এসব কারণে বসে যাওয়ার একটা অস্বস্তি থাকে—পুত্ররা তার রাজি হয়নি। বর্ষায় রাস্তা খাটাল হয়ে আছে বলে গাড়িতেও ছাড়তে রাজি হয়নি। এই সব দুর্গতির কথা ভেবেই পূর্ণ পুত্রদের আশ্বাস দিয়ে এসেছে, ট্রেনেই ভালো—ভিড়ও থাকবে না, শুয়ে-বসে-ঘুমিয়ে ট্রেনযাত্রা কাবার করে দেওয়া যাবে।
তবু দুর্গতি থাকলে কপালে কে খণ্ডায়। কাউন্টারে ফার্স্ট ক্লাসের টিকিই পাওয়া গেল না।
তখনই চাই চা।
থার্ড ক্লাস
জহর দাঁড়িয়েই আছে স্টেশনে। টিকিটের ঘণ্টাও পড়ে গেছে। লোকজন লাইন দিয়েছে টিকিট কাউন্টারে।
সে পকেট হাতড়ে টিকিট ঠিক জায়গায় রেখেছে কি না, যদি হারিয়ে যায়, এখানে ক্রসিং আছে, সব সময় কেমন এক সন্ত্রাস যেন তাকে তাড়া করছে। সে রেলে চড়েনি, রেলে তার কোথাও যাওয়া হয়নি। ভাঙা সাইকেল তার সম্বল।
কত লোকজন প্ল্যাটফরমে, ভিড় ঠেলে লোজন বের হয়ে আসছে, সে কাউকে চেনে না, একবারে অপরিচিত এক পৃথিবী যেন। সে যে এই প্ল্যাটফরমে একজন আগন্তুক, বুঝতেও তার কষ্ট হয় না। চায়ের স্টল পার হয়ে প্ল্যাটফরমে সামনের দিকে চলে গেলে ঠেলাঠেলি কম। বাক্সপ্যাটরাও মেলা, এমন সময় সুন্দর একটি ঘ্রাণও ভেসে এল, এক তরুণী প্রায় তার সামনে দাঁড়িয়ে, একটা অতিকার কুকুরের বকলস হাতে। চোখে কালো চশমা, তার চার পাশে যারা আছেন তারাও সবাই যেন সুমহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সে বুঝল, তার মতো একজন অকিঞ্চিৎকর মানুষ এখানে দাঁড়িয়ে থাকলে ধমক খেতে পারে—তার ভয়ই হচ্ছিল। অস্বস্তিও আছেই, সে একা, খুবই ব্যাজার মুখে সে যেন জায়গাটা থেকে পালাতে পারলে বাঁচে। কুকুরটা যে ভাবে জিভ বের করে হাহা করছে, হাত থেকে ছুটে গেলেই তার গলা কামড়ে ধরতে পারে।
নিতাই যে কোথায় গেল।
রেলের টিকিটেই মেলা পয়সা গেছে—দু টাকা দশ আনা—সোজা কথা। বাড়তি প্ল্যাটফরম টিকিট কে কাটে! প্ল্যাটফরম টিকিট কাটার কথা নিতাই-এর। প্ল্যাটফরম টিকিট কাটতে সে রাজি না।
তার এক কথা, আমি ঠিক বের হয়ে যাব। তুই ভাবিস না ত।
সে ট্রেনে ওঠার বিষয়ে কলেজ বন্ধুদের সঙ্গে পরামর্শ করতে পারত, তবে সে যে গাঁইয়া এমন প্রমাণিত হয়ে গেলে, সে শুধু নিজেকে খাটো করবে না, মা বাপও খাটো হয়ে যাবে। গরিব পিতামাতার সন্তান এটা যে সমাজ সংসারে কত বড়ো অপবাদ নিতাই বোঝেই না। জামা-প্যান্টের যা ছিরি, তাতে যে কেউ যেন নিতাইকে কান ধরে প্ল্যাটফরমের বাইরে বের করে দিতে পারে। গায়ে রিফিউজি গন্ধ থাকলেও হয়েই গেল, সেই ছেলে কিছুতেই প্ল্যাটফরম টিকিট কাটবে না। একতাল পয়সা বাঁচিয়ে ছোলা-মটর কিনে খেতে খেতে হাঁটতে হাঁটতে বাড়ি চলে যাবে। মাথায় নিশ্চয় তার এমন ফন্দি কাজ করছে।
যখন কিছুতেই রাজি না, জহর বলেছিল, দে, সুটকেস দে। ওটা আমি নিতে পারব। ট্রেন ঢুকলে তোকে প্ল্যাটফরমে থাকতে হবে না। যা বাড়ি যা।
কেন?
