সেই থেকে রমা অদুলার কাছেই চিঠি রেখে যেত। এবং নানাভাবে পরামর্শ, সে কাগজের বিজ্ঞাপন দেখছে, তবে ঠিক কলকাতার কাছে হচ্ছে না, তা না হোক, যেভাবেই হোক জায়গাটা ছাড়তে হবে। স্কুলের মাস্টার-মাস্টারনীর প্রেমের বিয়ে গাঁয়ের মানুষ সহ্য করবে কেন?
আজকাল দোতলার বারান্দায় একা বসে থাকলে তার যে কত স্মৃতি ভেসে আসে।
সেই ঝুপড়ি ঘরবাড়ির কথাও মনে হয়।
মা বাবা ভাই বোন কেউ বাদ যায় না।
অবশ্য তখন বাড়িতে দুবেলা অন্ন জোটানোই কঠিন, ওরা এতগুলি ভাইবোন, বাবার শিষ্যবাড়িতে কুলাত না, যজন যাজনে কুলাত না।
এবং বাড়ি ফিরলেই, মা-র এককথা, আর অভাব যায় না বাবা, তোরা যে কবে বড়ো হবি। তোর বাবা আমাকে পাগল না করে ছাড়বে না, দুদিনের বলে নবদ্বীপে অন্নদা মুন্সির বাড়ি গেল সূর্য পূজার দিনক্ষণ ঠিক করতে, আজ সাতদিন, না চিঠি, কোনো খবর। বাড়ি থেকে বের হলে আমাদের কথা আর তার মনে থাকে না। আমরা বেঁচে আছি কি মরেছি, তাও তার মাথায় থাকে না। তারা ভাইবোনেরা তখন বড়ো সড়কে গিয়ে অপেক্ষা করত বাবা যদি ফেরে।
তাদের খুবই তখন দুরবস্থা। দু-তিন বিঘার মতো জায়গায়, জঙ্গলের মধ্যে, বাবা বাছারি ঘর তুলে, ঠাকুর ঘরের বাছারি তুলে সবে এ দেশে বসবাসের বন্দোবস্ত করছেন, তখন কথায় কথায় সবাইকে ফেলে একটা না একটা কাজের অজুহাত দেখিয়ে বাবার এই ভেগে পড়া যে-কোনো মায়ের পক্ষেই ক্ষেপে যাওয়ার কথা। আসলে তাঁর বাবা বোধহয় পরিবারের অন্নকষ্টের আতঙ্কেই ভেগে যেতেন। কিছু না জোটানো পর্যন্ত দেশান্তরী হয়ে থাকতেন।
কী খাব, বাবার মাথায় নেই।
যাওয়ার আগে বাবা-রমণীকে বলে গেছি, কিছু লাগলে তাকে বলিস। এইটুকু খবর শুধু দিয়ে যেত।
রমণী বাজারের বড়ো মুদি।
কে যাবে রমণীর কাছে।
মা বলত, যা একবার। ঘরেও একমুষ্টি চাল নেই।
আমি পারব না। তার ছিল এক কথা। গেলেই রমণীকাকা দশ কথা শোনায়।
সে অর্থাৎ মানবেন্দ্র মা-র কথা শুনতে রাজি না। রমণীকাকাকে সে ভালোই চেনে। গেলেই বলবে, এই কর্তাঠাকুর তো কিছু বলে যায়নি।
বাবার ধারণা, রমণীর এত বড়ো মুদিখানা, দেশের যজমান, এদেশেও এসে যজমান, কর্তাঠাকুরের চালচুলো ঠিক রাখা রমণীর নৈতিক দায়।
দোতলার বারান্দায় বসে এখন শুধু অতীতের কিছু দৃশ্য, সেই কবেকার কথা সব, যেন এই সেদিন রমার সঙ্গে প্রেম, যেন এই সেদিন। কলকাতায় রওনা হওয়া, দুজনের ফের একই স্কুলে চাকরি এবং রমার স্কুল সকালে, তার দুপুরে, একখণ্ড জমিরও খোঁজ করা হচ্ছেবাড়িতে টাকা পাঠিয়ে সঞ্চয় ভালোই হচ্ছে, একে জীবনযুদ্ধই বলা যায়, পুত্ররা একে একে জন্মাচ্ছে এবং এভাবে তারা বড়োও হয়ে যাচ্ছে।
কীভাবে যে সব হয়ে গেল। একটা বিদ্যুৎ রেখার মতো সব ভেসে ওঠে।
