ট্রেন ফেল করবে কেন, সে বুঝতে পারছে না।
তখনই সুচারু এক মুখের বয়স্ক মহিলা ডাকছে, এই প্রীতি ওখানে কার সঙ্গে কথা বলছিস!
মেয়েটি সহজভাবেই জবাব দিল, জহরের সঙ্গে-গণরাজ কাগজে কাজ করে। আমাদের বাড়িতে কাকার কাছে আসে। কাগজের প্রেসবয়।
প্রীতি!
প্রীতিলতা—
নামটা মনে পড়েছে।
প্রীতিলতা সোম। সুযোগ পেয়ে যথেচ্ছ উপহাস প্রীতিলতার, সে প্রেসবয়, সে বেশি বোদ্ধা—একজন তৃতীয় শ্রেণির যাত্রীর পক্ষে যে এটা শোভা পায় না তাও আভাসে ইঙ্গিতে বলে দিল।
প্রীতি তাঁকে দেখেছে, সে তাঁকে দেখেনি। প্রীতিলতা তাঁকে বিলক্ষণ চেনে।
মেয়েটা যে কী! সে যখন প্রীতির এত চেনা, কবিতা তার হাতে দিলে কী ক্ষতি ছিল—মেয়েটা জানে না, কবিতা হোক, গল্প হোক কিংবা কোনও জঙ্গীপুর সংবাদদাতার লেখাও সে ঠিকঠাক করে দেয়—প্রীতির কাকা কিংবা মামা যেই দিক, শেষ পর্যন্ত লেখাঁটি তার হেফাজতেই চলে আসবে।
অবশ্য ভাবতে পারে তার কাকা শোভন সোম জেলার প্রভাবশালী মানুষ, কাগজের অন্যতম সম্পাদক শহরের বনেদি পরিবারের মেয়ে প্রীতি, তার পক্ষে এক চালচুলোহীন যুবকের হাতে কবিতা দেওয়া যে আদৌ শোভন নয়, প্রীতির দোষও দেওয়া যায় না, আর সে জানতও না, শোভনকাকার ভাইঝি প্রীতি জানলে সে কখনওই কবিতাটি ময়লার ঝুড়িতে ফেলে দিতে সাহস পেত না।
আশ্চর্য সেই মানুষটি। কবিতাটি কম্পোজে না দেওয়ায় বিন্দুমাত্র তিনি বিরক্ত হননি। বরং সে ঠিক কাজই করেছে, কাকার আচরণে এমনই মনে হয়েছিল তার, কেবল ফেরত দেবার কথা ছাড়া আর কোনও কথা হয়নি।
সে যথাসময়ে কবিতাটি শোভন সোমকে ফিরিয়েও দিয়েছিল—
কবিতার দুটো একটা লাইনও সে মনে করতে পারছে। কিছুটা অশ্লীলতার গন্ধ আছে বলেই কবিতার কিছুটা মনে করতে পারছে।
ঘুম আসছে না।
আসে না ঘুম।
আগুন জ্বলে শরীরে—
ভারী আগুনের ভিতর
থাকি বসে।
আমার শরীর আলগা
হয়, হয় বেদনার ঝুড়ি
সব খুলে নিলে আরাম
এবং শান্তি।
থাকে …
না আর মনে পড়ছে না।
আসলে কবিতাটিতে আছে মধ্যরাতে নারীর ঘুম ভেঙে গেলে যা হয়।
জল তেষ্টা পায়।
শরীর কোনও কারণে বিবশও হতে থাকে। ঘরে একা থাকলে যাবতীয় পোশাক-আসাকে আগুন ধরিয়ে বসে থাকার ইচ্ছে হয়, হয়তো। এবং কোনও নগ্নতার যে আভাস ছিল কবিতায়, সে তা বোঝে।
কবিতাটি ভালো কি মন্দ সে বিচার করার অধিকার যে তার নেই জহর ভালোই জানে। তবে একটি জেলার সংবাদপত্রে কবিতাটি ছেপে দিলে, জ্ঞানকাকা বিরক্ত হন যদি, কিংবা অহিকাকা, যেন কবিতাটি ছেপে দিলে সেও কম সেয়ানা নয় এমন সবাই ভাবতেই পারে।
অথবা জ্ঞানকাকা বলতেই পারেন, কাগজটায় ছাইপাঁশ কেন যে ছাপিস।
কিংবা নিরঞ্জনকাকাও বলতে পারেন, জহর কি আছে রে কবিতার। আমাকে বুঝিয়ে দে। তুই যে ছাপতে দিলি, তোর কি একবারও মনে হয়নি শ্যামাদা কাগজটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পড়েন। রক্ষণশীল মানুষ, কবিতাটি পড়লে তিনি বিরক্ত হতে পারেন।
