পূর্ণকাকা এল ঠিক, তবে কাঁঠালবীচি সংগ্রহ করতে পারেনি। গরম পড়ে গেছে চৈত্রমাস। দাদাকে বোঝ প্রবোধ দিয়ে বলেছে—আর দুটো মাস দাদা।
আমি তোর সঙ্গে যাব। আর এক বায়না।
পূর্ণকাকা না বলে পারেননি, ও-ঘরে থাকা যাবে না দাদা। গত বছরের বন্যায় মাটির দেওয়ালে বড়ো বড়ো ফাটল ধরেছে। সাপখোপেরও উৎপাত আছে। হুড়মুড় করে কখন ভেঙে পড়বে-ঘরটায় আপনার ভাইপোরা থাকত—এখন তারাও রাতে শুতে সাহস পাচ্ছে না।
আমার সঙ্গে কি সাপের শত্রুতা আছে। আমাকে কামড়াবে?
না, তা না।
আমরা আগে থাকিনি?
তা থেকেছি।
প্রথমবার তোর মনে নেই, রাতের বেলা, মধ্যরাতে, মনে আছে একটা বিশাল দুধ খরিস মেঝেতে ফস ফস করছিল। মনে নেই।
ওরে বাস, কতবড় সাপটা।
বাবা কী বললেন পূর্ণ?
মনে নেই দাদা।
তা মনে থাকবে কেন, টাকা নিতে আসার কথা তো ভুলে যায় না।
পূর্ণ জানে, দাদার ওই মুশকিল, দেবে, আবার খোঁটাও দেবে। পূর্ণ জানে, দাদার এটা ধাত। মাসোহারা নিতে হলে সহ্য করতে হয়। দাদারও দোষ দেওয়া যায় না, তার নামে মনিঅর্ডার গেলে পাঁচ কান হবেই, তারপর বউদিটি জানতে পারলে সর্বনাশ। সে এলেই যা তা বলত। জোয়ান ব্যাটা, বিয়ে করার সময় খেয়াল ছিল না, আবার পুত্রকন্যাও হয়েছে। এক পয়সা রোজগার নেই, বিয়ে করলে কোন আক্কেলে। সারাজীবন মানুষটাকে জ্বালাচ্ছে।
দাদারও অশান্তির শেষ থাকে না।
পূর্ণই দাদাকে বুদ্ধি দিয়েছিল, আমার টাকা মনিঅর্ডারে পাঠাবেন না। মা, শুধু মা কেন, বোনেরাও বউদিকে জানিয়ে দেয়। কারও অবস্থাই যে খুব একটা পদের না। কনিষ্ঠ ভ্রাতাটিকে মাসোহারা পাঠানো হয়। আর তারা কি সব বানের জলে ভেসে এসেছে। মানবেন্দ্র যে সবারই বড়দা। সুতরাং পূর্ণ নিজেই আসে। গাছের নারকেল, লেবু, আমের দিনে আম, লিচুর দিনে লিচু, কাঁঠাল, বাড়িটা বলতে গেলে মা আর কনিষ্ঠ ভ্রাতাই ভোগ করে।
আমাদের বাড়ির পুকুরপাড়ের গন্ধরাজ লেবু বড়োবউদি। তোমাদের জন্য নিয়ে এলাম। দ্যাখ কত বড়ো হয়েছে।
রমার হয়ে গেল। পূর্ণ না থাকলে, বাড়ির ফল-পাকুড় কে খাওয়াত। সেই তো তবু সম্পর্ক রেখেছে।
মানবেন্দ্র মজা ভোগ করত। আসলে টাকার লোভে এসেছে, রমার মন জয় করা কত সহজ।
আমের দিনে আম।
লিচুর দিনে লিচু।
কখনও নারকেল।
মানবেন্দ্র বলেছিল, সে কি তটস্থ অবস্থা। মেঝে থেকে গলা বের করে ফোঁস ফোঁস করছে, মা বাবাকে ডাকছে, বাবার তো কুম্ভকর্ণের ঘুম। ঘুম ভাঙে না। ঠেলেঠুলে ভোলা হল, বাবা উঠলেনও, হারিকেনের আলোতে দেখলেনও-ও সাপ, তা বেশ বড়ো।
ইঁদুরের যা উৎপাত। একটা ধানের বস্তাও আস্ত নেই। ইঁদুরে ধান খায়, সাপে দর খায়। ধানের বস্তা আস্ত আছে তোমার। সারা মেঝেতে, খাটালের নীচে ইঁদুরের বাসা। ধানের দফা রফা করছে। সাপ না, আসলে মঙ্গলময়ী। ইঁদুরের গুষ্টির তুষ্টি করে ছাড়বে। নাও শুয়ে পড়।
বাবা পাশ ফিরে শুয়ে পড়লেন, নাক ডাকতে থাকলেন, মনে নেই তোর।
হ্যাঁ হ্যাঁ, পূর্ণ জানে দাদার কথায় সায় না দিলে টাকার অঙ্কে এক লাফে অর্ধেক হয়ে যেতে পারে।
তা হলে?
