দুর্গা দুর্গা করে রওনা করিয়ে দেওয়া হল।
মেজপুত্র বলল, চন্দ্রনাথ, বাবাকে ছোটোকাকাকে গাড়ির কামরায় বসিয়ে ট্রেন ছাড়লে তবে ফিরবে।
আজ্ঞে ট্রেন ছাড়তে দেরি করলে!
ও ঠিক আছে, বড়োবউদির গাড়িতে চলে যাব। তুমি ঠিক চারটায় হাসপাতালে চলে যাবে।
শিয়ালদা স্টেশনে পৌঁছেই পূর্ণ কাউন্টারে গিয়ে জানতে পারল, ফার্স্ট ক্লাস বগি আছে, তবে টিকিট ইস্যু করা হয় না।
তা মান্ধাতা আমলের লাইন, লাইনের দুপাশে যত দূরেই যাও, ঘণ্টার পর ঘণ্টা, শুধু রিফুজি কলোনি—রিফুজিরা কখনো টিকিট কাটে না। এ লাইনটা চেকারবাবুদের স্বর্গরাজ্য লজঝড়ে ট্রেন, লজঝড়ে যাত্রী, টিকিট না কাটলেও অসুবিধা হওয়ার কথা না।
পূর্ণ আরও জানাল, অর্ডিনারি টিকিট কেটে প্রথম শ্রেণির বগিতে বসে পড়লেই হবে। চেকারবাবুর সঙ্গে পরে রফা করে নিতে হবে।
মানবেন্দ্র বলল, তার মানে।
পূর্ণ বুঝতে পারল, কথাটা শুনে দাদা বিগড়ে গেছে।
আসুন তো দেখা যাক না কী হয়, দুটো টিকিট কাটা আছে।
চন্দ্রনাথ বলল, বাবুর খুব অসুবিধা হবে।
পূৰ্ণর এক ধমক, আমার দাদা না, তোমার দাদা।
চন্দ্রনাথ জানে বড়োবাবু এই সব রফাটফা একদন পছন্দ করে না। শেষ পর্যন্ত ঠিক অর্ডিনারি কামরায় উঠে বসে থাকবে। যা একরোখা মানুষ।
পূর্ণ অভয় দিল, আরে খালি কামরা দেখে উঠলেই হবে। বসার জায়গার অসুবিধা হবে না। পাঁচ-সাত ঘণ্টা তো লাগবে। গাড়িটায় একদিন ভিড় হয় না। শুয়ে-বসে যাওয়ার কোনোই অসুবিধা হবে না। তুমি ভেব না চন্দ্রনাথ। বাড়িতে গিয়ে বলারও দরকার নেই।
আসলে পূর্ণ যে বাড়িতে আশ্বাস দিয়ে এসেছে পুত্রদের, তোরা চিন্তা করিস না। সাড়ে বারোটার গাড়িতে একটা ফার্স্ট ক্লাসের বগি দেয়। ওতে উঠে চলে যাব। এখন চন্দ্রনাথ যদি বাড়িতে গিয়ে বলে দেয় টিকিট পাওয়া গেল না, অর্ডিনারি ক্লাসে উঠেই চলে গেছেন, তা হলে আর এক বিপত্তি। বাবার যাতে অসুবিধা না হয়, সেই ভেবে কাকার হাতে গুচ্ছের টাকা ধরিয়ে দিয়েছে বড়োপুত্রটি।
হয়ত বাবুর পুত্ররা গাড়ি নিয়ে বের হয়ে ট্রেনের আগেই বাড়ি পৌঁছে যাবে। বাবাকে শেষ পর্যন্ত আস্ত নিয়ে নামাতে পারল কি না এমন আশঙ্কার উদ্রেক তাদের মনে হতেই পারে।
আর আশ্চর্য, ট্রেনে ওঠার মুখে দেখা গেল একদম ভিড় নেই। সাধারণ কামরাতেও শুয়ে-বসে যেন সহজেই গন্তব্যস্থলে পৌঁছানো যায়। এক ধারে সিট জানালা তুলে দিলে হাওয়া-বাতাসেরও অসুবিধা থাকল না। তবে বৃষ্টি শুরু হয়েছে। বর্ষাকালে বৃষ্টি থাকবে না হয় কী করে। এবং মনে হল, তার, ভারি আরাম, ট্রেন ভিজতে ভিজতে ছুটবে, তারা তার যাত্রী।
চন্দ্রনাথ উঠে এসে দেখে গেল।
পূর্ণ বলল, সারা রাস্তায় এরকমই থাকবে। ট্রেনটায় একদম ভিড় নেই। নিজ চোখে দেখে গ্যালে তো।
মানবেন্দ্র এবার চন্দ্রনাথকে এক ধমক লাগাল—কাজে ফাঁকি, যাও নামো, ওর হাসপাতালের দেরি হয়ে যাবে। বাড়িতে গিয়ে বলবে পূর্ণ আমাকে ফাঁকা গাড়িতে বেশ ভালোভাবেই নিয়ে যাচ্ছে। অযথা চিন্তা করতে বারণ করবে।
ট্রেন ছাড়ল।
ট্রেন ছুটছে।
বিধাননগর স্টেশন ধরল না।
তারপর দমদমের কাছাকাছি এসে থেমে গেল।
অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। ভালোই লাগছিল। এত স্বাধীনতা—নেমে বৃষ্টিতে ভিজলেও যেন হয়। তার আর যেন কোনো পিছুটান নেই।
পূর্ণ বলল, বৃষ্টি হয়ে ভালোই হল দাদা। কী বলেন?