কীভাবে যে কেউ কেউ চলেও গেল।
এই সেদিন যেন বাবার মৃত্যুর খবর এসেছিল। অথচ সেই মৃত্যুর খবরটিও তো প্রায় চব্বিশ বছর আগে। মা তো সত্যি সেদিন গেলেন।
দোতলার বারান্দায় বসে থাকলে তার এমনই মনে হয়।
এত বড় একটা দীর্ঘজীবন এত সংক্ষিপ্ত হয়ে গেছে কীভাবে সে বুঝতেও পারে না।
রমার ঘর খালি।
ডবল খাট বের করে দেওয়া হয়েছে।
তাঁর সম্বল রমার ঘর, রমার দুটো লকার, কিছু মোটা অ্যালবাম—তাতে রমার জীবনের উচ্চাশা এবং তার উচ্চাশার ছবি, ছবির পর ছবি, দীর্ঘ জীবনযাত্রার এই সব ছবি, এক সকাল লেগে যায় ছবিগুলি দেখতে। বাইশ বছরের জীবন থেকে বাষট্টি বছরের জীবন—এই সব ছবি রমার গ্রথিত হয়ে আছে—কখনো পাহাড়ের ছবি, কখনো নদীর পাড়ের ছবি আবার রমা সমুদ্রে সাঁতার কাটছে, সে পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে, তারপর দেখা যায় জ্যোৎস্নায় কোনো কুয়াশার ভেতর থেকে উঠে আসছে–রমা হাত ধরে ফিরছে এক শিশুর, তাকে বেলুন কিনে দিয়েছে, তারও পরে বই, আবার এক শিশুর মুখ, কাজের মেয়ে নয়না সংসার সামলাচ্ছে, সকালে তার বাজার, খুবই সকালে ওঠার অভ্যাস, কারণ কঠিন জীবনযুদ্ধ, প্রতিষ্ঠা, শুধু তার নয়। তার পুত্রদেরও। বাজার ফেলে দিয়েই তার নিজের ঘর, অর্থনীতির সরল সহজ গদ্য এবং বই, বাজার ধরে গেছে, বসে থাকলে চলে! স্কুল সিজনে হু হু করে বই বিক্রি।
রমার ঘর বছরখানেক হল খালি। এই ঘরটার মধ্যে হাজারবার শুধু সহবাসের স্মৃতির কথা মুভি ক্যামেরা থাকলে ধরে রাখা যেত—এই সব স্মৃতি প্রিয়, কিন্তু কিছুদিনের মধ্যে তার রংও ফিকে হয়ে গেল। শুয়ে থাকলে মনে হয় রাতে রমা পা টিপে টিপে হাঁটছে। সে যে অনিদ্রায় ভুগছে—রমা মরে গিয়েও যেন টের পায়। রমা তার শাখাপ্রশাখা রেখে গেছে—শাখাপ্রশাখার জের তাকে রোজ সামলাতে হচ্ছে।
বারান্দায় চা রেখে গেল আলো। নতুন কাজের মেয়ে—কবে কে রাখল, সে জানে না। তবে তার জামাকাপড় কাচা থেকে বিছানা করা, মশারি টাঙিয়ে দেওয়া, জল রাখা এবং লোডশেডিং যদি হয়, একটি তালপাতার পাখাও শিয়রে রেখে দেয় আলো। খুবই মার্জিতরুচির। বউমারাই তার জন্য আলাদা একটি কাজের মেয়ে রেখে দিয়েছে। কারণ সকাল আটটা থেকেই বাড়িটা খালি হতে থাকে—কারও হাসপাতাল কারও কোর্ট, অফিস, কারও কলেজ। সকাল হতে না হতেই তাদের উঠতে হয়, তাদের আলোদা আয়া আছে, তাদের আবার সবারই মাত্র এক হয় পুত্র নয় কন্যা–তাদের জন্য স্কুল বাস আছে-স্কুলের টিফিন, বাস ফিরলে তাদের নিয়ে আসা—আর বাড়িটাও, রমার সময় একতলা। তিন পুত্র হওয়ার পর দোতলা, বড়ো পুত্রের বিয়ে দিয়ে তিনতলা, রমার তারপর রিটায়ার।