কেন কি আবার, হয় টিকিট কাটবি, নয়ত চলে যাবি। আমাকে রেলে চড়া তোকে আর শেখাতে হবে না। গাড়িতে আমি ঠিক উঠতে পারব। তুই যা। প্ল্যাটফরম টিকিট না কাটলে জানিস বাবুরা তোকে পুলিশে দেবে।
তুই যা বলার পরই তার কেন জানি মনে হল নিতাই চলে গেলে সে ভারি একা হয়ে যাবে।
গেল কোথায়!
সে চারপাশে খুঁজছে নিতাইকে।
নিতাই তার সুটকেস হাতে নিয়ে কোথায় যে ভিড়ের মধ্যে ঘুরছে।
এই ট্রেনটায় যে খুবই ভিড় হয় সে জানে। প্ল্যাটফরমের এ-মাথা ও-মাথা মানুষজনে গিজ গিজ করছে। অথচ প্ল্যাটফরমের এদিকটায় একেবারেই ফাঁকা। কিছু দামি বাকস-প্যাটরা সহ সেই তরুণী, এবং সাহেব সুবোর মতো কিছু ভারি সুপুরুষ দেখতে যাত্রী, মেয়েটির দিকে তাকালেই মনে হয় গোটা এলাকাটাই তাদের খাস তালুক। এদিকটা বুঝি কারও দাঁড়াবার কিংবা ঢোকবার নিয়ম নেই।
তখনই সেই তরুণী চশমা খুলে ইশারায় তাকে ডাকছে।
এইরে, খুবই বুঝি বেয়াদপি হয়ে গেছে, নিতাই যে কোথায় গেল! তার হতাশ চোখ মুখ, তারপরই দেখল কুকুরটা ছেড়ে দিয়ে তিনি এদিকেই এগিয়ে আসছেন। পরনে নীলরঙের লতাপাতা আঁকা পাতলা ফিনফিনে শাড়ি, গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে শরীর জুড়াবার পক্ষে যথেষ্ট, হাতকাটা ব্লাউজ এবং বগল তুললে, বগলের লোমও দেখা যায়, সে নিজেই কেন জানি এই অসভ্যতা পরিহার করার জন্য কিছুটা দূরে দূরে সরে দাঁড়াবার সময় শুনল, তুমি জহর না!
সে তাকায় না। কারণ তাকালে যেন সে আরও কুণ্ঠিত হয়ে পড়বে।
তুমি আমাদের বাড়িতে কাকার কাছে আসতে না?
সে ঠিক বুঝতে পারছে না, কে তার কাকা, কার কাছে সে যেত!
শোভন সোমকে চেন না! আমার কাকা, এখন দেখছি ভাজা মাছটি উলটে খেতে জান না।
তার কিছুটা হতভম্ব অবস্থায়। শোভন সোম, সে তো এলাহি বাড়ি, এলাহি প্রাসাদ
এখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? কোথায় যাবে?
আজ্ঞে গাড়িতে উঠব। গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে আছি। সে জানে তার পোশাক আসাকে ভালো না, সে গরিব বাবার ছেলে, এখানে দাঁড়াবার বোধ হয় হক নেই তার, অথচ মেয়েটি তাকে বেশ ভালোই চেনে, অথচ সে তাকে চেনে না, কোথায় দেখেছে, তাও বুঝতে পারছে না আর এমন সুন্দর মেয়েটা তাকে কেন যে চিনতে গেল আর এখানেই বা দেখা হওয়ার কী দরকার ছিল। ট্রেনে সঙ্গে সঙ্গে উঠতে না পারলে বসার জায়গা পাওয়া যাবে না মেয়েটা বোধহয় তাও টের পেয়ে গেছে। জেলা কংগ্রেসের মুখপত্র সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রেস বয় সে। শোভন সোম, করিম সাহেবের কাছে লেখালেখির সূত্রে প্রুফের কপি নিয়ে তাঁদের কাছে তাকে ঘোরাফেরা করতেই হয়। সে যায়, তবে প্রাসাদের মতো বিশাল দু মহলা বাড়িটায় কারা থাকে সে জানেই না। তার কৌতূহলও নেই। সে শোভন সোমের কাছে যায়, কাজ হয়ে গেলে চলে আসে। বাড়ির এক তলায় একটি বড়ো হলঘরে সে দেখেছে। সাদা মারবেলের টেবিলমাথার উপর ঝাড়লণ্ঠন, রিন রিন শব্দ, কিছু জালালি কবুতরের ওড়াওড়ি—আর ঘরটা এত বড়ো যে ঢুকলেই বুক হিম হয়ে যেত আর বাড়িটার উঠোনে বড়ো বড়ো টবে গোলাপ, জিনিয়া, সূর্যমুখী, টগর কত না ফুলের সমারোহ। আর তার মধ্যে কোন গাছে কী ফুল ফুটে থাকল দেখার সাহসই হত না।
