে যেতেও পারছে না। নিতাই এখানে এসেই তাকে খুঁজবে। সে ঠিক আসবে—তারপর ধীরেসুস্থে যে করেই হোক ট্রেনে ওঠা যাবে। তাড়াহুড়ো করে লাভ নেই। বসার জায়গা না পেলেও তার চলবে।
প্রীতি যেন তার ওপর আরও বেশি খেপে যাচ্ছে। ট্রেন ইন করছে, অথচ কোনও হুঁশ নেই, দাঁড়িয়েই আছে, তাঁকে আহাম্মকও ভাবতে পারে, ভাবুক, যা খুশি ভাবুক। সেও কেমন এক ধরনের মজা ভোগ করতে থাকল। ট্রেন ইন করছে, কামরায় ওঠার জন্য হুড়োহুড়ি মারামারি শুরু হয়ে গেছে। জানালা দিয়ে কেউ বাক্স, রুমাল, কাগজ যে যা পারছে ছুঁড়ে দিচ্ছে। প্রীতির আত্মীয়স্বজনরাও সামনের কামরায় উঠে গেল। কুকুরটাও লাফিয়ে কামরায় উঠে গেল, প্রীতির সেই যুবক চেঁচাচ্ছে–আরে উঠে এসো। দাঁড়িয়ে থাকলে কেন!
কিন্তু প্রীতি উঠছে না।
জহর কিছুটা যেন জয়লাভ করার স্পৃহাতে মরিয়া হয়ে উঠল।
আপনি উঠে পড়ন। আমার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবেন না। নিতাই এলেই আমি ঠিক উঠে পড়ব। আরে দাঁড়িয়ে থাকবেন কেন?
প্রীতি যে তার বোকামিতে খেপেই আছে আমার খুশি। তারপরই প্রীতি কেমন কিছুটা হাঁপিয়ে ওঠার মতো বলল, ট্রেন ছাড়তে দেরি নেই। এসো আমার সঙ্গে, প্রায় যেন জোর করে তাঁকে তাঁরা কামরায় তুলে নিয়ে যাবে। আর তখনই দাদা রে দাদা রে বলে কেউ ডাকতে ডাকতে এদিকে আসছে। সে বলল, নিতাই আসছে। আপনি উঠে পড়ান।
শিগগির চলে আয় দাদা। একেবারে জানালার ধারে সিট। সুটকেস রেখে এসেছি। পাশের লোককে বলে এসেছি, আমার দাদার সুটকেস। দাদা কলকাতা যাবে। নিতাইকে অনুসরণ করার আগে সে প্রীতির কাছে গেল—বলল, উঠে পড়ন, আর দাঁড়িয়ে থেকে কী হবে! ওই দেখুন ভেতর থেকে কুকুরটা গলা বাড়িয়ে আপনার জন্য ভুক-ভুক করছে। খুবই বিচলিত বোধ করছে–আমি যাই। নিতাই তাঁর দাদাকে নিয়ে ভিড়ের মধ্যে হারিয়ে গেল। প্রীতি কী করবে বুঝতে পারছে না। ক্ষোভে দুঃখে না অপমানে চোখ তাঁর সজল হয়ে উঠছে, তাও বুঝতে পারছে না। সে দাঁড়িয়ে আছে—একা।
দেবী দর্শন
আজকাল টের পাচ্ছি, জীবনের সব বিস্ময় কেমন ক্রমে হারিয়ে যাচ্ছে। কিছুই আর অসম্ভব মনে হয় না। অথবা মনে হয় না, এরপর আর কিছু থাকতে পারে না। অহরহ পৃথিবীটা বদলাচ্ছে। আজ যেখানে দাঁড়িয়ে আছি, কাল সেখানে নেই। এক জীবনে মানুষ সব পায়, আর এক জীবনে সে সব হারাতে থাকে। টের পাই আমার হারাবার পালা বুঝি শুরু হয়েছে। ভয় লাগে। নিজের মধ্যেই কে যেন কথা করে ওঠে, জীবন, জীবন রে!
