বনলতা তার স্তন সম্পর্কে এ মুহূর্তে আর সচেতন নয়। বিবর্ণ মুখ। চুলে এলোমলো ঝড়ের দাপটে গ্রাহ্যহীন—ছুটে যাবার সময় আঁচল আবার পড়ে গেছে–একবার দেওয়াল ঘড়ির দিকে ঘোরের মধ্যে চোখ বুলিয়ে মুখ আরও ফ্যাকাশে। ফোন করতে গিয়ে হাত কাঁপছে। ছোটো বোন ধরে নিয়ে এসেছে ফোনের কাছে। বনলতা উবু হয়ে বসল। কিন্তু ডায়াল ঘোরাতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হবার মতো বসে থাকল বনলতা।
কাকে ফোন করবে?
বিনুকে।
বিনুকে করবে! আমরা করছি। উঠে এস।
কোনো রকমে বনলতা যেন উঠে দাঁড়াল। পাশে প্রায় শয্যাশায়ী সেই মানুষ—যে তার গভীর প্রপাতে অহরহ অবগাহন করতে অভ্যস্ত। এ মুহূর্তে সে মানুষ নীরব হয়ে গেছে। বুদ্ধিভ্রংশ হলে মানুষের এমন হবার কথা। বনলতার কি বুদ্ধিভ্রংশ হয়েছে। বিনর মেয়েটা তেরো চোদ্দো। এবং তেরো চোদ্দো বছরে কী কী হয়। নতুন উপসর্গ দেখা দেয়, তলপেটে ব্যথা হয়, আর কী হয়, জানালায় কোনো তরুণ হেঁটে যায়। যায় চোখ বিহ্বল থাকে—আর সব রহস্য, কিংবা কৌতূহল জেগে থাকে—যেন এই পৃথিবীর ঘাস মাটি উর্বর হয়ে আছে, দরকার কোনো দক্ষ চাষবাসের মানুষ। মাটি চষে ফেলবে, ফালা ফালা করে দেবে সব।
এ কি বনলতা এ মুহূর্তে সুদত্তের সেই কথাগুলিই যে আওড়াচ্ছে!
বোসো না!
বসতে পারি। হাত দেবে না। ছবি আঁকছ, আঁকো। তোমার ভারি খারাপ স্বভাব।
গোপনে চলে আস কেন তবে!
তোমাকে দেখব বলে। সারাদিন না, কী যে লাগে!
সোনা আমার। সুদত্ত চুমো খেল।
শরীর ঘেমে যায়। রোমকূপ সব অগ্নিবর্ণ হতে থাকে। আর প্রপাতে অস্পষ্ট ধারা। কোনো বনভূমির মধ্যে সে হাঁ করে আছে, প্রত্যাশার আগুন শরীরে, অথচ সচেতন সে তার পুষ্ট স্তন সম্পর্কে। তাকে সুন্দর করে বনফুলের মতো গোপনে ফুটতে দেওয়া ভালো। নাভির নীচে অগ্ন্যুৎপাত এবং শরীর অবশ হয়ে গেলে সুদত্তকে বলা, তোমাকে ছাড়া আমি কিছু সত্যি জানি না।
চাষবাসে ফালা ফালা করে দেবার ব্যাপারে কোনো আপত্তি থাকত না বনলতার।
তবে দেখাও।
কী দেখাব? কেন সেই—ওই যে, তুমি জেনেও এমন করো।
না বলতে হবে কী দেখাব!
আরে নরখাদক বাঘিনিটাকে। দেখাও না। কেমন সে গোপনে লুকিয়ে আছে। গভীর বনে। দারুণ, দারুণ।
আবার অসভ্যতা শুরু করলে?
সোনা আমার। লক্ষ্মী। বলেই জাপটে ধরা। এবং আশ্চর্য নীরব এক প্রবহমান সংগীত বেজে উঠতে থাকে শরীরে। কী যে হয়! যেন কোনো অতলে হারিয়ে যেতে যেতে জেগে যেত বনলতা। শাড়ি সামলে উঠে বসত। কিছুক্ষণ চুপচাপ হাঁটুর মধ্যে মাথা গুঁজে বসে থাকা। আর সুদত্ত সুচারু ভঙ্গিতে তুলির ছবি টেনে দিচ্ছে। মাত্র কয়েকটা রেখায় বনলতা ছবির মধ্যে জীবন্ত হয়ে থাকত।
ধর বিনু বলছে।
ফোনটা এগিয়ে দিতেই বনলতা কোনোরকমে বলল, অংশু আজ বাড়ি ফেরেনি। তোদের কাছে গেছিল!
বিনু বলল, বাড়ি ফেরেনি! কোথায় গেছে!
