আর কেন যে বাঘিনি এই শব্দ এত প্রতীকময় হয়ে যেত তার কাছে—শরীরের কোশে কোশে অগ্নিশিখা জ্বলে উঠলে কে না নষ্ট হয়ে যায়! আমি গোপনে নষ্ট হয়ে গেছিলাম। আমার ছলনা টের পেলে, বুঝলে আসলে শরীরসর্বস্ব হয়ে আছি, আমার সব আকাঙক্ষা এবং কৌতূহল নিবৃত্ত করা ছাড়া, তোমার কাছে চাইবার মতো কিছু নেই। তোমার অন্ধ মা, মানে মাসিমার সেই আর্ত চিৎকার কানে বাজে। একই ভাবে ফোন এসেছিল, বনলতা, সে তোমাকে কিছু বলে যায়নি—বনলতা, কেন যে সে রাতে ফিরে আসেনি—আমি ওর খোঁজ কোথায় করব! কোথায় যাই!
না না! বনলতা দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলছে। সে অতীতের কোনো আর্ত চিৎকার শুনতেই রাজি না।
বনলতা ভাবতে পারছে না।
অকারণ এক যুবকের লাশ দেখা গেল রেলের ধারে পড়ে আছে। সুদত্ত নামে এক যুবকের লাশ যদি পড়ে থাকে—কেন পড়ে আছে, কী কারণ, এমন সব প্রশ্ন উঁকি দিতেই পারে। দিয়েও ছিল। মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে পুলিশ আর খবরের কাগজগুলি সেদিন তোলপাড় করে ফেলেছে। অথচ কেউ জানে না সে এসেছিল তার নারীর কাছে, কিংবা নারী তার কাছে গিয়ে বলেছিল, সুদত্ত বাড়ি থেকে পাত্র দেখছে। তুমি কিন্তু আমার উপর বিশ্বাস হারিও না।
সুদত্তের চোখ নির্বোধের মতো দেখাচ্ছিল অথবা স্থির এবং নিষ্পলক–মানে তুমি, তুমি সত্যি কী চাও আমি জানি না। এতদিন তবে এ ভাবে আমাকে জড়িয়ে রাখলে কেন? বিশ্বাস হারাবার প্রশ্ন আসে কী করে?
আমি জানি, সুদত্ত আমার মঙ্গল অমঙ্গল সব তোমার কাছে গচ্ছিত। কোনো অপকারই তুমি করতে পার না। আমি যদি হারিয়ে যাই, তুমি আমাকে খুঁজে বেড়িও।
সুদত্ত বলেছিল, বুঝতে পারছি না, কিছুই বুঝতে পারছি না। আমার জন্য তুমি কী রেখে যাবে তবে। স্মৃতি! বিশ্বাসভঙ্গ আমি করব না। কোনো এক অতীত থেকে উঠে আসা স্মৃতি বনলতাকে তোলপাড় করে দিচ্ছে। সে হাতড়াচ্ছে—হেতু সেই জানত–পাত্রপক্ষ যেদিন দেখতে এল, সেদিনও সে এতটুকু বিচলিত বোধ করেনি। বরং এমন সুপাত্র এবং দীর্ঘকায় সুন্দর পুরুষ তার হাত ধরে সংগোপনে কিংবা বন্য বাঘিনিকে পোষ মানাবার জন্য কী কাতর তার চোখমুখ। অংশুর বাবার চোখে আশ্চর্য ধার। তার শরীরের রোমকূপ আবার অগ্নিবর্ণ হয়ে গেলে, সে এক বিকেলে নীলার বাড়িতে যাবে বলে বের হয়ে পড়েছিল।
কে? দরজায় বাইরে কে দাঁড়িয়ে?
