বড়োপুত্র বোঝে, তার পিতাঠাকুর চিন্তা-ভাবনায় খুবই সেকেলে। কিছু করারও নেই। মায়ের মৃত্যুর পর আরও জেদি হয়ে উঠছে। এখন পেটি পেটি কোলার বোতল ঠিকই আসে, চন্দ্রনাথ গ্যারেজেই রেখে দেয়—তার দিবানিদ্রার ফাঁকে, ওপরে নীচে, ঘরে ঘরে যার যার ফ্রিজে সে সব সুযোগ বুঝে পাচার হয়ে যায়।
চন্দ্রনাথ আম-মুড়ি নিয়ে ফিরে এল—মেজ বউমার বের হতে দেরি হয়ে গেল। দিন যত যাচ্ছে—তত যেন তার শ্বশুরমশাই জেদি হয়ে উঠছে। কেবল তাদের পছন্দের বিরুদ্ধে প্রত্যাঘাতের অপেক্ষায় তিনি বসে থাকেন।
রাতে ডিনারে পুত্রদের সঙ্গে সে আহার করে। এই একটা সময়, যখন সবাইকে একসঙ্গে পাওয়া যায়। বউমারাও কিচেনে যাবে। তখন রান্নার মেয়ে অথবা আয়ারা যার যার ঘরে আয়েস করে। এই সময়টায় পুত্রদের সঙ্গে গল্পগুজব হয়, তাদের পিতাঠাকুরের মুখে তখন শুধু পুরনো দিনের কথা—তার মা, জেঠিমারা—
ছোটো বউমা বলল, বাবা এক পিস চিকেন পাপরিকা খান। আমি নিজে করেছি। খেয়ে দেখুন, না রিচ না। খান না।
তার এক কথা, না। তোমরা খাও। আমার জিরেবাটা দিয়ে মৌরলা মাছের ঝোলের কাছে কিছু লাগে না।
রাতের বেলাতেই নানা রেসিপি, যার যেদিন ইচ্ছে—বাবা, মাখন ভাতের সঙ্গে ভেটকি নিউবার্গ—খান, খেয়ে দেখুন।
না।
আশ্চর্য সুন্দর সুঘ্রাণ এবং চিনেমাটির প্লেটে সাজানো খাবার—কী দারুণ। খেয়ে দেখুন—বড়ো পুত্রবধূর অনুরোধ, উপরোধ।
না বউমা, তোমরা খাও। বড়োপুত্র প্রায় ক্ষেপেই গেল।
স্ত্রীর দিকে তাকিয়ে বলল, কেন যে দাও। দ্যাখছ পছন্দ করে না।
বড় বউমাটি নাছোড়বান্দা–খাওয়াবেই।
বাবা।
বল।
একটু মুখে দিয়ে দেখুন।
দেখছি।
মুখে দিয়ে বলল, বিস্বাদ। আমি জানি না, কেন তোমরা খাও।
তারপর কিছুটা খেল। এবং প্লেট সরিয়ে দিয়ে বলল, আজ কি ভাত, ডাল, মাছ হয়নি?
হয়েছে। না হলে কাজের লোকেরা খাবে কী?
ওই দাও। এত সুন্দর করে সাজিয়ে যা দিয়েছ লোভ লাগে খেতে, তবে সহ্যও হযে না। পেট ভরে খাওয়া যাবে না।
সে জানে প্রায়ই রাতের ডিনারে এদের এক-একটা রেসিপি, সাধারণত রবিরারেই হয়ে থাকে। আত্মীয়স্বজনও আসে। তবে প্রায় বলতে গেলে সবাই বউমাদের বাপের বাড়ির। তার আত্মীয়স্বজন অপদার্থ, অর্থাৎ গরিব। একবার তো রাতে পূর্ণ, পূর্ণ মানে তার কনিষ্ঠ ভ্রাতা রাতের রেসিপি খেয়ে কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল।
মানবেন্দ্র কনিষ্ঠ ভ্রাতার খাওয়া দেখেই বুঝেছিল, তার পেট ভরেনি। কারণ তার খেতেই ইচ্ছে হয়নি। জোরজার করে যতটুকু খাওয়া।
কনিষ্ঠ ভ্রাতাটি সেই থেকে রবিবার দিনটিতে কখনো আর আসত না। রেসিপির ঠ্যালা সামলাতে সে রাজি না। আরে ভাত ডাল মাছের কাছে কি কিছু লাগে!
