বনলতা প্রায় টলতে টলতে নেমে এল। ট্যাক্সি পেয়ে গেল সামনে। সোজা যে রাস্তায় অংশু বাসে করে ফেরে সেই রাস্তা ধরে গেল। কোথাও কোনো জটলা, কিংবা দুর্ঘটনা—ঘন্টা খানেকের তফাত-কিছু হলে বাস-রাস্তায় সে জানতে পারবে–এই ভেবে ট্যাক্সি থেকে মুখ বাড়িয়ে চারপাশ লক্ষ করছে। শরীরে প্রচণ্ড অস্বস্তি–সঙ্গে সঙ্গে কেন যে মনে হল অযথা দুশ্চিন্তা করছে। বাড়ি গিয়ে দেখবে, অংশু দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। মাকে দেখলেই বকাবকি শুরু করে দেবে। দু-একবার সে রাত করে ফিরেছে, তবে স্কুল ছুটি হলে সোজা বাড়ি, তারপর তার বের হওয়া। ছুটির দিনে ক্রিকেট ব্যাট লাল বল, কিংবা হাতে ব্যাডমিন্টনের র্যাকেট—তার প্রিয় খেলা আর প্রিয় সঙ্গী বই, সে তার এক নতুন জগৎ তৈরি করে নিচ্ছে বনলতা বুঝতে পারে। কখনো ভালো ইংরিজি বই দেখে। তবে কখনো সে না বলে কয়ে কিছু করে না।
কিন্তু, না অংশু ফিরে আসেনি। সে এবার আর পারল না। দাদাকে ফোনে জানাল, অফিসে অংশুর বাবাকে পেল না। মেজদার ফ্ল্যাটে ফোন করল। পিসির বাড়িতে–সবাই জেনে গেল অংশু আজ বাড়ি ফেরেনি। বনলতা ধীরে ধীরে দেখল, মানুষজনে ভরতি হয়ে যাচ্ছে। একতলা দোতালায় সব আত্মীয়স্বজন। দেয়াল ঘড়িতে রাত বাড়ছে। কাগজের অফিসে চলে গেল মেজদা।
হ্যালো মেডিক্যাল কলেজ—কোনো দুর্ঘটনার খবর। হ্যালো নীলরতন, আর জি কর, পি জি-না কোথাও কোনো দুর্ঘটনার খবর নেই।
সে স্কুলে আজ গেছে কি না এটাও জানা দরকার। অমলকে ফোনে পেয়ে গেল। সে বলল, অংশু ওর সঙ্গে টিফিনের পর বের হয়েছে। বাস ধরবে বলে বড়ো রাস্তার দিকে গেছে।
সুতরাং এসব ক্ষেত্রে যা যা করণীয় অংশুর আত্মীয়স্বজনরা করে যাচ্ছে-থানা পুলিশ, সর্বত্র খবর হয়ে গেল, আবার একজন স্কুলের ছাত্র বাড়ি ফেরেনি।
আশ্চর্য, বনলতা কাঁদতে পারছে না। বড়ো বড়ো চোখে শুধু দেখছে। সে থরথর করে কাঁপছে। আর অজস্র প্রশ্নের জবাব দিচ্ছিল।–বকাবকি করেছিলে?
না।
কিছু বলে যায়নি?
না না। রোজকার মতো গেছে। রোজকার মতো ফিরে আসবে—কিন্তু ফিরে এল না কেন?
অংশুর বাবা ওপাশের ঘরে ইজিচেয়ারে লম্বা হয়ে পড়ে আছে।
কেন ফিরে এল না! বনলতা কেন যে তার পাপের কথা ভেবে ফেলল—ঠাকুর দেবতা সবার কাছে মানত করার সময় মনে হল—কোনো দূরবর্তী উপত্যকায় কে একজন হেঁটে যাচ্ছে। সেই কি নিয়ে গেল! শত্রুতা!
সিঁড়ি ধরে কেউ উঠছে, কেউ নেমে গেল-বনলতার এক কথা, ওকে এনে দাও। আমি আর কিছু চাই না।
দ্রুত ট্রেন চলে যাচ্ছে। ট্রেনের দরজায় কেউ দাঁড়িয়ে। বনলতা যেন তাকে চেনে। সে মুচকি হেসে যেন বলে গেল, তাহলে এই। কেমন লাগছে?
