সেই মনোজ আর এখন মনোজ নেই। কেউ তাকে মনোজ নামে চেনেই না। শৈশবের মনোজ কখন যে স্কুলে, কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে মানবেন্দ্র হয়ে গেল। কী করে যে এতবড় বাড়ি এবং এত খ্যাতি হয়ে গেল বুঝতে পারে না। সংগ্রাম, নিষ্ঠা, অথচ জীবন বড়ো ভারবাহী জন্তু, অথবা এমনও মনে হয়, রমারই কাজ। সেই তাকে সংগ্রামে লিপ্ত করেছে, নিষ্ঠায় কাতর হতে বলেছে, আবার কখনো জীবন বড়ো ভারবাহী জন্তু এমনও মনে করিয়ে দিয়েছে।
আসলে সব কিছুর পেছনে থাকে শুধু একজন নারী।
সে তার কৈশোরকাল থেকেই কোনো নারীর ছলনায় এতদূর এসে বুঝেছে, সব ফাঁকা।
তখন মেজো পুত্র বোধহয় কোর্টে বের হবে—কানে তার কথা উঠেছে, দেখগে তোমার পিতাঠাকুরের পাগলামি শুরু হয়েছে। তাঁর নাকি কিছু ভালো লাগছে না। তাঁকে আজ হোক কাল হোক কোথাও চলে যেতে হবে।
মেজো পুত্র সুরেন জানে মায়ের মৃত্যুর পর বাবার মতি স্থির নেই।
বছর পার হয়ে গেল।
বৎসরান্ত এই সেদিন বেশ জাঁকজমক করেই পালন করা হল। পুত্রেরা পিতামাতার প্রতি কোনোই ত্রুটি রাখার পক্ষপাতী নয়।
একজন বিখ্যাত রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী গান করলেন।
ছাদে বড়ো পুত্র মন্ত্র পাঠ করছে।
অতিথি-অভ্যাগতরা, এমনকী আত্মীয়স্বজনরা সবাই এসেছে। তার কুশল নিয়েছে।
পুত্ররা ছোটো হয়ে যায় ভেবে মানবেন্দ্র বলেছেন—না ভালোই আছি। সময় হলে যেতেই হয়। তোমরা কেমন আছ বল।
এই যে বাবা, কুশল।
অঃ কুশল, তোমার বাবার নাম কী বল তো!
ছোটোদির ছেলে। জবলপুরে আছে। রেলের ডাক্তার। ভুলে গেছ।
ও হ্যাঁ। মনে থাকে না। কেমন সব গুলিয়ে যায়।
মানবেন্দ্র তখনই ভাবেন, এটাকে কি বাহাত্তরে বলে। এই যে সব গুলিয়ে যাওয়া কুশলকে এমন প্রশ্ন কেন, সবই কি মগজের কোশের কোনো ভ্রম থেকে হয়—শুধু কুশল কেন, অনেক বন্ধুবান্ধবের মুখও ভুলে গেছেন—নাম মনে পড়ে না। তখনই যে কেন মনে হয়, কী আর হবে, কোথাও চলে গেলেই হয়। নিজেকে পরিবারের পক্ষে বোঝাও মনে হয় কখনো।
তার ফুটফরমাশ খাটার মেয়েটাই একমাত্র যখন-তখন তাঁর কাছে আসতে পারে।
সে এসেই পাশের টি-পয়ে একটা রেকাবি রাখল। চিনামাটির সুন্দর প্লেটে দুটো সন্দেশ, একটি কলা এবং একটি হাফবয়েল ডিম। বড়োবাবুর কখন কী মর্জি হবে সে জানে না। তাই রাতেরবেলা মশারি গুঁজে দেওয়ার সময়, সকালে তাঁর জলখাবার কী হবে জেনে নিতে হয়।
জেনে না নিলে কী হয়!
