বাড়িতে গেলে শোরগোল পড়ে যায়। বড়দা আসছে।
দাদার বাথরুমের অসুবিধা, এখন আর সেই অসুবিধা নেই। দাদা তাকে গুচ্ছের টাকা হাতে ধরিয়ে দিয়েছিলেন। বাড়ির জন্য, যেমন মা-র ঘরটাই ধরা যাক। যা খরচ হবে, তার তিনগুণ দাদার কাছ থেকে সহজেই হাতিয়ে নেওয়া যায়। মাঝে মাঝে সে তার দাদাকে পাগলও ভাবে। বাবার তক্তপোশে শুয়ে এক-দু হপ্তা পার করে দিলে, দাদার নাকি পরমায়ু বেড়ে যায়। পৈতৃক ভিটার নামে মানুষ এমন পাগল হয়। পূর্ণ বোঝে এতে তার পোয়াবারো—তার সংসার খরচ দাদা এমনিতেই দেয়, বাড়ি এলে দু-হাতে টাকা খরচ করতে ভালোবাসে। পরমায়ু বৃদ্ধির তক্তপোশটা যে তার দুই পুত্র সুজন-কুজন বের করে দুফালা করে যার যার ঘরে তুলে নিয়ে গেছে, জ্যাঠা বুড়ো হয়ে গেছে, বাড়ি থেকে বের হওয়া নিষেধ, বাড়ি থেকে বের হলেও গাড়ি না হয় ট্যাক্সিতে—কেউ না কেউ সঙ্গে থাকতে হয়, জ্যাঠার মৃত্যুও ঘনিয়ে আসছে—এমনও ভাবতে পারে—বাড়ির যা কিছু যতটুকু দখল করা যায়। তারা দু-হাতে যা পারছে জ্যাঠার ঘরবাড়ি থেকে তুলে নিচ্ছে। জ্যাঠার এত টাকা খাবে কে। কাজেই পূর্ণর মন ভালো না। কোথায় রাখবে, কোথায় যে শুতে দেবে। দাদা ক্ষেপে গেলে তার যে সব যাবে।
এমন সব স্মৃতির মধ্যেই ট্রেনটা হুস করে স্টেশনে ঢুকে গেল—ওরে বাপস, পঙ্গপালের মতো উড়ে আসছে যেন। ট্রেনের দরজা-জানালায় ঝাঁপিয়ে পড়ছে সব। কারও হুস নেই এমন মনে হল মানবেন্দ্রর।
গাড়িটার একটাও জানালা নেই। লোহার শিক নেই। মাথার ওপর সব পাখা হাপিজ।
জানালা গলিয়ে দরজা ঠেলেঠুলে যে যার মতো গাড়ির ভেতর হুমড়ি খেয়ে পড়ছে। বাক্সপ্যাঁটরা ধপাস ধপাস ফেলছে। খালি সিট আর একটাও নেই। রক্ষা, সে জানালার ধারে, পূর্ণও জানালার ধারে। এদিকের জানালায় অবশ্য কাচ আছে–তাতেই যেটুকু রক্ষে।
বৃষ্টি ধরে আসায় পূর্ণ জানালার কাচ তুলে দিতেই মিষ্টি হাওয়া। যদিও খালি সিট নেই, তবু যে ট্রেনটা ফাঁকাই। কেউ দাঁড়িয়ে নেই। সরকারের ভারি সুবন্দোবস্ত। গোটা ট্রেনটা জনগণ হাপিজ করতে পারেনি প্রশাসন খুবই কড়া বলে।
আজকাল বয়েস হয়ে যাওয়ায়, সামান্য ভিড়েই হাঁসফাঁস লাগে। বড়োই অস্বস্তি হয়।
কী রে পূর্ণ, কী বুঝছিস।
কিছু ভাববেন না। আমার দায়িত্ব নেই। এই ট্রেনটায় ভিড় থাকে না। সামনের স্টেশনে দেখবেন খালি হয়ে যাবে কামরা।
এরা যে লোকাল যাত্রী দেখলেই বোঝা যায়। তবে লোকাল যাত্রী অনায়াসে বাক্সপ্যাঁটরা নিয়ে পাঁচ-সাত ঘণ্টা পার করে দেবে না, কে বলতে পারে। তারপরই মানবেন্দ্র ভাবল ট্রেনটায় একটা প্রথম শ্রেণির বগি আছে। খুব বেশি ভিড় দেখলে সেখানে না হয় উঠে যাওয়া যাবে।