তখন হাহাকার বাজে ভিতরে। শরতের নীল আকাশ, কাশফুলের ওড়াউড়ি, হেমন্তের মাঠ সব যেন বড়ো অর্থহীন। নিজের জানালায় বসে থাকলে আর একটা পৃথিবীর কথা মনে হয়। বড়ো আগেকার ছবি, যেন গত জন্মের ছবি। দূরে দেখতে পাই, কেউ সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। পেছনে আমরা।
এ সব সেকালের গ্রামবাংলার কথা। আমাদের স্মৃতির। শৈশবের কথা। আমাদের বড়ো হওয়ার কথা।
বাড়ি থেকে নামলেই ছিল গোপাট, দু-পাশে হিজলের গাছ। গ্রীষ্মের দুপুরে হিজলের নিবিড় ছায়ায় ঘাসের উপর কতদিন ঘুমিয়ে পড়েছি। কখনো দূর থেকে আসত গোপাল ডাক্তার। তার সাইকেলের ক্রিং ক্রিং ঘন্টিবাজনা শুনলে আমরা যে যেখানে থাকতাম জেগে যেতাম। হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালার মতো মনে হত তাকে। সাইকেলের ঘন্টির শব্দ আমাদের চঞ্চল করে তুলত। যতদূর সাইকেল যায় ততদূর আমরা ছুটি। গোপাল ডাক্তার আর তার সাইকেল গোপাট পার হয়ে নদীর পাড়ে হারিয়ে যেত।
যতক্ষণ দেখা যায় দেখেছি। ধীরে ধীরে অনেক দূরের আকাশের নীচে সাইকেলটা এবং গোপাল ডাক্তার। সাইকেল, গোপাল ডাক্তার ক্রমে ছোটো হতে হতে বিন্দুবৎ হয়ে যেত। চোখের উপর তখন নাচত সেই বিন্দু। আমরা বলতাম, এখনো দেখা যাচ্ছে। কেউ বলত, না, আর দেখা যাচ্ছে না। মিছে কথা। আমি বলতাম, হ্যাঁ দেখা যাচ্ছে। এই নিয়ে তারপর আমাদের মধ্যে মারামারি পর্যন্ত শুরু হয়ে যেত। ফেরার সময় মনে হত গোপাল ডাক্তার আমাদের সব নিয়ে চলে গেল। আমরা ভারি মনমরা হয়ে যেতাম।
আর আসত হরিপদ কবিরাজ। ঘোড়ার পিঠে চড়ে আসত। মাথায় সোলার হ্যাট। ধুতির নীচে শার্ট গোঁজা। ঘোড়ার দুপাশে দুটো পাসিংশো টিনের সুটকেস। তাতে সব ছোটো ছোটো শিশি। হলুদ লাল নীল সব বড়ি। তার আসার খবর পেলে দল বেঁধে পুকুরপাড়ে গিয়ে দাঁড়াতাম। উঁচু ঢিবির মতো জায়গায় উঠে কিংবা গাছের ডালে চড়ে চিৎকার—ওই আসছে।
বাড়ির সামনে যতদূর চোখ যায় ফসলের জমি গ্রীষ্মের উরাট হয়ে আছে। ওর ঘোড়া আসত উরাট জমিনের ধুলো উড়িয়ে। বল্লভদির মাঠে প্রথমে বিন্দুর মতো কাঁপত। তারপর দিগন্তে লাফাত একবার উপরে, একবার নীচে। পর্দায় যেন একটা কালো বিন্দু নাচানাচি করছে। তারপর বিন্দুটা ক্রমশ বড়ো হতে থাকত। যত কাছে এগিয়ে আসত, তত বিন্দুটা একসময় বড়ো হতে হতে হরিপদ ডাক্তার আর তার ঘোড়া হয়ে যেত। আমাদের এমন আবিষ্কারের কথা কোনো বইয়ে লেখা আছে কিনা আজও জানা নেই।
হরিপদ কবিরাজ আমার মামার বাড়ির লোক। সে গ্রীষ্মে বসন্তে তার ঘোড়া নিয়ে বের হত। দূর দূর গাঁয়ে চলে যেত। দশ ক্রোশ বিশ ক্রোশের মহল্লায় সে আর তার ঘোড়া। ঘোড়ার পিঠে বোঁচকাবুঁচকি। রুগীবাড়িতে স্নানাহার। গাঁয়ের কার কী অসুখ সবকিছু খবর নিয়ে ওষুধ দিয়ে স্নানাহার। কখনো রাত হলে নিশিযাপন। সকাল হলে সে আর তার ঘোড়া আবার বের হয়ে পড়ত।