আরে ডিম দিলি কেন, নিয়ে যা। আরে টোস্ট দিলি কেন, নিয়ে যা। দুধ-মুড়ি আম খাব।
বাড়িতে শোরগোল তখন, রান্নার মেয়েটার গলার ঝাঁঝ আছে। যতই ঝাঁঝ থাকুক, বড়োবাবুর বেলায় ট্যা-ফু করতে সাহস হয় না।
তার চিৎকার, একতলা থেকে দোতলা, কিংবা তিনতলার ঘরে আস্তে কথা বললে, কারও সাড়াই পাওয়া যায় না। বড়োবাবু দুধ-আম মুড়ি খাবে বলেছে।
সকালের চায়ের দুধটুকু আছে। খাটাল থেকে দুধ আসতে আসতে নটা বেজে যায়। আম-মুড়ি-দুধ। মুড়ি আছে কি না, বাড়িতে মুড়ি কেউ খায় না। দুধ-মুড়ি আমও কেউ খায় না। সবাই সাহেবি ব্রেকফাস্ট করে-বউমারাও। নাতি-নাতনিরা আতপ চালের সুগন্ধ ভাত, ঘি ডিমসেদ্ধ। হালকা মাছের ঝোল। ছুটির দিনেও একই খাবার। বড়োবাবু তাদের খাবার দেখলে এককথা-আরে আমের সিজন। চলছে। সকালে দুধ-মুড়ি-আম কেন খাস না বুঝি না। গাদা গাদা মাখন পাউরুটি— টোস্ট আর ডিম আর কলা, কখনো আঙুর, নাসপাতি, এগুলো যে বাঙালির খাবার নয়, তিনি তাদের বোঝাতেই পারেন না। নাতি-নাতনিরা তাকে সমীহ করে না। বুড়ো মানুষটা যা খুশি বলুকগে—তারা কিছুটা খায়, কিছুটা ফেলে। মানবেন্দ্র এ সব দেখে মনে মনে খুবই কষ্ট পান। কাজেই আজ সকালে কি তাঁর ব্রেকফাস্ট হবে রাতে কোনো আভাসই দেননি, মাঝে মাঝে তিনি যে চান সংসারে খাওয়া নিয়ে একটা সংকট তৈরি হোক।
বোঝ এবার।
অ মেজো বউদি।
বউদি বাথরুমে। যাওয়ার সময় মেজোপুত্র তাকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে যাবে। ছোটো পুত্রবধূর চেম্বার। সকালেই বের হয়ে গেছে। ফিরতে ফিরতে একটা।
আর মেজো বউদি। সাড়া দেবে কী করে। বাথরুমে জলের শব্দ। রান্নার মেয়েটা সিঁড়ি ভেঙে দোতলার উঠেই টের পেল, বাথরুমে জল পড়ছে। দরজা বন্ধ।
সে যে কী করে।
অ মেজো বউদি।
বল।
আরে বড়োবাবু যে বলছে, দুধ-মুড়ি-আম খাবে।
তা দে, দিলেই হয়।
আম পাব কোথায়। মুড়ি পাব কোথায়। ঘরে কি কিছু আছে। খাটাল থেকে এখনও দুধ আসেনি।
দাঁড়া আমি যাচ্ছি।
মেজো বউদিদিরই সংসারের প্রতি কিছুটা নজর আছে। বাঁধাধরা রান্না, এই যেমন আলুভাজা, না হয় আলুপোস্ত। মুগের না হয়, মুসুরির ডাল—মাছ এবং চাটনি—সরকারি রান্না-পুত্ররা পতে কিছু দিলেই হল, তারা কোনোরকমে কিছু মুখে দিয়ে বের হয়ে পড়ে। দেখার কারও সময় নেই–আগে রমা দেখত, তারপর সংসারে গার্জিয়ান হিসেবে মাস দু-এক দেখতে গিয়ে টের পেল সে বড়ো কঠিন ঠাঁই। দু-মাসেই মাথাটা খারাপ।
বড়ো পুত্রকে ডেকে পাঠাল।
শোন।
তোমাদের রান্নাঘরটা তোমরাই সামলাও।
কেন কী হল!
কী আবার হবে। কে কী খাবে, সেইমতো বাজার করা যায়, এতকাল করেও গেছি—এখন তো দেখছি—ভালমন্দ রান্নার ব্যবস্থা করেও লাভ নেই। এত অপচয় তোমাদের। বাইরে খেয়ে এলে আগে জানাবে না। এই যে তোমরা যখন-তখন বলে দাও, রান্নার মেয়েটাকে আয়া দিয়ে খবর পাঠিয়ে দাও, রাতে খাবে না, খেয়ে এসেছ, আগে বলে যেতে দোষ কী। তোমাদের খাবারগুলো নষ্ট হলে কী হয়?
