মাথার মধ্যে অনবরত টেলিপ্রিন্টার—শ্মশান শোকমিছিল মর্গ মেলার ছবি। বাবলা মেলায় গিয়ে নাগরদোলায় চড়তে ভালোবাসত। বনবন করে ঘুরেছে। সে আর নন্দিতা বাবলাকে চেপে ধরে বসে আছে। বাবলা হাত নেড়ে সুখ পাচ্ছিল। বাবলার সমুদ্রতীরে একটা ছবি, সে তার বাবার দিকে ছুটে আসছে। অন্নপ্রাশনে বাবলার হিরের আংটি। বাবলার রুপোর ঝিনুক বাটি কিনতে একবার নন্দিতাকে নিয়ে বউবাজার গিয়েছিল। বাবলার পায়ে মল ঝমঝম করে বাজছে। টেলিপ্রিন্টারের খবর, অজ্ঞাত যুবকের লাশ—বাবলা নামক এক যুবক পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারিয়েছিল—সে যে বাবলা, শনাক্তকরণ হয়েছে! বাবলার পিতার নাম সুকেশ। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র। পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে বায়োডাটা। শ্মশানেও বায়োডাটা লাগে। টেলিপ্রিন্টারেও লাগে। কাজ পেতে গেলেও লাগে।
এ সময় সুকেশের রাগটা গিয়ে পড়ল ববলার দিদিমার উপর। বাবলা ফিরেছে। একটি মাত্র ‘ফিরেছে’ শব্দে শনাক্তকরণের কাজ আরম্ভ হয়ে গেছে মাথায়। পাঁচ সাতদিনের মধ্যে সে একবারও ভাবেনি বাবলার ফিরে আসা দরকার। অন্তত শনাক্তকরণের জন্য দরকার। পুলিশের গুলিতে সে যে মারা যায়নি তার জন্যও ফিরে আসা দরকার। কাল না হয় ছুটি নিয়ে একবার ঘুরে আসবে। যেমন সে চিঠি ঠিক সময় না পেলে মাঝে মাঝেই চলে যায়। একবার রুনুর দোকানে গেলে হয়। ট্রাংকল করলে হয়। কে ধরবে? অফিস বন্ধ। হোস্টেল বাড়িগুলো দূরে দূরে। কোনো যোগাযোগের বন্দোবস্ত নেই। অন্তত এই নির্বোধ অবন্দোবস্তের জন্য এডিটোরিয়াল পাতায় একটি চিঠি লেখা দরকার। টু-বি বাসটা ভরে গেল। ছাড়ছে। পাশেই সুন্দরী মহিলা। দুশ্চিন্তার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য মহিলার হাতে ক-টা কাচের চুড়ি আছে গুণতে থাকল। তারপর কানের দুলে কটা পাথর। সহজেই অন্যমনস্ক হওয়ার এগুলি তার নির্দিষ্ট উপায়। ও বাবা, এ দেখছি আবার ফুলে ফেঁপে যাচ্ছে। গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা। পেট চিরলে জরায়ুর কাছাকাছি জায়গায় জল পাওয়া যাবে। কত কাছাকাছি কত আলাদা। দুটোই ত্যাগের ক্ষেত্র। একটি সঙ্গে সঙ্গে সরে যায় অন্যটি আজীবন লেপটে থাকে। বড়ো হয়। ঝিনুক বাটি লাগে। দুঃখে হতাশায় হাহাক্কার হাসি এসে যাচ্ছিল। সে চট করে হাসিটাকে চেপে দিল—এর নাম তবে পাগল হয়ে যাওয়া। বিয়ের জন্য পাগল হয়ে যাওয়া, বাবলার চিঠি না পেলে পাগল হয়ে যাওয়া, ঝিনুক বাটি কেনার জন্য পাগল হয়ে যাওয়া, মস্তিস্কে কত সব মন্ত্র পোরা—টেলিপ্রিন্টারে কত আর খবর আসে! জীবন্ত টেলিপ্রিন্টার মাথার মধ্যে অনবরত খবর পাঠাচ্ছে। সুন্দরী মহিলার যোনির ভাঁজও খবরে ভেসে উঠল। সে চমকে গেল। দুশ্চিন্তার মূলে ওই জোনাকি পোকাটি।
সেদিন সুকেশ বাড়ি ফিরেছিল পর্যদস্ত মানুষ হয়ে। বাড়ি গিয়ে দেখল বাবলা খাবার টেবিলে মনোযোগ দিয়ে খাচ্ছে। নন্দিতা তাকে আর এক টুকরো মাছ দেবে কি না বলছে। সুকেশ কোনো রকমে ভিতরে ঢুকে বলল, তুই! কলেজ ছুটি!
