সুদত্তের অপমৃত্যু নিয়ে গায়ে একটা মাছি বসলেও সে টোকা দিয়ে উড়িয়ে দিত।
তোর সঙ্গে কবে শেষ দেখা?
অনেকদিন আসেনি আড্ডায়।
তুই তো ওর বাড়ি যেতিস, কিছু বুঝতে পারিসনি।
বাড়ি আবার কবে যেতাম! মাসিমা একবার যেতে বলেছিলেন, সুদত্ত বার বার বলত, মা তোমার কথা খুব বলে, তুমি গেলে মা খুশি হবেন, এসো, সেই একবার যাওয়া।
কারণ বেফাঁস কথাবার্তা বলে সে এই অপমৃত্যুর সঙ্গে নিজেকে জড়াতে যায়নি। গোপনে সে যে বারবার গেছে, ভিতর বাড়িতে মাসিমা, সে বাইরের ঘরে, সামনের বারান্দা পার হয়ে বড়ো কাঁঠাল গাছের ছায়ায় সুদত্তের ঘর—একা নিবিষ্ট মনে তার ছবি আঁকা, কিংবা মাঝে মাঝে যে চা দিয়ে যেত, বনলতা গেলে তা দেবার হুকুম ছিল না। ভিতরের দিকে দরজা বন্ধ থাকত। বাইরের দিকে জানালা-দরজা খোলা, তারপর পাঁচিল, এবং সামনে এক পরিত্যক্ত নিবাস ছাড়া কেউ সাক্ষী ছিল না তার উপস্থিতির।
বনলতা ঘড়ি দেখল।
অংশু কি অপুর কাছে পালিয়ে যায়! অংশু যদি কোনো কারণে বেফাঁস কিছু করে বসে, এবং যদি অপু বলে, দাঁড়াও না, তুমি এত অসভ্য, মাকে বলে দেব কারণ অপুর পড়ার ঘর নীচে। গোপনে অংশু যেতেই পারে—অথবা সহসা সেও কি হিংস্র নরখাদক বাঘিনির পাল্লায় পড়ে গিয়ে হতচকিত-কিংবা অস্থির হয়ে উঠেছিল—সে জানে গোপন অভিসারের মধ্যে আছে কীটের বাসা।
কে জানে সেই কীট-দংশনে অংশু বেহুশ হয়ে বের হয়ে পড়েছে কি না! যদি বের হয়ে যায়, কিংবা সুদত্তর মতো কোথায় যাবে স্থির করতে না পারে, তবে অন্য কোনো দূরবর্তী ট্রেনে চেপে যে বসেনি কে বলবে! মাথা ঠিক থাকে না। পাগল পাগল লাগতেই পারে এবং পারিবারিক মর্যাদা নষ্ট হবার ভীতি যদি পেয়ে বসে তাকে—তবে সে একটা কিছু করে বসতেই পারে। অংশু সতেজ গাছের মতো বেড়ে উঠেছে। চারপাশে ডালপালা পুঁতে বড়ো করে তোলা হচ্ছিল, যেন কোনো কারণে আগাছায় জড়িয়ে না ফেলে। কোনো পরগাছা তার শরীরে বাসা না বাঁধে কী প্রাণান্তকর সেই চেষ্টা—সব অংশু ব্যর্থ করে দিয়ে শেষে নিখোঁজ।
বনলতার কী মনে হল কে জানে, যেন এখনও সময় আছে হাতে—বের হয়ে পড়া দরকার, সে কিছু জানে না, যদি অপু জানে, তার একমাত্র এখন করণীয় সোজা অপুর কাছে চলে যাওয়া।
করজোড়ে বলবে, বল অপু, বল। অংশু কোনদিকে গেছে। তুই একমাত্র অংশুর খবর দিতে পারিস। তোর ওয়ার্ক এডুকেশনের খাতায় আমি যে চিঠি পেয়েছি। এমনি চিঠি, কিংবা চিঠিতে তোর কোনো সংকেত ছিল কি না, যা একমাত্র অংশু বুঝতে পারে—তোর সেই খাতার সাদা পাতাগুলি কোনোটাই সাদা নয়। হাজার হাজার অক্ষরের কিংবা বর্ণমালার সমষ্টি। যেমন আমার মুখ দেখে মা-বাবা টেরই পায়নি, সুদত্তের অপমৃত্যুর ব্যাখ্যা দিতে পারি একমাত্র আমি।
