সে বোঝে কাল কত বদলে গেছে।
তারা ছিল আট ভাইবোন।
বাবার রোজগার নেই, সে তত ক্লাস টেনে ওঠার পরই টিউশনি শুরু করে দেয়। এবং সব ভাইবোনকে স্কুল, কলেজ, যে যতটুকু পড়তে পেরেছে, চেষ্টা করেছে। তবে সবার তো একরকমের স্বপ্ন থাকে না, যে যার মত স্বপ্ন নিয়ে বাঁচে।
রমার স্বপ্ন, অন্তত রমার কাছে সার্থক।
কারণ রমার তিন পুত্রই কৃতী।
রমার তিন বউমাও কৃতী। কলেজ, কোর্ট, প্রশাসন এবং হাসপাতাল, নানা কাজে সবাই ব্যস্ত। কারও সময় নেই। কাজের লোকই বাড়িটার ভরসা।
এতসব হওয়ার পরও কেন যে মনে হয় তাঁর কেউ নেই। রমা চলে যাওয়ায় এতটা সে নিঃসঙ্গ হয়ে যাবে, ভাবতেই পারেনি।
সে তার সঞ্চিত অর্থ সবার মধ্যে ভাগ করে দিতে চেয়েছিল। কেউ নিতে রাজি না। তারা নিজেরাই যে নানারকমের আয়করের ঝামেলায় নাজেহাল।
বড়ো পুত্রের এককথা, থাকুক না। এত ব্যস্ত হওয়ার কী আছে?
নেই বলছিস!
না।
অঃ ঠিক আছে। তিনি তবু বড়ো বউমাকে ডেকে বলেছিলেন, লকারের চাবিটা তোমার কাছে রেখে দাও।
কী হবে।
সত্যি তো কী হবে। ওরা তো টিনের চালের বারান্দায় বসে কখনো কাঠালৰীচি ভাজা খায়নি।
কাঁঠালবীচি ভাজা।
কতকাল পর কত দীর্ঘকাল পর, কাঁঠালবীচি নামক একটি বস্তুর চেহারা তার চোখের সামনে ভেসে উঠল। নানারকমের আকার। কাঁঠালের কোয়া থেকে বের করা এই সব বীচি বাছারি ঘরের কোণায় জমা থাকত। সে এবং আট ভাইবোন সকালবেলায় কাঁঠালের কোয়া আর মুড়ি, ভুরিভোজনই বলা চলে। তারা সব পিঠেপিঠি ভাইবোন। ক্লাস টেনে সে পড়ে, টিউশনি করে, মেধাবী বলে ছাত্র-বেতন দিতে হয় না—আর মা তার সেই আট ভাইবোনকে কত সহজেই না সামলাত। পিঠেপিঠে দুই বোন, তারা ফ্রক গায়ে দেয় মা-র দোসর।
এই করুণা, দ্যাখ তোর বাবা কোথায় গেল।
করুণার জবাব, বাবা গোয়ালে।
তুই বসে থাকলি লাবি। কাঁঠালবীচিগুলি নিয়ে পুকুরঘাট থেকে ধুয়ে আন। কত বেলা হয়ে গেল। রোদে শুকোতে দে। আকাশের যা অবস্থা। সরা তো সকাল থেকে মুখ গোমড়া করে রেখেছে।
বাড়িটার কাঁঠাল গাছ, আম গাছ মেলা। বাবার দেশ থেকে আনা শেষ কপর্দক ফুলপাকুড়ের বাগান এবং একটি ডোবা ক্রয় করতে গিয়েই শেষ।
সব ঠিক হয়ে যাবে।
পুত্ররা লায়েক হয়ে গেল বলে।
সারাদিন গজর গজর—মাথার ওপর তো একজন আছেন। তাঁর আশায় এ দেশে চলে এসেছি। কেবল নাই নাই। এত নাই নাই করলে ঈশ্বর আরোপিত হয়। জানো?
আর ঈশ্বর। মারও গলা চড়ে যেত। বলে দিলাম বৃষ্টি বাদলার দিন, কাঠকুটো কিছুই নেই। আমি কি হাত পুড়িয়ে তোমাদের পিন্ডি সেদ্ধ করব।
হবে, সব হবে। এই নিত্য, যা তো বাবা, কাঠকলে যা, আমার কথা বলবি। বলবি বাবা পাঠাল।
তার মনে আছে, বাবার কথা কেউ মান্য করত না। একজন গরিব বামুনের পুত্র কাঠকলে গিয়ে বাবার দোহাই দিলেই কাঠ দিয়ে দেবে কখনো হয়!
