ঘচাঘচ কপির দুটো একটা রেখে গেঁথে দিল। হরিজন নিগ্রহের খবরটা থাক। পরে আরও খবর আসবে। লিড এলে সাজিয়ে রাখবে। বাইশ বছর আগে বাবলা বলে তার কেউ ছিল না। নন্দিতা ছিল না। লিজি ছিল না। বাইশ বছরে সে যে সংসারে একজন সবচেয়ে বড়ো ক্রীতদাস আজ এটা টের পেল। একটা আস্ত দুর্ভাবনা দুশ্চিন্তার ক্রীতদাস। তার জন্য তাকে আফ্রিকার জঙ্গলে ঢুকতে হয়নি। কেউ তাকে চেন বেঁধে নিয়ে যায়নি—নিজের চেন হাতে গলায় ঝুলিয়ে যোলো আনা সং সাজা গেছে।
আসলে এগুলো তার নিজের সঙ্গে নিজের তর্ক। দু-একটা কাগজ অফসেটে বের হয়। সেই কাগজগুলির ছবি স্পষ্ট দেখা যেতে পারে। অফসেটে ছাপা মুখ সে চিনতেও পারে। কপি সরিয়ে আবার কাগজে হামলে পড়ল। পায়ের দিক থেকে পেল। যুবকের লাশ দুটি ঘুণাক্ষরেও কি ভেবেছিল, খবরের কাগজ থেকে এত রকমের অ্যাঙ্গেলে ছবি নেওয়া যায়। দূরে পুলিশ ব্যাটন হাতে রাইফেল হাতে, মোচে তা দিচ্ছে। কে জানে কার ছেলে, শেষে হয়ত খবরে বের হবে যে বেটা গুলি চালিয়েছিল তারই সবে ধন নীলমণি। একবার কাছে গিয়ে সবারই দেখা দরকার— কার বাপের ছেলে এভাবে মরে পড়ে থাকল। এখনো পর্যন্ত শনাক্ত হল না, তাজ্জব ব্যাপার। বাপ না থাক, দাদা পিসি মাসি দিদিমা কত কেউ থাকতে পারে। একজন যুবক নাড়ি ফেরেনি, অথচ সংসারে সব ঠিকঠাক চলছে ভাবাই যায় না। তার হলে পাগল হয়ে যাবার কথা। থানা পুলিশ, হাসপাতাল ট্রাংকল খোঁজাখুঁজিতে সে তোলপাড় করে দিত সব। সুতরাং যুবকটি এখান থেকে বাড়ি ফিরবে বলে রওনা হয়েছিল, জ্যাম, মিছিল সব মিলে তাকে নিয়তির গ্রাসে ঠেলে দিয়েছে, এ-মুহূর্তে তার কি করা দরকার ভেবে পেল না। বাবলা বাড়ি ফিরেছে। টিটিভ পাখির মতো কেউ ডেকে যাচ্ছে অনবরত। কেমন অস্থির হয়ে পড়ছে ভিতরে ভিতরে। একবার বাবলার কঠিন অসুখ হয়েছিল, তখনো বড়ো অস্থির। বাবলার চিঠি পেতে দেরি হলে অস্থির। রাস্তাঘাটে যে-কোনো জায়গায় দুর্ঘটনা ও পেতে থাকে। বাবলা বাড়ি এলে পকেট সার্চ করে দেখা হয় সঙ্গে আইডেনটিটি কার্ড রেখেছে কি না, প্রায়ই রাখে না, তখন সুকেশের মাথা গরম হয়ে যায়, থম মেরে বসে থাকে কিছুক্ষণ। ছেলে বড়ো হয়েছে মারধোর করা যায় না। শাসনের প্রক্রিয়া নতুন নতুন উদ্ভাবনের দরকার হয়। ইদানীং শরীর ভালো যাচ্ছে না তার, বুকের বাঁ ধারটায় ব্যথা। ডাক্তারের পরামর্শ মতো চলছে। দুশ্চিন্তা দুর্ভাবনা করা বারণ। সেই কথাটাই তুলে শাসনের নতুন প্রক্রিয়া হিসাবে কাজে লাগায়, বাবলা তুই আমাকে আর বেশিদিন দেখছি বাঁচতে দিবি না। দুর্ভাবনায় যত জটিল রোগ জন্মায়, সব সময় উদ্বিগ্ন থাকলে মানুষ বাঁচে! বাবলার এককথা—তুমি অযথা দুর্ভাবনা করলে আমরা কী করব? চিঠি পেতে দু-পাঁচদিন দেরি হলে ছুটে যাবে। সময় মতো চিঠি কে পায়?
