ছবি খোঁটা দিয়ে কথা না বলতে পারলে আরাম পায় না। এতদিনে ছবি বুঝে গেছে, সত্যি অচল মাল নিয়ে তাকে কাজ করতে হচ্ছে। দুনিয়ার লোক মুখিয়ে আছে, লোকটাকে ঠকাবার জন্য। বাজারে, কাজের জায়গায়, বন্ধুবান্ধব সবাই যেন জেনে ফেলেছে, তার কাছে এলে ফিরে যাবে না। সে ধার দিয়ে ঠকেছে, সে বিশ্বাস করে ঠকেছে, জমি কেনার সময় দালালি বাবদ অনেক টাকা গচ্চা দিতে হয়েছে, বাড়ি করার সময় ঠিকাদার মাথায় হাত বুলিয়ে বেশ ভালো রকমের টুপি পরিয়ে দিয়ে গেছে। দরজা সেগুনের দেবার কথা, দিয়েছে গাম্বার কাঠের। একটু বাতাস উঠলেই খড়খড় করে নড়ে ওঠে। কোনো দরজা বৃষ্টি হলে ফুলে ফেঁপে যায়, লাগাতে গেলে হাতি জুতে টানাটানি নাকি করতে হয়। সব অভিযোগই ছবির। রান্নাঘরের দেয়ালের দুটো টাইলস খসে পড়েছে। তা পড়বে না, যেমন মানুষ! কথায় যে চিড়ে ভেজে তাকে দেখে নাকি ছবি সেটা সত্যি টের পেয়েছে।
এবারে আর ভিজতে দেবে না।
কী দাদা দাঁড়িয়ে আছেন! এত সকালে।
দাঁড়িয়ে আছি তো তোর কীরে ব্যাটা! সারাদিন দাঁড়িয়ে থাকব। আমার খুশি। সে এমন ভাবল।
কি পেলেন?
কাকে?
সেই লোকটাকে।
তুমি জান কী করে?
না যে-ভাবে ক-দিন থেকে রোজ দাঁড়িয়ে থাকছেন!
সে কী পাগল হয়ে যাচ্ছে! তাকে দেখেই কী টের পায়, একজন ঠগ জোচ্চোরকে সে খুঁজতে বের হয়েছে। চোখে মুখে কী তার কোনো আততায়ীর মুখ ভেসে উঠছে।
সে বলল, এমনি দাঁড়িয়ে আছি।
বাস-স্টপে এসে এমনি সারা সকাল কেউ দাঁড়িয়ে থাকতে পারে না! মাথায় কোনো গণ্ডগোল সত্যিই কী দেখা দিয়েছে। আমি দাঁড়িয়ে থাকি, খুশি! তোর কীরে শুয়োরের বাচ্চা! অবশ্য সে প্রকাশ করল না। মাথা তেতে আছে। সবার সঙ্গে সে দুর্ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। লোকটাকে শনাক্ত করতে না পারলে সে কী সত্যি পাগল হয়ে যাবে!
