মেজপুত্র একটু বেশি আদরের, সে চিৎকার করে বলল, কারণ মানবেন্দ্র তার বসার ঘরে মেজপুত্রকে ডেকে বলেছিল, তোমাদের ছাঁইপাঁশ আর গেলা যাচ্ছে না। আমার জন্য কাঁঠালবীচি সেদ্ধ দিতে বলবে।
মেজপুত্রটি তর তর করে সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠে গিয়ে খবরটা চাউর করে দিল।
কাঁঠালবীচি সেদ্ধ!
সে আবার কী? সবারই কেমন কৌতূহল জানার।
নীচে গিয়ে জেনে এস। তাঁর হুকুম। তিনি কাঁঠালবীচি সেদ্ধ খাবেন।
বড়ো বউমাকেই মানবেন্দ্র কিছুটা সমীহ করে। হাওয়া গরম। কেউ বাবার ঘরে যেতে রাজি না হওয়ায় সে-ই গেল।
বাবা।
সে ফের লম্বা বাণ্ডিল খুলছিল। গাটার খুলছিল—তারপর উলটোভাবে আবার মুড়ে নিচ্ছিল—কেউ তার ঘরে যে ঢুকেছে, বুঝতে অসুবিধা হয়নি—কিন্তু পাত্তা দিতে রাজি না। চিংড়ি মোকাম্বার জের চলছে—বুঝতে অসুবিধে হল না বড়ো বউমাটির।
বাবা।
বল।
কাঁঠালবীচি যে নেই।
নেই মানে।
শীতকাল না।
তাতে কী হল।
কাঁঠালবীচি পাব কোথায় তাই তো জানি না। আর সেদ্ধ কাঁঠালবীচি দিয়ে শুধু ভাত খাওয়া যায়!
সেদ্ধ কাঁঠালবীচি, সঙ্গে একগণ্ডুষ খাঁটি সরশের তেল—এটাও একটা রেসিপি খেয়েছ কখনো, দারুণ খেতে, মুখ বদলাবার জন্য মোকাম্বা চিংড়ি পর্যন্ত যাওয়ার দরকার হয় না।
ঠিক আছে, জোগাড় করি। দেখি কোথায় পাওয়া যায়। আপনাকে কথা দিলাম আপনার রেসিপিও হবে।
ওই হবে। স্তোক দেওয়া কথা।
মানবেন্দ্র একদিন ডেকে বড়ো বউমাকে বললেন, কী হল। সব পাওয়া যায়, কাঁঠালবীচি পাওয়া যায় না।
চেষ্টা হচ্ছে।
চেষ্টা হচ্ছে মানে!
নিউমার্কেটে পর্যন্ত গেছে আপনার বড়ো ছেলে। কাঁঠালবীচি নামটাই খুঁজে পেল না। যাও বলল, এখন তো বাবু কাঁঠালের সময় নয়। কাঁঠালবীচি পাবেন কোথায়!
কিচ্ছু জান না। কাঁঠালবীচি শুকিয়ে মাটির কলসিতে শুকনো বালির মধ্যে রেখে দিলে কখনো নষ্ট হয় না।
এক নাতি ক্লাস টেনে পড়ে। সে উঁকি দিলে বলল, বীচির হিমঘর।
হিমঘর না, প্রিজারভেশন।
মানবেন্দ্র বলল, আমাদের বাজারে পাওয়া গেল না।
বলল, পাওয়া যাবে। কাঁঠালের দিন আসুক, পাওয়া যাবে।
ততদিন বেঁচে থাকব তো।
আপনি বাবা এমন অলুক্ষণে কথা বলেন। সত্তর বাহাত্তর বয়েস একটা বয়েস।
আমার এখন সেভেনটি ফাইভ চলছে।
ওই হল।
একবার জণ্ডবাবুর বাজারে খোঁজ করবে ত?