ছুটি!
কীসের ছুটি, কেন ছুটি কিছু বলতে পারল না। কেবল বলল, সঙ্গে আইডেনটিটি কার্ডটা রাখিস তো? ওটা রাখিস। দিনকাল বড়ো খারাপ।
সুকেশ তারপর লম্বা হয়ে গেল বিছানায়। তার ঘুম পাচ্ছে বড়।
ট্রেন বে-লাইন হলে
স্কুল ছুটি হয়ে গেছে অথচ সে ফিরে যায়নি। বনলতা বিড়বিড় করে বকছে। কেমন হিম হয়ে গেছে শরীর। দারোয়ানকে রিকশা ডেকে দিতে বলার জন্যও যে শক্তির দরকার তাও সে হারিয়েছে। অংশু তো কোথাও যায় না। স্কুল ছুটি হয়ে গেছে, সে গেল কোথায়! কেমন বিবর্ণ হয়ে যাচ্ছে তার চিন্তাভাবনা! কী করবে! কোথায় যাবে—কাকে ফোন করবে। মাথাটা ঝিমঝিম করছে, পড়েই যেত—কারণ, যেভাবে রোজকার কাগজে রোমহর্ষক মর্মান্তিক ঘটনার খবর বের হয়, তেমনি কোনো খবর যদি অংশু হয়ে যায়, তার পড়ে যাওয়া ছাড়া আর কি করার থাকবে।
আসলে বনলতা কিছুই ভাবতে পারছে না। কেমন শুধু অন্ধকার দেখছে। তার যে আরও কিছু প্রশ্ন করা উচিত ছিল, সে বোধও হারিয়ে ফেলেছে। প্রধান শিক্ষক আছেন কি না, তিনি যদি কিছু জানেন, কিংবা কাউকে কোনো খবর দিয়ে যদি সে কোথাও যায়, দারোয়ানকে বলে গেলে সে অবশ্য বলেই দিত-তবু কিছুটা হেঁটে এসে রাস্তায় দাঁড়ালে প্রথম যে করণীয় কাজ, ওর বাবার অফিসে ফোন, অংশু বাড়ি ফিরে যায়নি।
এতটা উদভ্রান্ত যে রাস্তা পার হতে পর্যন্ত পারছে না—রিকশা নেই, ট্যাক্সি যদি পাওয়া যায়—কিছুটা আলগা জায়গায় স্কুল, ট্যাক্সি বড়ো আসে না। স্কুল ছুটির সময় কিছু রিকশা মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু এই মুহূর্তে দুজন ঢ্যাঙা লোক সেখানে দাঁড়িয়ে গল্প করছে ছাড়া কোনো দৃশ্য ভেসে উঠছে না। একটু এগিয়ে গেলে ওর সহপাঠী কুন্তলকে পাওয়া যেতে পারে। এটা তো তার আগেই মনে হওয়া উচিত ছিল। আসলে সে তার স্বাভাবিক বুদ্ধি হারিয়েছে। কেমন মাথা ঘুরছে, দাঁড়াতে পারছে না সে। রোজই অংশু বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত বার বার ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে—উঁকি দেয়, আর আতঙ্কে ডুবে যেতে থাকে— আজ সেই অদৃশ্য আতঙ্ক তাকে সত্যি জড়িয়ে ফেলেছে, আগে ফোন করা দরকার, না, কুন্তলদের বাসায় খোঁজ নেবে! যদি সেখানে যায়—সামনে টেস্ট, দুজনের মধ্যে খুব ভাব। হয়তো গিয়ে দেখবে সেখানে সে বসে আছে। অফিস থেকে সাতটার আগে বের হতে পারে না মানুষটা। অযথা দুশ্চিন্তায় ফেলে দিয়ে কী লাভ! আগে কুন্তলদের বাড়ি। বাড়ি গিয়ে দেখল, দরজা-জানালা বন্ধ। সদরে তালা দেওয়া। পাশের ফ্ল্যাটে একজন মুখ বাড়িয়ে বলল, ওরা দুদিন হল নেই।