তোর মুখ কী সাদা পাতার মতো শূন্য—কোনো ভাষাই পড়া যায় না—আমাকে লুকোবি, ঘরপোড়া গোরু আমি—দ্যাখ কী করি, বলেই বনলতা উঠে সোজা সিঁড়ির দিকে নেমে যেতে গেলে, বাড়িসুদ্ধ লোকজন ছুটে গেল। মাথা ঠিক রাখতে পারছে না। তাকে আটকে দেওয়া হল। আর তখন চিকার, ছাড়, ছাড়ু, বলছি! আমাকে যেতে দাও! শেষ খবর সেই দিতে পারে। আমার অংশুর এক আলাদা সত্তা, আমি জানব কী করে। সে তো আমার কথা তার বাবার কথা ভাবল না। বলে সে হাঁটু মুড়ে বসে পড়ল।
আর গভীর রাতে দেখা গেল বনলতা কখন নিজেই নিখোঁজ হয়ে গেছে। কোথায় গেল কেউ জানল না! এমনকী অংশু ফিরে এসেও জানতে পারেনি। মা কেন বোকার মতো তাকে খুঁজতে বের হয়ে গেছে! সে ট্রেনে চড়ে মসলন্দপুর যাবে বলে রওনা হয়েছিল—ওখানে কে আছে জানে না, তবু সেই স্টেশনে একবার তার যাওয়া দরকার বোধ করেছিল। ট্রেন বে-লাইন হয়ে যাওয়ায় সে ফেরার রাস্তা হারিয়ে ফেলে।
আততায়ী
আজও টাকাটা নিয়ে ফেরত আসতে হল। এক টাকার একটা নোট তার মাথার মধ্যে এভাবে আগুন ধরিয়ে দেবে দু-দিন আগেও টের পায়নি। যেন নোটটা যতক্ষণ মানিব্যাগে থাকবে ততক্ষণই তাকে বিচলিত করবে। উত্তপ্ত রাখবে এবং অস্বস্তির মধ্যে দিন কাটাতে হবে। সামান্য একটা এক টাকার নোট এভাবে বিপর্যয়ের মধ্যে ফেলে দেবে সে ভাবতেই পারেনি। আজকাল এক টাকার দামই বা কী! কিচ্ছু না। কিন্তু এক টাকার নোটটা যেন তার সঙ্গে বাজি লড়ছে। নোটটা এবং সে।
আসলে জীবনে একজন প্রতিপক্ষ সবসময় এসে তার সামনে দাঁড়ায়। প্রতিপক্ষটি প্রথমে খাটো থাকে—ক্রমে সে হাত-পা বিস্তার করতে থাকে এবং একদিন এই প্রতিপক্ষই জীবনে চরম শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। দু-দিন ধরে এই নোটটা তার প্রতিপক্ষ, এটাকে বাজারে চালাতেই হবে।
সকালে বাজার করতে গিয়ে হাফ পাউণ্ড পাঁউরুটি কেনার সময় ব্যাগ থেকে খুঁজে নোটটা বের করে দিয়েছিল। আর তক্ষুনি দোকানির কাতর গলা, না স্যার চলবে না। কিছু নেই।
নেই মানে!
মাঝখানটা একেবারে সাদা। ন্যাতা হয়ে গেছে। কে দিল?
কে দেবে! বাসের কনডাক্টর। এক টাকার নোট পাওয়াই যায় না। নেবে না কেন? এক টাকার নোট অচল হয় না। আমি তো ঘরে বসে ছাপিনি! নেবে না কেন?
বাবু, বদলে দিন। দেব না। নিতে হবে। এক টাকার নোট অচল হয় না। আপনি পাঁউরুটি ফেরত দিন। অচল কি না জানি না। আমি নিতে পারব না। মাথা তার গরম হয়ে যাচ্ছিল। সেও দোকানির মতোই বলেছিল, ভাই কনডাক্টর নোটটা পালটে দাও। ছেঁড়া।
