বড়োপুত্রটি অফিস বের হওয়ায় সময় ইশারায় পূর্ণকে ভেতরে যেতে বলল। ভেতরে না, একেবারে বড়োপুত্রের এলাকায়। দাদা ছেলেদের জন্য প্রায় বলতে গেলে প্রাসাদ বানিয়ে রেখেছে। যে যার এলাকায় থাকে। তবে ঘরগুলি তার গুদামখানাই মনে হয়। বড়ো বড়ো সব স্টিলের আলমারি, টিভি, সেও বিশাল এক কোনায় কম্পিউটার, কী যে কাজে লাগে, সে বোঝে না। বড়োপুত্রটি তার বসার ঘরে নিয়ে কাকাকে বসাল।
কী বলছে?
কী আবার বলবে, জানই তো বাড়ি যাবার নামে পাগল। বড়োবউমার চিঠি পেয়েই তো ছুটে এসেছি, দাদা কাঁঠালবীচি সেদ্ধ খাবে। পাওয়া যায়নি।
খবরদার নিয়ে যাবেন না। হার্টের অবস্থা বিশেষ ভালো না। বাড়ি বাড়ি করে সবার মাথা খারাপ করছে। কোথায় বাবা স্কুলের প্রধানশিক্ষক ছিলেন, সেখানেও যাবেন বলছেন। আপনি আবার উসকে দেবেন না।
না, আমি এক পাগল! দাদার সব অভ্যাস বদলে গেছে। সুখী মানুষ, আর রাখবই বা কোথায়! আগে তবু মা-র ঘরটা ছিল, গত বছরের বন্যায় ঘরে জল ঢুকে গেছিল। ঘরটার বয়সও তো কম না। পঞ্চাশ-ষাট বছর তো হবেই। কিছু একটা হয়ে গেলে কেলেঙ্কারি।
পূর্ণ ফের বলল, কিন্তু দাদা যে বলছেন, তাঁর এখানে একদম ভালো লাগছে না। ছাঁইপাঁশ রান্না হয়, একদম মুখে দিতে পারেন না। তাঁকে কেউ গ্রাহ্য করে না। ব্রাত্য হয়ে গেছেন।
সে বলুকগে। আমিও বলেছি, বর্ষা পড়ুক, হরনাথ আপনাকে হিজলের রেল লাইন, অদুলার গুমটিঘর সব দেখিয়ে আনবে। মা মারা যাওয়ার পর থেকেই বায়না। কিছুতেই কোনো তীর্থভ্রমণে বের হবেন না। আমার শ্বশুরমশাই এত করে বললেন, চলুন বেয়াই দক্ষিণ ভারত ঘুরে আসি, কিছুতেই রাজি করাতে পারলেন না—তাঁর নাকি কোথাও গিয়ে ভালো লাগে না। হোটেলের খাবার সব অখাদ্য— আমরা বড়োই ফাঁপরে পড়ে গেছি। বলেছি গাড়িতে যাবেন, বাড়ি হয়ে ফিরবেন। অদুলার গুমটিঘরও দেখা হবে। সঙ্গে হরনাথ থাকবে, পূর্ণকাকা থাকবে।
পূর্ণ আশ্বাস দিল, সে তোমাদের ভাবতে হবে না। বুঝিয়ে দিলে কথা বুঝবেন।
বড়োপুত্রকে বড়োই অসহায় দেখাচ্ছিল।
বাবার বয়স হয়েছে, হার্টের অবস্থা ভালো না—কিছুই মানতে রাজি না। তাঁর এককথা, আসলে আমাকে তোমরা বাড়ি থেকে বের হতে দিতে চাও, না। আমার কিছু হয়নি। সবাই তোমরা বউমাদের কথায় নাচ।
যাইহোক, শেষ পর্যন্ত পূর্ণ তার দাদাকে সাময়িকভাবে নিবৃত্ত করতে পেরে খুশি।
আমি কথা দিচ্ছি দাদা, জ্যৈষ্ঠমাসের শেষাশেষি আমি আসব আপনার সাধের কাঁঠালবীচি সেদ্ধ আপনি খেতে পাবেন। বাড়িতে গিয়ে বললে, ঝুনুর মা সব ব্যবস্থা করে রাখযে।
শোন আমি কিন্তু কুমড়ো ফুলের বড়া খাব।
খাবেন।
বেলেমাছের চালকুমড়ো পাতার বড়া খাব।
খাবেন।
বাড়িতে কত রেসিপি হয়, হয় না বেগুন দিয়ে গিমাশাক। খেতে বড়োই সুস্বাদু বল। বাড়িতে যা চলছে, পাঁচ-সাতদিন থেকে যা তবেই বুঝতে পারবি।
চপকিয়া স্যালাড, নাম শুনেছিস?
