বড়ো পুত্র মাথা চুলকে বলল, ওরাই বা কী করবে—যা রান্নার ছিরি, বাইরে না খেয়ে কোথায় খাবে।
রান্নাই যদি না করতে পারে, ছাড়িয়ে দাও। এত অপচয় তো ভালো না। তা ছাড়া সবার জিভের স্বাদ বুঝে রান্না সম্ভব! ঝাল বেশি। নুন কম। তেলে ভাসছে। ফোড়ন ঠিক নেই। মুসুরির ডাল-পেঁয়াজ ফোড়ন পছন্দ না, কালোজিরে ফোড়ন পছন্দ না, এই যে কারও পছন্দ, কারও পছন্দ না, এত সব পছন্দ আমারও পছন্দ না। তারপর তিনি হুকুম জারি করে দিয়েছিলেন, বউদের বল কী রান্না হবে, তারা যেন বলে দেয়। তোমাদের মা নেই, তোমাদের এই পছন্দ-অপছন্দের ঠেলা সহ্য করতে না পেরেই বোধহয় তিনি দ্রুত পালালেন—তোমাদের ঘরে ঘরে ফ্রিজ, সেখানেও নানাবিধ খাবারের প্রক্রিয়া থাকে—এত সব ব্যবস্থা যখন আছে, তখন আর আমার দরকার কী! তোমরা যা হয় ব্যবস্থা করো।
বড়োপুত্র বলেছিল, ঠিক আছে আপনি আর সংসারে মাথা গলাতে যাবেন না। সব ঠিক চলে যাবে। কিছু আটকাবে না।
না, সত্যি কিছু আটকাল না। বরং তার ওপর নতুন নতুন নিয়ম জারি হতে শুরু করল।
কাল এত রাত হল আপনার ফিরতে?
ছোটোপুত্রের উলটো চাপ।
কামিনীর সঙ্গে দেখা। সে-ই নিয়ে গেল।
কোথায়?
ভবানীপুরে।
ফিরলেন কী করে?
ওর ড্রাইভার পৌঁছে দিল।
কাউকে বলে যাবেন না! কামিনী কাকা একটা ফোন করে দিতে পারত।
সে বলতে পারত, কাকে ফোন করবে। কেউ কি আমার অপেক্ষায় বসে থাকে!
সোজা মিছে কথা, ফোন করার কথা মনেই হয়নি তার!
চিন্তা হয় না?
বড়োপুত্র তার বসার ঘরে ঢুকে একদিন বলেছিল, রাস্তায় একা হবেন না। আপনি নাকি বাসে উঠে আপনার কোনো এক পিসিমার কাছে চলে গেছিলেন!
কী হয়েছে!
একদম ট্রামে-বাসে উঠবেন না।
কেন!
মাথা ঘুরে পড়েটড়ে গেলে কে দেখবে!
আমার মাথা ঘুরবে!
বয়স হয়েছে, বোঝেন না। আর যখনই কেউ বলে মানবেন্দ্রবাবুকে দেখলাম, মিনিবাসে কোথায় যাচ্ছেন, তখন খারাপ লাগে না! গ্যারেজে খবর দিতে পারতেন। হরনাথকে বললেই গাড়ি বের করে দিত।
সেই বড়োবাবু সকালে আজ দুধ-মুড়ি-আম খাব বলেছে। আমের সিজন চলে যাচ্ছে—দুধ-মুড়ি-আমে মাখামাখাই সুস্বাদু খাবার এখন তাকে না দিলে, সকালে কিছুই খাবে না জানিয়েছে। আলো কিচেনে ঢুকে বলল, কথা কথা। নট নড়নচড়ন।
এখন খোঁজ মুড়ি কোথায়? কোন দোকানে বিক্রি হয়।
এ-বাড়ি থেকে মুড়ির চল সেই কোন অতীত থেকে উঠে গেছে। মেজোবৌদি বলল, চন্দ্রনাথকে ডাক।
চন্দ্রনাথ মেজবৌদির নিজস্ব ড্রাইভার।
শোন চন্দ্রনাথ, এখানে কোন দোকানে মুড়ি পাওয়া যায় জান?