পূর্ণ বলল, দাদা আপনি চিন্তা করবেন না তো–এরা অধিকাংশই বিনা টিকিটের যাত্রী—সবই সম্ভব, সবাইকে তো বেঁচে থাকতে হবে। যে টিকিট কাটতে পারে কাটুক, যে পারে না, তারও তো একটা উপায় রাখতে হবে।
তখনই মানবেন্দ্র দেখল পাশের বেঞ্চিতে, চার-পাঁচজন লোক একটা কাগজে উপুড় হয়ে কী দেখছে।
সে জানে কী দেখছে—সেই বিপ বিপ শব্দ। সকালেই কাগজটা দেখেছে, মঙ্গলগ্রহে প্রাণ আছে কী নেই-তার ছবি। মানুষ কত কিছু যে ভেবে রাখে, মানুষের জন্মহার খুবই দ্রুতগতির দিকে, এই শতাব্দীর শেষে হাগামোতার জন্যও বোধহয় এই গ্রহে ফাঁকা জায়গা পাওয়া যাবে না। অন্য কোনো গ্রহে বসতি স্থাপনের বন্দোবস্ত যদি করা যায়। ছবিটা দেখার কৌতূহল থাকবেই। গ্রহটির নাম নিয়েও কথাবার্তা হচ্ছে, কত দূরত্বে তাও তাদের কথাবার্তার বিষয়। অত দূরে মানুষের জন্য মহাকাশ ফেরি তৈরি থাকবে। চন্দ্রবিজয় হয়ে গেছে মানুষের এখন একমাত্র মঙ্গলবিজয় বাকি।
মানবেন্দ্রর কেন যে দীর্ঘশ্বাস উঠে এল, আর এক দুর্ভোগ। ট্রেনের বদলে মহাকাশ ফেরি—তখনো হয়ত পৈতৃক ভিটায় ফেরার জন্য হুড়োহুড়ি পড়ে যাবে।
সে না হয় ভিড়ে অসুবিধা হলে ফার্স্ট ক্লাসে পূর্ণকে নিয়ে গিয়ে বসবে, কিন্তু চেকার যদি রফা করতে চায়। সে যদি রফায় রাজি না হয়। চেকার বলতেই পারে সর্বত্রই রফা হচ্ছে, আপনার বেলায় ব্যতিক্রম হবে কেন সার। ট্রেনে বোধহয় চাপেন না।
খুব ভুল হয়ে গেল। টিকিট যথাযথভাবে কাটার এই ম্যানিয়া এই একবিংশ শতাব্দীতে থাকা উচিত কি না এও মনে হল তার। সে এত বড়ো লম্বা ট্রেনে একজন চেকারবাবুকেও দেখতে পাচ্ছে না। এত লম্বা ট্রেন, চেকারবিহীন হয়ে থাকলে মানাবে কেন!
আর এও মনে হল তার, পূর্ণর কথাই ঠিক—এরা গরিব মানুষ, গরিব মানুষের পয়সা কোথায়, টিকিট না-ই কাটতে পারে। সে যেতে যেতে হাইরাইজ বিল্ডিংও কম দেখছে না—আবার বস্তি অঞ্চলেও ভরে আছে চারপাশ। ট্রেনই সাধারণের যানবাহন।
ট্রেন চলছে ফের।
বেশ দুলুনি খাচ্ছে।
শহর গঞ্জ, ধানের মাঠ পার হয়ে যাচ্ছে। একটা ছোটো রেল ব্রিজও পার হয়ে গেল। দু-পাশের দৃশ্যাবলি না হলেও, একপাশের দৃশ্যাবলি ভালোই উপভোগ করা যাচ্ছিল। ট্রেনের গতিও বেড়েছে। এভাবে শেষ পর্যন্ত যেতে পারলে ট্রেনে যাওয়াই সুবিধা, বাসেও যাওয়া যেত—সরকারি বাস মেলা। উত্তরবঙ্গের যে-কোনো বাসে চাপলেই যাওয়া যায়। মুশকিল বয়েস হয়ে যাওয়ায় প্রস্ট্রেটে কিছু গণ্ডগোল দেখা দিয়েছে। ঘণ্টার ঘণ্টায় প্রস্রাব পায়। বাস তো বার বার দাঁড় করানো যায় না। বাস ছাড়লে টানা গতি পেয়ে যায়। সেই কৃষ্ণনগরে পনেরো মিনিটের হল্ট। আগে পিছে বাস দাঁড়ায় ঠিক, লোকও তুলে নেয়। ভিড় গেঞ্জামও থাকে, নেমে যে একটু হালকা হয়ে নেবে তারও উপায় থাকে না। বারবার কতবার বলা যায়, বাস থামাও বাপু।