আমি বনলতা। তোমার কাছে মার্জনা চাইতে এলাম।
মার্জনা? কীসের মার্জনা! নাটকের সংলাপ যে! তুমি কী বলছ বুঝতে পারছি না! আমি কেন আর আগের মতো ঠাট্টা পরিহাস কিছুই করতে পারছি না। আমি জানি, সেই হিংস্র নরখাদক বাঘিনির কথা বললেই ব্যাকুল হয়ে উঠবে। গভীর প্রতীকী কথাবার্তা তুমি এমন করে বুঝতে, অথচ সেই তুমি আর অকুণ্ঠচিত্ত নও। ছলনা শেষে এ ভাবে মানুষকে ভারাক্রান্ত করতে পারে আমি জানতাম না। এগুলো সম্ভবত সুদত্তের সেদিনের ভাবনা।
সুদত্ত কোনো কথা বলেনি। মাথা নীচু করে বসেছিল। সে তার মুখ তুলে দেখেছে, চোখে জল। তার কোনো ভাষা ছিল না। নারী ছলনাময়ী টের পেয়ে সে নীরব হয়ে গেছিল। বালকের মতো অবোধ চোখে তাকিয়েছিল শুধু।
আমি যাই সুদত্ত।
এস। সে উঠে এসেছিল। বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে আবার ফিরে গেল। বনলতা ফিরে তাকায়নি। তাকালে কী হত জানে না। বিশ্বাসের দায় সঁপে দিয়ে চলে এসেছিল।
এই বিশ্বাসের দায় সুদত্ত অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। সে হঠকারী যুবকের মতো যদি সত্যি কিছু ফাঁস করে দেয়, তবে তার তুলির টানে কিশোরী আর ছবি হয়ে যাবে কী করে! সে ঠিক অন্য দিনের মতো বিকেলে বের হয়ে গেছিল। কাঁধে ব্যাগ। কেউ জানত না সে ভিতরে ভিতরে অস্থির। বাস-স্ট্যাণ্ডে দাঁড়িয়েছিল। কোন বাসে উঠতে হবে সে যেন বুঝতে পারছে না। কোথায় যাবে সে জানে না। আচ্ছন্ন এক যুবকের এই বেশবাস, চাউনি, মৃত মাছের মতো চোখ যার, হৃদয়হীন হয়ে আছে—কেউ জানে না, সুদত্ত সেদিন আর বাড়ি ফেরারও আগ্রহ বোধ করছে না। সে সব হারিয়েছে। সে বুঝে উঠতে পারেনি, বাসটা তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। যেন এমন কোথাও এক অজ্ঞাত জায়গার খোঁজে আছে সে যেখানে নিজেকে চিরদিনের মতো আড়াল করতে পারবে।
বনলতা শুনেছে, সুদত্তর লাশ পাওয়া গেছিল মসলন্দপুর স্টেশনের কাছে।
কেউ বলেছে, গাড়ি থেকে পড়ে গেছে।
কেউ বলেছে, দুর্ঘটনা। আর কিছু নয়। সুদত্ত মাঝে মাঝে ছবি আঁকার জন্য বের হয়ে পড়ত। কোনো শস্যখেতের পাশে বসে থাকত একা। চাষি রমণীর মুখ আঁকত। কিংবা শস্য রোপণের দৃশ্য। দূরের সেই আকাশ, কিছু গাছ কিংবা পাখি এ সবই ছিল তার ছবির বিষয়। পরম যত্নে স্কেচগুলি তার ঝোলায় ভরে, উঠে দাঁড়াত। বড় সুন্দর মনে হত তার কাছে মানুষের জীবনযাপন। এবং আগ্রহ আছে এক নারীর—যার আসার কথা, সে আসবেই, তার টেবিল ঘেঁটে বের করবে মনোরম সব ছবি—দেখে বলবে, কী দারুণ হাত! আর আশ্চর্য বনলতা দেখত, সব ছবিতেই আছে রমণীর মুখ, নানা রকমের, যেমন সুদত্ত তাকেই নানা বয়সে সব নারীর মধ্যে ধরে রাখার জন্য পাগল।
সুতরাং দুর্ঘটনা ঘটতেই পারে। অন্য কোনো কারণ থাকতে পারে, কেউ আবিষ্কার করতে পারেনি।
বনলতা সকালবেলায় কাগজে সুদত্তর খবর পড়ে বিমর্ষ হয়ে থাকত। কেউ এলে চকিতে উঠে দাঁড়াত। তারপর সেই সহজ ভঙ্গি, ইস সুদত্ত একটা পাগল। কী বোকা! ছবি আঁকার নামে এত ঘোর ভালো না। ঠোঁট উলটে বলত, এত অন্যমনস্ক হলে হয়! কারণ সুদত্তের বন্ধুবান্ধবেরাও দেখা করতে আসত। তারা তারও সহপাঠী। বোকা সুদত্তকে নিয়ে হাসি মশকরা পর্যন্ত শুরু হলে বনলতা বলত, আমি বলেছিলাম না তোদের, বাসে সে কখনো না দৌড়ে গিয়ে উঠবে না। ট্রেন ছাড়লে দৌড়ে ওঠার অভ্যাস। এত সতর্ক করেছি, শেষে যা ভেবেছিলাম, তাই হল।