আমার বাড়ির পাশে কোথায় পাওয়া যায় জানি, এখানে কোথায় পাওয়া যায় জানি না।
যাও গাড়ি বের করে তোমার বাড়ির পাশ থেকেই নিয়ে এস।
সে তো অনেক সময় লেগে যাবে!
আমি জানি না। টাকা নাও। যেখান থেকে পার নিয়ে আসবে।
রান্নার মেয়েটা তখন বলল, কেন বউদি এত দূরে যাবার কী দরকার! বাজারে গেলেই পাবে। কাউকে জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে মুড়ি কোন দোকানে পাওয়া যায়।
সেই তো।
চন্দ্রনাথ গেট দিয়ে বের হওয়ার মুখে একটা লোক বলল, স্যারের সঙ্গে দেখা করব। তিনি আছেন?
যাবেন কোথায়। যান ভিতরে। বসার ঘরে আছেন।
আলো তখন দোতলার বারান্দায় খবর দিল, একজন আপনার সঙ্গে দেখা করতে চায়।
বল গিয়ে দেখা হবে না! কী চায় জানি। আর ইস্কুল-কলেজ পাঠ্যবই তিনি যে লিখবেন না স্থিরই করে ফেলেছেন। বাজারে ধরে গেলে বছরের পর বছর রয়েলটির টাকা। আর কপালও তার, যাতে হাত দেয় তাই সোনা। এই বইই তার কাল। বিনা পরিশ্রমে টাকা আসতে থাকলে, বাড়িতে মুড়ি থাকে না। চাউমিন থাকে। আম থাকে না, আমূল থাকে।
তোর হাতে কীসের পেকেট পাপাই। আয় তো কাছে। দেখি দেখি।
নাতিটি গদগদ হয়ে বলল, আমূল।
আমূল দিয়ে কী হবে। রান্নাঘরে রেখে আয়।
দাদুর নিবুদ্ধিতায় সে খিল খিল করে হাসছে। দাদু ঠিক ভেবেছে, এটা হল। মাখন। সে বলল, এই দ্যাখ না। মাখন না, ক্যাডবেরি।
মানবেন্দ্র প্যাকেটটা উলটেপালটে দেখল, কত দামরে?
দশ টাকা।
দশ টাকা। সকালে দশটা টাকা পেটে তোর ফাউ হয়ে ঢুকে যাবে। টাকাপয়সার দাম এত কমে গেল কবে।
ঘরে ঘরে ফ্রিজ বাবুদের। ঘরে ঘরে ফ্রিজে কোকোকোলার বোতল। জ্যাম জেলি, কাম্পাকোলা, অরেঞ্জ স্কোয়াস—এখন আর বাড়ি করে কিংবা রাস্তায় তেষ্টা পেলে বউমারা-নাতিরা জল খায় না। ডাবের জল সুস্বাদু এরা জানেই না। আরে এরা বোঝোই না, এই যে, সব দুরারোগ্য ব্যাধি নিত্যনতুন, কর্কট রোগের কথাই ধরা যাক, ঘরে ঘরে এই সব রোগ ছড়িয়ে পড়ছে। এখন তো আর ক্ষয় রোগের প্রকোপ নেই, সর্দিকাশির মতো অসুখটা মাসতিনেক ট্যাবলেট খেলেই আরোগ্যলাভ। নতুন সব প্রোডাক্টে বাজার ছেয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে সঙ্গে নতুন নতুন রোগের প্রোডাক্টও বাজারে ছড়াচ্ছে—এখন তো আর ওলাওঠা কিংবা গুটিবসন্তে কেউ মরে না। কাজেই বাজারে রোগের নতুন নতুন প্রোডাক্ট না ছড়ালে, মানুষ যে মরণশীল সেটাই ভুলে যাবে না জননীরা।
টিভির সামনে বসাই যায় না।
একদিন বড়পুত্রকে ডেকে না বলে পারল না।
এত ঠাণ্ডা খাস না। কী কেমিকেল দেয়, রাস্তাঘাটে তাকানো যায় না, ফ্যাশান যেন, কী খাচ্ছে কেউ জানেই না। আফিমের জল যে মেশায় না কে বলবে! এত হলে নেশা হয়! বাড়িতে পর্যন্ত কোলার উৎপাত। শুধু জল বেচে পয়সা। কী যে হল দেশটা।