পূর্ণ বুঝতে পারল না। হাঁ করে তাকিয়ে ছিল।
সাপ কামড়াবে কেন। তার সঙ্গে কি আমার শত্রুতা আছে। আমি যাব, সাপই থাকুক, আর গতবারের বন্যায় মাটির দেওয়াল বসেই যাক। বাবার তক্তপোশে শুয়ে থাকলেও শান্তি।
পূর্ণ খুবই ঘাবড়ে গেছে। বাবার আস্ত তক্তপোশটাও যে হাফিজ হয়ে গেছে।
আসল কথা বাবার চকিটা বেশ বড়ই ছিল। তার দুই ছেলে, তারাও লায়েক, দুজনই রঙের মিস্ত্রি। রঙের কাজ করে। বোনের বিয়ে উদ্ধার হয়ে যাওয়ায় তারা আর জ্যাঠাকে সমীহ করে না। এজমালি সম্পত্তি। যে যা কেড়ে নিতে পারে ঠাকুমার বাসনপত্র, কম তো ছিল না, কত বড়ো বড়ো সব কাঁসার থালাবাসন, জামবাটি, তামার ডেগ, প্রেস্টিজ কুকার, শ্বেতপাথরের থালা, বোকনা, কী ছিল না। সবই তাদের বড়পিসি হাতিয়েছে—গাছটাছও পূর্ণ বিক্রি করে দিচ্ছে, বড়দাকে না জানিয়ে—সবই করতে পারে, তবে মা-র ঘরের তক্তপোশটা বের করে দু-আধখান করে, তার রঙের মিস্ত্রির যোগ্য পুত্ররা কেটে যে ফাঁক করে দিয়েছে, আসলে ঘরটায় মানবেন্দ্রের প্রিয় তক্তপোশটিই হাফিজ হয়ে গেছে। দাদার মেলা আছে, ভাইপো-ভাইঝিরাও ভাবছে, জ্যাঠা বুড়ো হয়ে গেছে, আর আসছে না, এমনকী অন্য শরিকরা, সেই ভাই আর বোনই হোক, কাউকে এখন বাড়িটায় ঢুকতেই দেওয়া হয় না। আর জরাজীর্ণ মাটির ঘরটি নিয়েও কারও মাথাব্যথা নেই। কিন্তু মানবেন্দ্রের কাছে এই ঘরবাড়ি তীর্থের সামিল। পূর্ণ ঘর মেরামতের অছিলায় দাদার কাছ থেকে দফে দফে কম টাকাও নিয়ে যায়নি—কিন্তু দাদা যাবে শুনে তার মাথা ঘুরতে শুরু হয়েছে। এবারে আসল খবরটি দিলে যে এ বাড়িতে আর ঢোকা যাবে না, তাও জানে। আসলে তিন বিঘে জমি যদি জবরদখল করে নিতে পারে, জমির দামও মেলা, বিশ-বাইশ হাজার টাকা কাঠা—সেই জমি বারো চোদ্দতে রেজিষ্ট্রি এমনকী বন্টননামা ছাড়াই কেনার মেলা লোক আছে সে জানে। শুধু বসিয়ে দিলেই হল। দাদার সঙ্গে তার সম্পর্ক থাকল কি গেল বয়ে গেল তার। তার বউদিটি তো তাকে কম অপমান করেনি।
পূর্ণ অগত্যা বলল, এই গরমে গিয়ে কী করবেন। কষ্ট হবে আপনার।
হোক কষ্ট। তবু যাব।
কাঁঠালবীচির জন্য যাবেন, দুমাস বাদেই বৃষ্টি নামবে। কাঁঠালের সিজন শুরু হবে। বাড়ির কাঁঠালও খাওয়া হবে, তার বীচিও পাওয়া যাবে। আমি এসে নিয়ে যাব।