আজ্ঞে না।
বুকিয়া স্যালাড। নাম শুনেছিস?
আজ্ঞে না।
জুকিনি?
না।
ফিস মুনিয়ের, গ্রিলড ফিস, লেমন রাইস-বউমারা রবিবার রাতে রেসিপি করবে, আর উর্ধ্ববাহু হয়ে নাচবে। এসব নাকি একজিকিউটিভ বুফে—বল মাথা ঠিক রাখা যায়। তোর মাথা ঠিক থাকত। ভারতীয়, কন্টিনেন্টাল, চাইনিজ। রবিবার আসে, আবার রবিবার চলে যায়। রবিবারের আতঙ্কে আমার ঘুম গেছে। বিশ্বায়ন বিশ্বায়ন বাইরে চলছে, সেটা যদি ঘরে ঢুকে যায়, ইচ্ছে হয় না পালাই।
তা তো ইচ্ছে হবেই।
তোর বউদি বেঁচে থাকত, দেখতাম মজা।
আমাদেরও কম রেসিপি নেই। কাসুন্দি দিয়ে রসুন সম্বারে নটেশাক কতকাল যে খাই না। কত বলেছি, আমার ভাইরা তো দেশে থাকে—গেলে কতরকমের রেসিপি।
বড়দা আজ লাউশাক করি।
লাউশাক। দারুণ, দারুণ, ভুলেই গেছি।
লাউচিংড়ি।
আমার মা বড়ি দিয়ে যা লাউচিংড়ি করত, ওই এক পদ দিয়েই এই থালা ভাত খাওয়া যায়। কোথায় যে গেল যে সব খাবার! বাড়িতে আমার, দুই পুত্রবধূ লাউ খায় না লাউ আসে না। মাগুরমাছ খায় না নাতিরা-বাড়িতে যা চলছে না।
পূর্ণ খুব হতাশ গলায় বলল, নাতিদের দোষ দিয়ে লাভ নেই দাদা। ঠাকুরের কৃপায় সংসারের কোনো অভাব নেই, শুধু জমছে। ওড়াতে না পারলে টাকার গায়ে ছাতা ধরে যাবে না। গরিবদের বাঁচতে হবে না।
মানবেন্দ্র বড়পুত্রকে ডেকে বলল, পূর্ণ আমাকে নিতে কবে আসবে বলে দাও।
আসবে, নিয়ে যাবে ঠিক।
আমি কিন্তু ট্রেনে যাব।
পূর্ণ বলল, কেন বাড়ির গাড়ি পাওয়া যাবে না?
দ্যাখ পূর্ণ, তুই আমার চেয়ে ভালো বুঝিস। বর্ষা থাকলে রাস্তাঘাটের কী অবস্থা হবে বুঝিস না। এই সেদিন এক ওয়গনার গ্যারেজে ঢুকেছে, নতুন গাড়ি, খানাখন্দে পড়ে গাড়ির বারোটা বাজুক আর কী।
বড়োপুত্র দরজার আড়াল থেকে ইশারায়, বাবার সব কথায় সায় দিয়ে যেতে বলল।
আসলে মানুষটি যে খুবই নিঃসঙ্গ, পুত্ররা বোঝে। এবং সেই কথামতে দিনও স্থির হয়ে গেল। পূর্ণ এলে বড়োপুত্র সাবধান করে দিল, সাবধানে নিয়ে যাবেন। মা না থাকায় আমাদের হয়েছে মুশকিল, একবগ্ন হয়ে গেল। মাথাও যেন কিছুটা বিগড়ে গেছে মনে হয়।
সব ঠিক হয়ে যাবে। কাঁঠালবীচি সেদ্ধ আর ক-ফোঁটা খাঁটি সরষের তেল দিয়ে ভাত পাতে পড়লেই সব ঠিক হয়ে যাবে। ভাবিস না।
তুলবেন কোথায়।
মেজদার বাড়িতে।
তাদের ছোটোকাকাটির পোশাক খুবই মলিন, টাকাপয়সা যে যায়, সেই টাকাপয়সায় ইচ্ছে করলেই ভালো জামাপ্যান্ট কিনে পরতে পারেন, তবে কিছুতেই পরবেন না, যদি বাবা মাসোহারা বন্ধ করে দেন—তুই তো ভালোই আছিস দেখছি। ফুটানি করতেও শিখে গেছিস—আর দাদার ঘাড়ে চেপে বসে থাকা কেন, তবেই হয়ে গেল।
