সে ঘাড় গুঁজে গেটের ভেতর সাইকেল নিয়ে ঢুকে যেত।
তারপর বারান্দায় সাইকেল রেখে চুপি দিত।
তিনি আছেন।
সে বলত, কাকা আমি জহর।
এসো।
এই কবিতাটা কম্পোজে দেওয়া গেল না। কেন?
ও হয়নি কিছু।
তিনি তার মতামতকে অগ্রাহ্য করতে পারতেন, তবে হয়নি কিছু বোধ হয় বলা ঠিক হয়নি। কিছুটা যে বাড়াবাড়ি হয়ে গেছে সে তাও বুঝতে পেরেছিল। সব লেখাই সে একবার পড়ে দেখে। বানান ভুল থাকলে ঠিক করে দেয়। কিংবা গদ্য দুর্বল হলে সে তাতেও কলম চালায়। প্রাথমিক নির্বাচন বলতে গেলে সেই করে থাকে। তবে কবিতাটি ফেরত দেওয়া উচিত কাজ যে হয়নি, শোভন কাকার মুখ দেখেই সে টের পেরেছিল।
কী হল বোসো।
সে দাঁড়িয়েই ছিল।
যদি ছাপতেই দেওয়া না যায়, তবে তুমি কী করবে।
আসলে কাগজটা যে জেলার মুখপত্র, এবং খবর কম থাকলে, কিংবা বিজ্ঞাপন কম পেলে, গল্প কবিতাও মাঝে মাঝে ছেপে দেওয়া, জায়গা ভরাট করার জন্য, তিনি ভালোই জানেন। গল্প, কবিতা সেই দেখে থাকে। কাজেই তিনি তাকে যেন বাহবাই দিলেন, যে যা দেবে তাই ছাপাতে হবে তোমাকে কে বলেছে।
সেই।
ঠিক আছে কবিতাটি ফেলে দাওনি তা
আজ্ঞে না।
দিয়ে দেবে আমাকে। আমাকে দিল, কী করি! ওতো শুনেছি তোমাদের কলেজ ম্যাগাজিনেও লিখেছে। আমাকে পড়িয়েছে। ছন্দের মিলটিলও মন্দ না।
আপনি যদি বলেন, কমপোজে পাঠিয়ে দেব। খুবই কুণ্ঠিত চিত্তে কথাটা সেদিন সে না বলে পারেনি।
আরে না না। কবিতা বিষয়টাই আমার কাছে রাবিশ। যাকগে, প্রুফগুলো রেখে যাও।
তারপর তিনি ড্রয়ার টেনে দুটো লেখা বের করে বললেন, আমাদের জঙ্গীপুরের প্রতিনিধি লেখা দুটো পাঠিয়েছে। বের হবার সময় ফের মনে করিয়ে দিলেন, কবিতাটি ফেরত দিও। কবিতা বুঝলে না, যিনি লেখেন, তার মনে হয় ইহজন্মে আর এমনটি লেখা হয়নি। অত সোজা বলো, কবিতা লেখা—যত্তসব খেয়াল।
শোভন কাকার প্রাসাদতুল্য বাড়িটার একতলায় কেমন পাথরের মতো হিম ঠান্ডা। ঘরগুলো এত বড়ো, আর এত উঁচু ছাদ যে, সে একা ঢুকলে শরীর কেমন নিস্তেজ হয়ে পড়ত। কত উঁচু সেই সব বাড়িবরগা, লম্বা রডে পাখা ঝুলছে, সারা ঘরে দেওয়াল আলমারি, আর আলমারিগুলো বইয়ে ঠাসা। সবই আইনের বই, সোনার জলে বাঁধানো, কবেকার পুঁথিপত্র এবং বারান্দা ধরে এগিয়ে গেলে, কোথাও বড়ো বড়ো তৈলচিত্র—যেন শোভন সোমের একতলাটি কোনও বন্দি রাজকুমারের—যে পাথর হয়ে গেছে—কোনও সাড়াশব্দও পাওয়া যায় না। দু একজন কাজের লোকের দেখা পাওয়া যায়, তারা, দেয়াল কিংবা জানালা, মেঝে পরিষ্কার করছে, বাগানে দু-একজন মালিও দেখা যায়। কাজ করে যাওয়া নীরবে, একতলায় ঢুকলে তার এমনই মনে হত।
আর দোতলার দিকে অবশ্য সে চোখ তুলে তাকাত না।
কারণ সেখানে সব পরির মতো মেয়েদের মুখ দেখা যায়, এক সময় চারপাশে চিক ফেলা থাকত তাও বোঝা যায়। তবে সেই চিকের বাহার না থাকলেও নারীকণ্ঠে সরগরম হয়ে থাকে বারান্দা। কোথাও কেউ নাচছে, কেউ গাইছে, কেউ ছুটছে।
তার যে কৌতূহল নেই বলা যাবে না।
তবে সে দোতলার দিকে চোখ তুলে কখনও দেখে না।
কে দৌড়ায়, কে সিঁড়ি ধরে লাফিয়ে নামে দেখা তার কখনও হয় না।
চোখে চোখ পড়ে গেলে কী যে ভাববে!