নিত্যর এক কথা, আমি পারব না, তুমি সঙ্গে চল।
যাই কখন, আমায় যে অশ্বমেধের ঘোড়া ছুটছে—সকাল সকাল না গেলে সবাই ঠাকুরমশাইয়ের আশায় বসে থাকবে। যা বাবা নেত্য।
নেত্য ঘাড় কাত করছে না। নেত্য না করলে সে আছে।
তুই যাবি, একবার, তোর মা-র দুখানা হাত—আমাদের যে কিছু সম্বল তোর মা-র হাত দুখানি। তিনি খেতে দিলে খেতে পাস। তিনি আহারের বন্দোবস্ত করেন, তিনি খুঁটে দেন। তিনি ধান সেদ্ধ করে রোদে শুকিয়ে বস্তায় ভরে দিলে চালকলে নিয়ে যেতে পারিস, সেই অমূল্য হাত দুখানি পুড়িয়ে তোদের পাতে ভাত দিলে ভালো হবে!
মাকে যে খোঁচা দিয়ে কথা বলছে–মা সহ্য করবে কেন।
ভালো হবে না। আমার পেছনে লাগবে না। সংসারটার কী অবস্থা। তুমি তো ঠাকুরকর্তা, যজমান বাড়ি গেলেই ফলাহারের ব্যবস্থা। আমাকে খোঁটা দিয়ে কথা বলতে তোমার বিবেকে বাধে না।
আর তারা অর্থাৎ সে এবং অন্য ভাইবোনেরা বুঝত, লেগে গেল। তখন বারান্দায় বসে থাকাও ঠিক হত না। শুকনো কাঠকুটোর খোঁজ করতেই হয়। সে বের হয়ে যেত একটা লম্বা কোটা নিয়ে গাছের মরা ডাল টেনে নামাত। জমানো খড়কুটো বাইরের উঠোনে ছড়িয়ে দিত নেত্য, তারপর সে ছুটত কাঠকলে। হারানদাদা বাবা পাঠিয়েছে।
দ্যাখেন ওদিকটায় গাছের ছালবাকল পড়ে আছে—নিয়ে যান। ঠাকুরকর্তাকে বলবেন, শনি–সত্যনারায়ণের পূজা আছে। আপনেরা সবাই প্রসাদ নিতে আসবেন।
নেত্য মাথায় শুধু কাঠকুটোই নিয়ে আসত না, সঙ্গে শনি-সত্যনারায়ণের পুজার খবরও নিয়ে আসত।
তখনই বাবার কথা মনে হয়।
প্রায় যেন ধরণী বিজয় করার মতো বলতেন, বুঝলে মনোজের মা, রাখে কৃষ্ণ মারে কে। তোমার আর হাত পুড়িয়ে খাওয়ার বন্দোবস্ত করতে হবে না।
মা তখন তার যেন খুবই কাতর হয়ে পড়ত, গরিব বামুনটির জন্য।
তার দিকে তাকিয়ে বলত, মনোজ তোর বাবাকে বল, তিনি যেন কিছু মুখে না দিয়ে বাড়ি থেকে বের না হয়। বাড়ি থেকে বের হলে তো, আর বাড়ির কথা মনে থাকে না। কী খান, কোথায় থাকেন, চিন্তা হয় না। তোমাদের বাবামশাইটি কি তা বোঝেন!
তারা আট ভাইবোন। ছোটোটি বারান্দায় হামাগুড়ি দেয়, কান্নাকাটি করলে, হয় লাবি না হয় করুণা কোলে নিয়ে এ-গাছ সে-গাছের নীচে দাঁড়িয়ে পাখপাখালি দেখায়, তো বসে থাকে না, বাসনপত্র ধুয়ে আনছে লবি। কাঁঠালবীচিগুলি উঠোনে চাটাইয়ে বিছিয়ে দিয়েছে। রোজই লাবি যত্ন করে এই বীচি শুকনোর কাজটা করত। মাটির কলসিতে শুকনো বালির মধ্যে রাখা যাবে, না আরও রোদ খাওয়াতে হবে, মা অনুমতি না দিলে মাটির কলসিতে রাখা যেত না। মা হাত দিয়ে দেখত, কী বুঝত কে জানে। জ্যৈষ্ঠ-আষাঢ় দু-মাস ধরে কাঁঠাল খাওয়া আর বীচি সংরক্ষণ-পাঁচমেশালি তরকারি হবে, কাঁঠালবীচি, ঘরে চাল আছে, তরিতরকারি নেই, কাঁঠালবীচি সেদ্ধ—সে যে কী সুস্বাদু বীচি সেদ্ধ আর ভাত। সামান্য সর্ষের তেল। কত সামান্য উপকরণে অসামান্য খাওয়া।
