না এমনি। কার্জন পার্কে পুলিশ কবে যেন গুলি চালিয়েছিল?
তা দিয়ে কী হবে?
সুকেশ বলতে পারল না, এইমাত্র বাবলার দিদিমা বাবলার খোঁজ করছিল। সে বাড়ি এসেছে কি না জানতে চেয়েছে, বাড়ি না ফিরলে, মানুষ ভাবতেই পারে, লাশ শনাক্ত করা দরকার। সে শুধু বলল, আপনার খেয়াল নেই।
ফাইল দেখুন না!
অত জরুরি নয়। দেখছি না মতো মুখ করে সে বলল, আমরা সবাই কত সহজে সব ভুলে যাই।
কী ভুলে যাই?
এই খবরগুলি, সবাই আমরা। এই সেদিন, পাঁচ-সাতদিনও হয়নি, কার্জন পার্কের সামনে দুটো যুবকের লাশ। কত রকমের অ্যাঙ্গেল থেকে ছবি! কাগজের প্রথম পাতায় ব্যানার। কলকাতা তপ্ত। যুবকের লাশ তদন্ত কমিশন কত কিছুর দাবি। গতকাল কার্জন পার্ক হয়ে এলাম। মনেই নেই এই সেদিন, রক্তের তাজা গন্ধ, নাক টানলে যার ঘ্রাণ টের পাওয়া যায়-তার বিন্দু বিসর্গ মনে উঁকি মারল না। এতটুকু বলার পরই সুকেশ থেমে গেল। আসলে আকাশবাণী থেকে ফেরার সময় এক সুন্দরী যুবতীর সৌন্দর্য উপভোগ করার তাগিদে কে সি দাস পর্যন্ত সে হেঁটে এসেছিল। মনের এই তপ্ত নিদাঘের আকর্ষণ বাবলার মা জানে না, পৃথিবীর কেউ জানে না। যুবকের লাশ একজন যদি…না না, সে হবে কী করে! যুবতীরা কত সহজে যুবকদের লাগাম টেনে রাখে। সে অন্যমনস্ক হতে চাইল।
সুকেশ বলল, এই রাখহরি।
আজ্ঞে যাই।
কাগজের ফাইলটা দে।
কোন কাগজের ফাইল।
সব, সব কটা।
নীচ থেকে প্রিন্টার উঠে এসে বলল, কপি পাঠান।
পাঠাচ্ছি। বলে দেরাজ থেকে কিছু উত্তরবঙ্গের কপি বের করল। একসেস থেকে পেয়ে গেল দুটো বিহার এবং ওড়িশার খবর। যাক! সে বলল, এতেই মনে হয় পাতা ভরে যাবে।
প্রিন্টার হেসে বলল, ভরে যাওয়া নিয়ে কথা।
সত্যি ভরে যাওয়া নিয়ে কথা। সামনে সেই আখাম্বা ষণ্ডটি দাঁড়িয়ে—পুষ্ট গাভির ছবি এই রকমের। প্রিন্টার চলে গেলে ফাইলগুলির একটা টানতেই খবরটা বের হয়ে এল। গত সোমবার। আজকে শনিবার। সত্যি কলকাতা কী গভীর কল্লোলিনী! সব ভাসিয়ে নেবার জন্য হাঁ করে আছে।
আসলে দুজন যুবকের মৃতদেহ কলকাতার বুকে পুলিশের গুলিতে এত তাড়তাড়ি হাপিজ হয়ে যেতে পারে সুকেশ ভাবতে পারল না। বাবলা কবে বাড়ি থেকে গেছে। রোববার, রোববারই-তো! সে ক্যালেন্ডারের পাতা দেখল মাথার কাছে, তারিখ, দেখল রোববার না সোমবার! মাথাটা যে কীঘিলু দিনকে দিন ভারি হয়ে যাচ্ছে। স্বচ্ছ আয়নার মতো নয়। রোববার না সোমবার বাবলা বাড়ি থেকে গেছে। ধুস যত স্নায়বিক দুর্বলতা! বাবলার দিদিমা কি সকালের কাগজে দেখেছে—পুলিশের খবর—লাশ এখনও শনাক্ত হয়নি! বাবলার দিদিমার কি তখন বাবলার কথা মনে পড়েছে। পুলিশ রিপোর্টে আছে ছিমছাম চেহারা, গায়ে ফুলশার্ট স্যাণ্ডো গেঞ্জি। পায়ে কী আছে! চপ্পল