জানি না, কিছু জানি না। অপুকে দে!
অপু!
হ্যাঁ অপু। ওর সঙ্গে আমার কথা আছে।
আমি মাসিমা।
তুই! অংশু তোকে কিছু বলেছে?
না মাসিমা। ও তো কিছু বলেনি।
আজ গেছিল?
না মাসিমা।
মিছে কথা বলছিস! বল, ঠিক করে বল, তুই ওকে কিছু বলেছিস কি না!
অংশুও কি বলেছিল, দেখাও সেই নরখাদক বাঘিনিকে। কারণ বনলতা জানে, অংশু সিনেমা ম্যাগাজিনে গোপনে সব নায়িকাদের ছবি দেখে থাকে—আজ বনলতার মনে হচ্ছে একটা চিতাবাঘের মতো ছুটছে কেউ-সে এক নারী, শিকারি চিতাবাঘ যেমন হয়ে থাকে। সহসা বনলতা চিৎকার করে উঠল, অংশুর কিছু হলে কাউকে ক্ষমা করব না, কাউকে না। কাউকে…..।
কাকে এই তিরস্কার! পাশাপাশি মানুষজন হতচকিত। মাথাটা খারাপ হবার বোধ হয়।
উপক্রম! বনলতার মা বলল, এত উতলা হস না মা। ভগবানকে ডাক। কাকে ক্ষমা করবি না বলছিস!
বনলতা ছেড়ে দিল ফোন। হেঁটে গেল—যেন সব সে হারিয়েছে। এই হারানোর ব্যাপকতা এত অসীম যে সে অন্ধকার দেখছে। শুধু অন্ধকার—গভীর নীল অন্ধকার —এবং দূরে আবার সেই মানুষ হেঁটে যাচ্ছে। হাতে অতিকায় তুলি, আকাশের দেওয়ালে বড়ো বড়ো ছবি এঁকে চলেছে।
এই দেখ বনলতা, আহা বসো না, ঠিকঠাক হয়ে বসো। ঘাড় একটু বাঁকাও। ঊরু সামান্য তুলে দাও। হ্যাঁ ঠিক আছে। না, না দুই উরুর ভাঁজ স্পষ্ট থাকুক। আমার বাঘিনিকে দেখতে দাও। ছবি দেখ। জংঘা এবং নাভিমূলে আছে অনন্ত রহস্য। আমরা পুরুষেরা ছুটছি, ঈশ্বরের সৃষ্টি রক্ষা হচ্ছে। বাঘিনি বললে তুমি, তুমি এত ব্যাকুল হয়ে পড়ো কেন! তুমি নিস্তেজ হয়ে পড়ো কেন?
আসলে বনলতা টের পায় সঙ্গে সঙ্গে, একজন তরুণ যুবকের সান্নিধ্য অতিশয় মনোরম।
বাবার এক কথা, না, বাউণ্ডুলে ছেলে, ওর সঙ্গে মিশবে না।
কবে মিশলাম!
শুনেছি, তুমি ওর সঙ্গে চৌরঙ্গি দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলে! তুমি ওর বাড়িতেও যাও। আমার মান-মর্যাদার কথা ভাব!
আবার ফোন। কে! কে!
কাগজের অফিস থেকে। ওরা আসছে। সব খবর নেবে। রিপোর্ট করবে। অংশুর ছবি বের করে রাখো। পাশপোর্ট সাইজের ছবি দরকার। মেজদা দরজায় উঁকি দিয়ে কথাগুলি বলছে!
সব বলবে। কখন বাড়ি থেকে বের হয় কখন ফেরে, কোথাও বিকেলে কিংবা। সন্ধেবেলায় যায় কি না!
খবরওয়ালারা এল, চলে গেল। বড়ো দ্রুত যানবাহনের মতো গতি নিয়ে আসে যায় সব কিছু, তারপর অদৃশ্য হয়ে যায়, ছবি ভাসে শুধু—কেউ ফিরে আসে না। দরজায় খুট খুট শব্দ, হৃৎপিণ্ড লাফিয়ে ওঠে। বনলতা জানালায় বসে আছে। আকাশ আজও নীল এবং গভীর বেদনার প্রতিচ্ছায়া। কোনো এক করুণাময় যেন তুলি বুলিয়ে দিচ্ছে। তুমি সুদত্ত এভাবে প্রতিশোধ নিও না। আমার মতো অপুও বলছে, যায়নি। অংশু যায়নি। সে কিছু জানে না। আমি কি জানতাম, তোমার এই চলে যাওয়া শেষবারের মতো—আমি কী করব বল! কেউ চাইত না, আমি যাই।