কেন রে বৃষ্টি না হলে খুব খারাপ লাগত তোর।
আরে না, বুঝছেন না কেন। এমন ঘনঘোর বৃষ্টিতে বাড়ি থেকে কেউ বের হয়। দুর্যোগ মাথায় করে কার এত দায়। বের হওয়ার! খুব জরুরি কাজ থাকলে এক কথা।
তা অবশ্য ঠিক।
তারপরই মনে হল তার, ট্রেনটা চুপচাপ দাঁড়িয়ে বৃষ্টিতে ভিজলে যেতে দেরি হয়ে যাবে।
শেষে মানবেন্দ্র না বলে পারল না, কী রে পূর্ণ ট্রেন তো দেখছি শুরু থেকেই লেট করতে শুরু করল।
না, না, ঠিক শেষে মেকআপ করে দেবে, দ্যাখুন না—ভাগীরথীর পরেই এটা ভালো ট্রেন। আপনি তো ফার্স্ট ক্লাসে উঠলেন না। রফাটফায় আপনার বিশ্বাস নেই। দেখতেন কেউ হয়ত কোনো প্রশ্নই করত না। সারা রাস্তায় দেখবেন, এক দুজন চেকারবাবু যাও থাকবে—কেবল পালিয়ে বেড়াবে।
পালিয়ে বেড়াবে কেন?
আরে যাত্রীর মুখোমুখি পড়ে গেলেই টিকিট চাইতে হবে না। কাজের এত চাপ বাড়িয়ে কী দরকার—এমনিতেই সবাই যখন সব কিছু হাতের কাছে পৌঁছে দিচ্ছে।
তখন গাড়িটা নড়ে উঠল।
যাক চলছে—এমন ভাবল মানবেন্দ্র।
তখনই তার মনে হল, এভাবে বর্ষণে জানালার ধারে বসে থাকলে শৈশবের কথা স্মৃতির চূড়ায় ভেসে উঠবেই।
কী রে পূর্ণ তোর মনে পড়ে, বৃষ্টির দিনে আমরা ভাইবোনেরা বারান্দায় বসে কাঁঠালবীচি ভাজা খেতাম। মা বালিতে গরম গরম ভেজে দিত।
পূর্ণ বলল, বাবা বলতেন, কী সামান্য উপকরণ, অথচ আশ্চর্য সুস্বাদু খাবার।
সেই।
দুধকচু দিয়ে মুগের ডাল, মা-ও নেই, সেই রান্নাও নেই। আমাদের তখন কী অভাবের সংসার! বাবার উপার্জন নেই, এতগুলি মুখে অন্ন জোগানোই কঠিন। জমির ধান সম্বল। আর বাড়ির এখানে সেখানে লাউ, শশা, কুমড়ো তেঁড়স ফলনও হত। বাবার গাছ লাগানোর গুণই আলাদা।
আসলে এই সব স্মৃতিই এখনো তাকে দেশের বাড়িতে যাওয়ার জন্য পাগল করে দেয়। বাড়ির অখাদ্য খাবার খেয়ে অতিষ্ঠ হয়ে উঠলেই কেন যে মনে হয় দেশ থেকে ঘুরে আসা যাক। এখন তো আর একা যেতে পারেন না। কেউ না কেউ সঙ্গে থাকেই–