জেলা কংগ্রেসের সভাপতি শ্যামাপদ ভট্টাচার্যকে সে অফিসে প্রায়ই দেখে থাকে। বড়োই দীর্ঘকায় মানুষ, এবং এমন সুপুরুষ সে জীবনে কমই দেখেছে। ঈগল পাখির মতো নাক তাঁর, আর গৌরবর্ণ এবং সে তাঁর বাড়িতেও গেছে। জেলায় সব গণ্যমান্য মানুষের ভিড়, এবং সে প্রায় চোরের মতো বাড়ির ভিতর ঢুকে যেত, যেন ধরা পড়লেই তাঁকে কৈফিয়ত দিতে হবে। পুত্রদেরও সে দেখে থাকে, সবাই প্রায় দীর্ঘকায় এবং শোভনকাকার বাড়ির মতো এ-বাড়িটায় ঢুকলেও প্রাচীন বনেদিয়ানার গন্ধ পায়।
এইসব কথা কেন যে দ্রুত সে ভেবে ফেলতে পারছে, আর চারপাশে খুঁজছে শয়তানটিকে। গাড়ি আসার সময় হয়ে যাচ্ছে। কোথায় যে গেল নিতাই! প্রীতি তাঁকে দেখে কিছুটা যেন মজা ভোগ করছে, তার এই অসহায় অবস্থা যেন কবিতাটি না ছাপার দুর্ভোগে পড়ে রয়েছে। সে কিছুটা সরেও গেছে, কিন্তু প্রীতির চোখ সে এড়াতে পারছে না। প্রীতির সঙ্গে তার আত্মীয়স্বজনও আছে-গাড়িতে তুলে দেবার জন্য সঙ্গে কাজের লোকেরও যে অভাব নেই—যেন এই প্ল্যাটফরমের সব যাত্রীরাই সোমবাড়ির মেয়েবউরা কলকাতায় যাচ্ছে বলে দর্শনীয় কোনও ঘটনার জন্ম দিচ্ছে।
সে বড়োই ফাঁপড়ে পড়ে গেল।
তখনই প্রীতি প্রায় চিৎকার করে বলল, আরে করছ কী, এটা তোমার দাঁড়াবার জায়গা নয়। ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড ক্লাস কামরা এখানে দাঁড়ায়। শিগগির পিছনে দিকে চলে যাও। দেখছ না হুড়মুড় করে সব ছুটছে। পেছনে ছুটে যাও। সামনের দিকেও ছুটতে পার। আচ্ছা একটা ক্যাবলাকান্ত—না পারা যায় না!
আসুক নিতাই। ক্ষোভে জহরের মেজাজ বিগড়ে গেছে। যেন নিতাইকে পেলে এই প্ল্যাটফর্মে ফেলেই একচোট পেটাবে। সে ক্যাবলাকান্ত! ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড ক্লাস কামরার সামনে তাঁর দাঁড়াবার অধিকার নেই।
ফার্স্ট ক্লাস সেকেন্ড ক্লাসের কামরাগুলি কোথায় থামে সে তাও জানে না। থার্ড ক্লাসের যাত্রী সে। থার্ড ক্লাসের যাত্রীর পক্ষে এর চেয়ে ভালো বোকামি বোধ হয় আর হয় না। সে গাড়ি ফেল করতে পারে, ভিড়ের ট্রেনে গাড়িতে ওঠাই কঠিন। প্রীতি তাঁকে তাড়া লাগাচ্ছে—আরে এখানে নয়, ওদিকে, পেছনে ছোটো। শিগগির ছোটো।
কবিতা তো অনেক দূরের ব্যাপার, থার্ড ক্লাসে ওঠার বিষয়টাই সে জানে না, সে যে খুবই অর্বাচিন আভাসে ইঙ্গিতে তাও বোধ হয় বুঝিয়ে দিতে চায়। আসলে এটা যে কত বড়ো অপমান নিতাই যদি বুঝত। তুই বুঝবি না, আমি একা থাকলে ঘাবড়ে যাই। ভিড়ের মধ্যে তুই হারিয়ে গেলি। আর সে তখনই দেখল দূরে সিগনালের ওপারে গাছপালার ভেতর দিয়ে রেলগাড়ি এগিয়ে আসছে। ইঞ্জিনের ধোঁয়া দেখা যাচ্ছে। এবং গাছপালার মধ্যে ধোঁয়া মিশে যাচ্ছে। বড়ো স্টেশন বলে গাড়িটা এখানে মিনিট দশেক দাঁড়ায়। কামরার ভিতর ঢুকতে না পারলেও দাঁড়িয়ে ঠিক চলে যেতে পারবে। সে যেন কিছুটা সাহস ফিরে পেল।