কখনো কোনো পাপবোধ বনলতাকে তাড়া করেনি। অংশু ফিরে না আসায় সে
যে কী সব ছাইপাঁশ ভাবছে। এখানে-সেখানে খুঁজছে কিছু—যদি অংশু যাবার আগে চিঠি রেখে যায়। ওর মাসির বাড়ি যদি যায়—কিংবা এই বয়েসটা বড়ো দুর্ভোগের বয়স। কে জানে, ঠিক তার মতো কোনো নারীর ছলনায় অংশু পড়ে গেল কি না।
এই প্রথম মনে হল সে ছলনা করেছে। সুদত্ত যে আত্মঘাতী হল কেউ জানে, এমনকী সুদত্তের মাও জানত না কেন সুদত্ত আত্মঘাতী হল।
জানত একমাত্র বনলতা। ঠিক জানত বললে ভুল হবে, সে বুঝতে পেরেছিল, ভালোবাসা সূর্যের চেয়েও ব্যতিক্রম। আলোর উৎস নেমে আসে, অবগাহন চলে— সাদা জ্যোৎস্নায় ছবি হয়ে থাকে দুজন—এমন সব দৃশ্য বনলতার চোখে ভাসছে।
বনলতা খুঁজছিল। অংশুর ঘরে ঢুকে ওর বিছানা, টেবিল, নিজস্ব দেরাজ যা কিছু আছে। খাতা, ওয়ার্ক এডুকেশনের লাল নীল রঙের কার্ড বের করে সে পাগলের মতো খুঁজছে। কেমন বেহুশ। কেউ উঁকি দিয়ে দেখে যাচ্ছে, কেউ এলে বনলতা দৌড়ে সিঁড়ির রেলিং-এ ছুটে যাচ্ছে, যদি কোনো খবর। ফোন বেজে উঠলে টলতে টলতে গিয়ে কেউ ধরার আগেই ধরে ফেলছে।
হ্যালো!
সুদত্ত বলছি। কেমন আছ?
বনলতা কাঠ হয়ে গেল। ঝন ঝন করে রিসিভারটা পড়ে গেল নীচে। পড়েই যেত। পাশে পিসিমা ছিলেন বলে রক্ষে। ধরে ফেলেছেন। সবাই ছুটে এসেছে। বনলতার বাবা বললেন,
এ-ঘরে এনে শুইয়ে দাও।
বনলতা কেমন এক গভীর আচ্ছন্নতার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। সেই দূরবর্তী উপত্যকায় কি সত্যি কেউ থাকে!
বনলতা চোখ মেলে দেখল, বাবা-মা সবাই তার পাশে বসে। জিরো পাওয়ারের আলো জ্বলছে। পাশের বাড়ির জানালা বন্ধ করার শব্দ পেল। সিঁড়িতে আর কোনো পায়ের শব্দ নেই। কোনো খবরই কেউ দিয়ে গেল না। অংশু কোথায় গেল! অভিমান বড়ো সাংঘাতিক অসুখ। কিংবা বিনুর মেয়েটার সঙ্গে যদি ওর কিছু হয়? সহসা মনে হল, আরে সেই মেয়েটার খোঁজ নিলে হয়। ধড়ফড় করে উঠে বসলে বাবা বললেন, কোথায় যাবে! এত অস্থির হলে চলে। ঈশ্বরকে ডাক। আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব। কালই বিজ্ঞাপন যাচ্ছে টিভিতে। নিখোঁজ-অংশু নিখোঁজ। এত উতলা হলে চলে!
ছাড় আমাকে, ছেড়ে দাও।
বনলতার বেশবাস ঠিক নেই। আঁচলটা ওর মা কাঁধে তুলে দিয়ে বুক ঢেকে দিল। স্তনের মধ্যে রয়েছে মাতৃদুগ্ধ। বনলতা স্তন ঠিক রাখার জন্য সন্তানকে মাতৃদুগ্ধ খাওয়ায়নি। স্তন সুডোল এবং নিস্তেজ। শিরা-উপশিরা সব এখন ম্রিয়মাণ–পুরুষ আত্মীয়স্বজনের চোখে মা চায় না কন্যার এই পুষ্ট স্তন ভেসে উঠুক। এমনও হতে পারে স্তনের আছে এক আশ্চর্য গাম্ভীর্য। যা এখন যতই পরিস্ফুট হোক—বাসি ফুলের মতো অর্থহীন।