আপনার ছেলেকে বলব।
কেন তোমরাও তো বের হও। ছেলেটা সারাদিন এক সময় পায় না। হিল্লি দিল্লি ঘুরে বেড়াতে পার, জণ্ডবাবুর বাজার চেন না। ওখানে মানিকতলার বাজারে ঠিক পাওয়া যাবে। রিফুজিদের বাজার নাই যে পাবে না, এ-দেশের লোক তো চিংড়ি পুঁই ছাড়া কিছু বোঝে না।
শেষদিকে একটু বেশি বাড়াবাড়ি শুরু করায় বড়োবউমা, দেশের বাড়িতে ফোন করে পূর্ণকাকাকে খবর পাঠাল। পূর্ণকাকার বাড়িতে যে নেই। বাবার কনিষ্ঠ ভ্রাতা পূর্ণকাকা গরিব মানুষ, তার শ্বশুর অভাব-অনটনে টাকা পাঠান—সম্প্রতি কাকার মেয়ের বিয়ের পণ যে সব খরচাই সামলেছেন।
মানবেন্দ্রর ছেলেরা তাকে একা ছাড়ে না—কোথাও প্রায় যেতেও দেয় না। তীর্থক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া যায় না, শুধু দেশের বাড়ি, দেশের বাড়ি কিছু গরিব পরিবার, ভাইয়েরা যে কেউ কেউ খুবই গরিব, থাকা কোথায়, পাখা নেই, পরিত্যক্ত কম্বলের মতো একটা বসতি, জঙ্গলের পড়ে আছে–শ্বশুরমশাইটির কাছে, এমন সুন্দর জায়গা, ভূ-ভারতে কেন, সারা পৃথিবীতেও খুঁজে পাওয়া যায় না। আজকাল মাঝে মাঝে বলছেন, তাঁর কিছু ভালো লাগছে না, দেশের বাড়িতে যাওয়ারও বায়না।
শ্বশুরমশাইয়ের দেশের এক ভগ্নীপতির বাড়িতে ফোন আছে। এস টি ডি করে তার সঙ্গেই কথা বলেছে বড়োবউমা–পূর্ণকাকাকে খবরটা দেবেন তাঁর বড়দা, কাঁঠালবীচির জন্য প্রায় বলতে গেলে নাওয়া-খাওয়া ছেড়ে দিয়েছেন। সংসারে খুবই অশান্তি চলছে। খুবই আর্জেন্ট, পূর্ণকাকা যদি কারও বাড়ি থেকে কিছু কাঁঠালবীচি নিয়ে আসতে পারেন। যে করে হোক। না হলে হুমকি দিয়েছেন, একাই চলে যাবেন দেশের বাড়িতে। তাঁর ধারণা, গেলে পূর্ণ ঠিক ব্যবস্থা করবে।
ভগ্নীপতিদেরও যে অনেক অনুযোগ।
এত করে বললাম, দাদা দেশে একটা বাড়ি করুন। কিছুতেই তেনার মা রাজি। অর্থাৎ তার দিদিশাশুড়ির এককথা, না বাবা, তোর বাবার স্মৃতি, মাটির ঘর কি ফ্যালনা। সারাজীবন তিনি এই ঘরটাতেই কাটিয়ে দিয়েছেন, লাইট নেই পাখা নেই, আমরা তো মরে যাইনি।
মা বেঁচে থাকতে মানবেন্দ্র বছরে একবার অন্তত যেত। মা কিছুতেই কলকাতার বাড়িতে আসতে রাজি না। তাঁর বড়োছেলের পরিবারটি ম্লেচ্ছ হয়ে গেছে। আচার বিচারের কোনো বালাই নেই। তিনি গিয়ে সেখানে থাকেন কী করে!
মনিঅর্ডারে টাকা যেত, না হয় পূর্ণকাকাই মাসে একবার এসে, কাজের জন্য এবং দিদিশাশুড়ির জন্য টাকা নিয়ে যেত। শ্বশুরমশাই এলে, সেই মাটির ঘরেই আলো পাখা বিনা সাম্রাজ্যে বসবাস করে একেবারে তাজা হয়ে ফিরত। বাবার বানানো বড় একটা চকিতে শুত—ছোট্ট চকিতে মা।
আর মায়ের মৃত্যুর পর ছোটো চকিটি পূর্ণকাকা নিজের ঘরে তুলে নিয়ে গেছে। বড়ো তক্তপোশটিই ছিল মানবেন্দ্রর একমাত্র শোওয়ার জায়গা। জঙ্গলে না হয় মাঠে হাগা-মাতার কাজ সারত। পূর্ণকাকিমা রান্না করে দুবেলা বারান্দায় খেতে দিত। টালির লম্বা বারান্দায় একটা হাতল ভাঙা চেয়ারে বসে গাঁয়ের লোকজনদের সঙ্গে গল্প করত। কী দিন ছিল, কী দেশ ছিল, আর শেষে কী হয়ে গেল সব। শুধু আক্ষেপ!