সে বাড়িটায় গেলে সুন্দর ঘ্রাণ পায়।
শোভনকাকার ভাইঝি কি সেই কবি! মেলা ভাইঝি, সারাক্ষণ ওপরে কিচির মিচির শব্দ, শোভন কাকার দাদা-কাকাও থাকতে পারে, কাকিমা-দিদিমাও থাকতে পারে—মেলা ঘর, মেলা মানুষজন—আর ঠাকুর, চাকরতো আছেই—কোনও ঘরে ক্যারাম খেলা হচ্ছে, সে তাও টের পেত।
তার একবার বলার ইচ্ছে ছিল, তোমার নাম।
তোমার বলা কি ঠিক হবে।
প্রাসাদতুল্য বাড়িটার দোতলার মেয়েটির মুখ সে কখনও দেখেছে বলেও মনে করতে পারে না—আর যা হয়, বাড়ির মেয়েদের সবারই যেন নীলাভ চোখ দেখলে সব মেয়েদের একই রকমের মনে হয়।
জহর কত কিছু যে ভাবছে।
সারা প্ল্যাটফর্মের যাত্রীর এত ভিড়, অথচ এদিকটায় ফাঁকা কেন সে বুঝতে পারছে না।
গরমে সে হাসফাঁস করছিল।
কপালে ঘাম, সে নিতাইকে খুঁজছে। প্ল্যাটফরম টিকিট কাটতে এত সময় ত লাগার কথা না।
তখন আবার কথা শোনা গেল। কারণ উঁচু লম্বা মেয়েটি তার দিকে তাকিয়েই আছে।
তোমার সঙ্গে আর কেউ কি আছে?
জহর আছেও বলতে পারে, আবার নেইও বলতে পারে।
কী বলবে বুঝতে পারছে না।
তারপর অনেক কিছু ভেবে বলল, আছে।
সে কোথায়?
প্ল্যাটফরম টিকিট কাটতে গেছে।
গাড়ি আসারও ঘণ্টা পড়ে গেল।
তাই তো, কী যে করি!
এখানে দাঁড়ালে উঠবে কী করে! দেখছ না কী ভিড়!
তার বলার ইচ্ছে হল, তুমি উঠতে পারলে আমি কেন উঠতে পারব না।
মেয়েটি কী বুঝে কাকে ডাকল।
বেশ একজন মনোরম যুবক কাছে এসে বলল, একে চেন?
কে?
জহর সেন।
কী হবে তাঁকে দিয়ে। তাঁকে চিনে।
কিছু হবে না, আখেরে কাজে লাগতে পারে। গণরাজ কাগজের গল্প-কবিতা দ্যাখে। নিজেকে খুব বেশি বোদ্ধা ভাবে।
জহর বলল, আমি আসি।
সে কেমন ভর পেয়ে গেছে। তার উপর মেয়েটি কেন যে এত খাপ্পা হয়ে গেল, মেয়েটি গরমে যে কাহিল তাও বোঝা যায়, স্বল্পবাস এবং হালকা শাড়ি সায়া পরে দাঁড়িয়ে থাকায় অবশ্য সে কণ্ঠবার তাকে দেখার যে চেষ্টা করেনি, তা নয়, তবে এ-জন্য এত খাপ্পা হওয়ার কথাও না, মেয়েদের দিকে অসভ্যের মতো তাকিয়ে থাকলে রাগ হবারই কথা। সে যখন এইসব ভাবছিল, তখনই মেয়েটি বলল, যেই থাকুক, এখানে আর দাঁড়িয়ে থেকো না। ট্রেন ফেল করবে বলে দিলাম। বেশি বোদ্ধা হলে শেষে পস্তাতে হয়।