না সু! বাবলা সু পরতে অভ্যস্ত। মাথায় টোকা মেরে মনে করার চেষ্টা করল, স্যু না চপ্পল! বাবলা যাবার সময় সে আর নন্দিতা দরজায় দাঁড়িয়েছিল। যাবার সময় বাবলার সব দেখেছে—অথচ এখন কেমন সব কিছুতেই সংশয়। হাফশার্ট পরে বাবলা, ফুলশার্টও পরে। সেদিন কী পরে গেছে! রাখহরি ফাইলের পাহাড় রেখেছে সামনে। দুজন যুবকের ছবিই বের হয়েছিল কাগজে। একজন চিৎ হয়ে পড়ে আছে, অন্যজন কাত হয়ে। একটা কাগজের ছবি মাথার দিক থেকে ভোলা। সে উপুড় হয়ে দেখার চেষ্টা করল। দুজন যুবকের মধ্যে একজনের মুখ বেশ স্পষ্ট। সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখল, না এই মুখ বাবলার নয়। আর একটা ছবিতে কোনো যুবকের মুখই স্পষ্ট নয়। সে একজনকে শনাক্ত করেছে—এটা বাবলা নয়। আর একজনকে শনাক্ত করতে না পারলে বুকের মধ্যে যে দাপাদাপি চলছে এটা কিছুতেই কমবে না। ট্রাংকল করে একবার বাবলার খোঁজ নিলে কেমন হয়, বাড়িতে শুনলে হাসাহাসি করতে পারে, তোমার বাড়াবাড়ি। কার্জন পার্কে বেআইনি মিছিল ঢুকেছিল সোমবার। বাবলা রোববারে বাড়ি থেকে গেছে, সকালের ট্রেনে গেছে, সোমবারে ল্যাব আছে। ল্যাব থাকলে বাবলা কিছুতেই ক্লাস কামাই করতে চায় না। গত তিনটে সেমিস্টারেই বাবলা খুব ভালো নম্বর পেয়েছে। সুকেশ বলে দিয়েছে শুধু ফার্স্টক্লাস ইনজিনিয়ার হলে দাম নেই, অনার্স মার্ক রাখতে না পারলে সঙ্গে সঙ্গে চাকরি পাওয়া কঠিন। বাবলার পক্ষে রোববারে গিয়ে সোমবারে কলকাতায় আসা অবিশ্বাস্য ঘটনা! বাবলা–রোববার গিয়ে সোমবারে কলকাতার লাশ হবার জন্য ফিরতেই পারে না। সে হুংকার দিয়ে ডাকল রাখহরি, কি করছিস? কপি নামা।
রাখহরি টেলিপ্রিন্টার থেকে কপি নামিয়ে কেটে বেশ কায়দা করে ভাঁজ করে রাখল। তিনটে দুর্ঘটনার খবর, ট্রাক উলটে, বাস দুর্ঘটনায়, জলে ডুবে। এর যে কোনো একটা একদিন তার নিজের জীবনেই ঘটে যেতে পারে। বিশ-বাইশ বছর ধরে সে যা কিছু করেছে সবটাই মনে হয় আহাম্মকের কাজ। এই যে ভুতুড়ে ভয়টা মাথার মধ্যে ঢুকে গেল, সেটা বাবলা স্বয়ং হাজির না হলে মিটবে না। চিঠি পেলে বুঝতে পারবে, বাবলার চিঠি। কিন্তু বাবলা যে রোববারে গিয়েই চিঠিটি লিখে রাখেনি কে বলবে। কলকাতায় বাবলার সহসা আসার কী কী কারণ থাকতে পারে? দু-বছর হল বাবলা বাড়ি ছাড়া। বাবলা তাকে না জানিয়ে কলকাতা ঘুরে গেছে মনে পড়ছে না। দু-বার অকারণে ঘুরে গেছিল—কিন্তু তখনও বাড়ি হয়ে গেছে। সে যদি অকারণে বন্ধুবান্ধবের পাল্লায় পড়ে চলে আসে এবং মিছিলের টানে কার্জন পার্কে চলে যায়।–এসব সুকেশ খুব দূরবর্তী ছবির মতো আন্দাজ করার চেষ্টা করল। আসলে মানুষের এত দুর্ভাবনার মূলে সে নিজে।