সত্যি সময় মতো চিঠি কেউ পায় না। পুলিশের গুলিতে মৃত যুবকেরাও ঠিকমতো চিঠি পায়নি। চিঠি পেলে আগেই সরে পড়ত। যথাসময়ে এই চিঠি পাওয়া নিয়েই মানুষের যত বিড়ম্বনা। সে দেখল এ-সময় এত দুর্ভাবনার মধ্যেও একা শিফট চালিয়ে দিয়েছে। তার এখন ওঠার সময়। বিকেলের শিফটের দু একজন এসে গেছেন! সে একজনকে বলল, দাদা কার্জন পার্কের লাশটাকে পুলিশ কোথায় রাখতে পারে?
বিষয়টা বোধগম্য হয়নি। কার লাশ?
যাকে শনাক্ত করা যায়নি।
মর্গ ছাড়া আর কোথায় রাখবে?
সেই ত মর্গ ছাড়া আর কোথায় রাখবে। বিপদে মানুষের বুদ্ধিভ্রংশ হয়, তার এ সময়ে বুদ্ধিভ্রংশ স্মৃতিভ্রংশ সবই হয়েছে। তা না হলে বাবলা কবে গেছে, রোববার সোমবার, নাকি শনিবার কিছুতেই মনে করতে পারছে না কেন। প্রেসিডেন্সি কলেজের পেছনটাতে একটা মর্গ আছে। তার মনে আছে কে একজন যেন চুপি চুপি পথটা পার হবার সময় বলেছিল, জানেন এখানটাতেই চারু মজুমদারকে রাখা হয়েছিল। সে প্রশ্ন করেছিল, এখানটাতে মানে? লোকটা তার জ্ঞানের বহর দেখে হেসে দিয়েছিল। রোজ রাস্তাটা পার হয়ে যান, জানেনই না এখানে একটা মর্গ আছে। মর্গ কেমন হয়। নীলরতন হাসপাতালে একটা মর্গ আছে। সব হাসপাতালেই বোধ হয় থাকে। পাড়ার জলে ডোবা এক যুবতীর লাশ খুঁজতে গিয়ে কী কী দেখেছিল বিস্তারিত একজন একবার তাকে বলেছিল। বড়ো বড়ো সব দেরাজ। টানলেই কিম্ভুতকিমাকার ফোলা ফাঁপা লাশ বিকৃত মুখে বের হয়ে আসে। বাবলারটাকে বের করবে! পাঁচ সাতদিনে সে তো আর বাবলা নেই। জামা প্যান্ট দেখে চেনা যায়। বাবলা ফিরেছে কি না খবরে এমন বুরবক হয়ে গেছে—এখন তাও মনে করতে পারছে না। বরং বাবলা নিখোঁজ হলে মর্গ খুঁজে দেখবে তার মামারা। তার পক্ষে খুঁজে দেখা সম্ভব হবে না। তার আগেই ভিরমি খাবে। এখন মনের মধ্যে তার ওই খোঁজা নিয়ে তোলপাড় হবার সময় দেখলে সে টু-বি বাস স্ট্যান্ডে এসে হাজির। তাকে রোজ টালিগঞ্জে ফিরতে হয়। এখান থেকে এক বাসে যাওয়া যায় না। যাবার সময় একবার কার্জন পার্কে নেমে গেলে হয়। লালবাজার ঘুরে গেলে হয়। বাড়িতে গিয়ে সে সারাটা সন্ধ্যা অস্বস্তিতে কাটাবে। বাবলা ফুলে ফেপে পড়ে আছে।–সে যে কী করে!
চিন্তা বিষয়টা এমন যে একবার মাথার মধ্যে ঢুকে শত সহস্র ফণা হয়ে ভেসে ওঠে। টেলিপ্রিন্টারের মতো সহস্র খবরের একটা কবরখানা হয়ে যায়—অজস্র প্রেতাত্মার ছড়াছড়ি। এই চিন্তার ভিতর সে দেখল কখনো মর্গে দাঁড়িয়ে আছে কখনো শ্মশানে। তবু শনাক্ত করতে পারছে না এই তার বাবলা। একটি আখাম্বা যণ্ড এবং পুষ্ট গাভির ফসল। বিশ বছর লালন-পালন করার পরও বাবলা তার সঙ্গে মশকরা করছে—বাবা আমাকে তুমি চিনতে পারছ না, আমার আইডেনটিফিকেশানে এত গণ্ডগোল! আত্মীয়স্বজনরাও বলবে এ-কেমন বাবারে— পুত্রের মুখ চিনতে এত বিলম্ব! সে বলল, কী করে জানব মাত্র পাঁচ-সাতদিনে বাবলা আমার ব্লাডারের মতো ফুলে ফেঁপে যাবে। বিশ বছর ধরে প্রোটিনযুক্ত খাবার খাইয়েও যা করতে পারিনি, পুলিশ লাশ বানিয়ে দিয়ে কত সহজে তা করে ফেলেছে।