আবার দু-শ এগারো।
না নেই।
তীর্থের কাকের মতো দাঁড়িয়ে আছে।
দুটো দরজায় যারা ঘন্টি বাজায়, দেখে। তাদের কারও মুখ মেলে না।
এবারে ভাবল, না, এভাবে হবে না। সে উঠেই পড়ল। বাস-স্ট্যান্ডে গিয়ে খোঁজ করল। নেই। সে আবার একটা বাসে উঠে পড়ল। কিছু দূরে গিয়ে নেমে পড়ল।
নেই। আসলে সে যেন সবার মুখেই সেই একজনের মুখ দেখতে পায়। কে যে আসল ধুরন্ধর তা টের পায় না। ধরতে পারলেই মুখে ঘুসি মেরে বলত, নে শুয়োরের বাচ্চা, তোর টাকা রাখ। আমার টাকা ফেরত দে।
একদিন এভাবে সারাদিন এই করে সে যখন বুঝল, আসল আততায়ীকে ধরা যাবে না, যায় না, তখন একটা গাছের নীচে বসে পড়ল। পার্স থেকে নোটটা বের করে দেখল! হাজার অপমানের কথা মনে পড়তে থাকল। টাকাটা আবার দেখল। উলটেপালটে দেখতে দেখতে কী ভাবল কে জানে, সে নোটটা কুচি কুচি করে ছিঁড়ে ফেলে হাওয়ায় উড়িয়ে দিল। সঠিক আততায়ীকে খুঁজে বের করা জীবনে কঠিন। বাতাসে নোটের কুচি উড়ে যেতেই সে একেবারে হালকা হয়ে গেল। কী আরাম। বাড়ি ফিরে সে আবার অনেকদিন পর ঘুমোল। সকালে উঠে দেখল, গাছপালা, পাখি, ঘরবাড়ি, মানুষজন সব আবার তার কাছে সুন্দর হয়ে গেছে।
তৃতীয় ভুবন
কেন জানি কিছু আর তার ভালো লাগছে না।
জীবন একঘেয়ে হয়ে গেলে যা হয়, মাঝে মাঝে খুবই বিষণ্ণ বোধ করে সে। বয়স বাড়ছে।
মাঝে মাঝে মনে হয় কোথাও বের হয়ে পড়া দরকার।
আবার কখনো মনে হয় মাঝে মাঝে কেন, একেবারেই বের হয়ে গেলে হয়। চেনাজানা পৃথিবীর বাইরে, হয়ত সেখানে নদী থাকবে, পাহাড়ও থাকতে পারে আবার যদি দীর্ঘতম কোনো রেলের গুমটিঘরে অদুলার মতো গুমটিম্যানের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়, যতদূর চোখ যায় তখন শুধু হিজলের বনভূমি, নীল আকাশ এবং কোনো বালির চরা এবং অদুলা ফিরছে বনভূমি থেকে, হাতে ঝুলছে একটা বুনো হাঁস, কাঁধে শুকনো কাঠ এবং পেছনের শালের জঙ্গল থেকে সে তুলে এনেছে কচুপাতা কুমড়োপাতা, রাতে আগুন জ্বেলে পাখির মাংস পোস্তবাটা দিয়ে কুমড়োপাতার বড়া অথবা কুমড়োফুলের বড়া, গরম ভাত সামনে রেখে ঠিক বলবে, এতকাল কোথায় ছিলেন গ বাবু।
অদুলার কাছে চলে যেতে মন চায় মাঝে মাঝে তার।
আসলে তখন যৌবনের শুরু, হাইস্কুলে চাকরি, স্ত্রী রমার সঙ্গে সেই স্কুলেই আলাপ এবং পরে রেজিস্ট্রি। পরে বিবাহ। অদুলার গুমটিঘর পার হয়ে রমাকে গাঁয়ে ফিরতে হত। অদুলার কাছেই রমা চিঠি রাখত। ভালোবাসার চিঠি।
বিকেলে রেলের ধার ধরে সে বেড়াতে যেত—আসলে অজুহাত, সে জানে রমা অদুলার কাছে একটি চিঠি রেখে যাবে, শত হলেও স্কুলের দিদিমণি রমাকত কথা বলার ইচ্ছে হয়, কিন্তু দিদিমণি যে—খুবই গম্ভীর, অথচ কত হালকা কথা এবং ফুল ফোঁটার মতো সুন্দর কথা রমা তাকে জানাতে চায়। স্কুলের করিডরে কিংবা তার অফিসে যখন সে একা বসে থাকত, দেখলেই বুঝতে পারত রমার চোখমুখ ভারি চঞ্চল কথা বলার জন্য—সে চোখের ইশারায় মানা করত। ছাত্রছাত্রীরা কিছু ভাবতে পারে। শিক্ষক-শিক্ষিকারা রমার দুর্বলতা টের পেয়ে যেতে পারে। সে তো স্কুলের প্রধান শিক্ষক, তার যে প্রগলভতা শোভা পায় না—রমাকে সে বলেছিল, অফিসে একা থাকলে এস না, গ্রাম জায়গা, কুৎসা রটে যেতে পারে। বরং অদুলাকে বলে যেও, সে আমার খুব বিশ্বাসী জন, এবং আরও বলত, দেখি কলকাতার দিকে কোনো কাজ নিয়ে চলে যেতে পারি কি না—না হলে যে আমরা ভালোবাসার দৃষ্টান্ত হয়ে যাব।