এইভাবে কখনো—চিকেন আলা, চিকেন সামুসিয়া এমনই কত রকম সব বিদঘুটে নাম—
বাবা এটা খান। একটু মুখে দিন, ভেটকির মধ্যে চিংড়ির পুর দিয়ে ক্রিম সসে অসাধারণ রান্না।
মানবেন্দ্র ভাবত, রান্না না, অর্থের গাবরাবাজি, অর্থের চূড়ান্ত অপব্যবহার।
খেতে বসলেই মেজাজ তার নানা কারণেই খাপ্পা হয়ে যায়। ইদানীং মাছ মাংস খাওয়ার তেমন আর আগ্রহ নেই। পেঁয়াজ রসুনের রান্নাও সহ্য করতে পারে না। বাজারের চালানি রুই কাতলা, না হয় ইলিশ, এ দুটো মাছই বেশি হয়। খাওয়ার পাতে বড়ো মাছের টুকরো, খেতে তুলোর মতো, কবেকার মাছ কে জানে, মাছের মাছত্ব বলতে আর কিছু থাকে না। ড্রাইভার চন্দ্রনাথ সকালের বাজার করে। বড়পুত্রের বের হতে দশটা-সাড়ে দশটা হয় বলে, চন্দ্রনাথ সকালটায় প্রায় ফ্রি থাকে।
খেতে বসলেই এক কথা, তখন অবশ্য রান্নায় মেয়েটাই কিচেনের মালিক। দুপুরে সে বলতে গেলে একাই খায়—কেউ তো তখন বাড়ি থাকে না—এই যে চন্দ্রাবতী
আজ্ঞে।
বাজারে ট্যাংরা পুঁটি কি পাওয়া যায় না?
বাবু আমি কী বলব। বাড়িতে ছোটো মাছ কেউ খেতে চায় না।
পাবদা মাছ পাওয়া যায় না।
চন্দ্রাবতী কী বলবে? চুপ করে থাকে। রাতে একদিন প্রায় হুকুমই জারি করে দিল সে।
বড়োপুত্রকে বলল, তোমরা যা খুশি খাও। আমার জন্য জ্যান্ত মাছ চাই। সকালে মক্কেলদের একটু কম আস্কারা দিয়ে বাজারের জন্য একটু সময় বের করে নাও। তোমরা কী হলে। আটটা না বাজলে তোমাদের ঘুম ভাঙে না।
শুতে শুতে অনেক রাত হয়ে যায় বাবা।
আমি ওসব বুঝি না, তোমরা ভেটকি, চিংড়ি, পচা রুই, পচা ইলিশ যত খুশি খাও। আমি খাব না। আমার জন্য পুঁটি, মৌরলা, তাজা ট্যাংরা, তাজা পাবদার ব্যবস্থা করবে, না পারলে মাছ স্পর্শই করব না। মাংস হলে রেজালা খাসি, কেন দেশি পাঁঠার মাংস পাওয়া যায় না। তোমাদের তাড়নায় মাছ মাংস দুই ছেড়ে দিতে হবে দেখছি।
বড়োপুত্রটি বাবার মরজি বোঝে। যত দিন যাচ্ছে তত অতীতের স্মৃতি তাকে তাড়না করছে। কেমন অবোধ শিশুর মতো অদ্ভুত সব বায়না। যত দিন যাচ্ছে তত মা বাবা ভাই বোন, জেঠি কাকিদের গল্প—তখন কতরকমের রান্না হত—
তিলের বড়া খেয়েছ।
না।
না খাওয়ারই কথা। তাদের জননী এ দেশের মেয়ে, সে পোস্ত ছাড়া কিছু বুঝত না।
তিলের অম্বল, কচি পাটপাতার বড়া, পাটপাতার শাক, মানকচু সেদ্ধ সর্ষেবাটা দিয়ে, কত সব উপাদেয় খাদ্য—আর কাঁঠালবীচি সেদ্ধ গরম ভাত, না তুলনা নেই। য়াতে সেই মোকাম্বা চিংড়ি, কে যেন বলল, ভেটকি মাছের ভেতরে চিংড়ি মাছের পুর দিয়ে নতুন রেসিপি রেসিপির খেতাপুড়ি। সকাল বেলায় উঠেই হুকুম জারি করে দিলেন—তোমরা, বউমারা, নাতিরা যা খায় খাবে। আমি খাব না।
