তারপরই লকার খুলে বললাম, দেখতো কম্বলটা কেমন হয়েছে! শীতের সময় মা-র খুব কষ্ট। শীতে মা কষ্ট পান বলে এটা কিনে দিয়েছি! ভালো হয়নি।
ও দেখে আমার কী হবে। সে মুখ ফিরিয়ে আরও বিরক্ত প্রকাশ করে ফেলল। তারপরই কেমন চিৎকার করে বলার মতো, কেন ওসব দেখাচ্ছ। আমি তোমার মা-র কম্বল দেখতে জাহাজে উঠে আসিনি। প্লিজ। তুমি আমাকে আর খাটো করো না।
আমিও কেমন পাগলের মতো বলছিলাম, লেসি প্লিজ গাউনটা পরে ফেল। তোমার দিকে তাকানো যাচ্ছে না।
লেসি তখন উন্মত্তের মতো বলে যাচ্ছে, না, না, তুমি আমাকে ঘৃণা করছ। আমি মনে কর কিছু বুঝি না। আমার সত্যি কোনো রোগ নেই।
সে আমার সামনে এসে দাঁড়ালে আমার মা-এর কম্বলটা দিয়ে ওর নগ্ন শরীর ঢেকে দিয়ে বললাম, পাগলামি করো না। গাউনটা পরে ফেল।
সে এবার আমার হাত টেনে ধস্তাধস্তি শুরু করে দিয়েছে। বলছে, আর দেরি নেই। আমাদের নামিয়ে দেবে। শিগগির কর। আর যাই কর, তুমি আমাকে প্লিজ ঘৃণা করো না।
বললাম, লেসি আমি তোমার উপার্জনে সাহায্য করতে পারলাম না। দুঃখিত। এটা নাও। তোমকে দিলাম। ঘৃণা করলে আর যাই করি মার জন্য কেনা কম্বলটা তোমাকে দিতে পারতাম না।
সে কম্বলটা নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরল।
বলল, সত্যি দিচ্ছ।
হ্যাঁ। কেন বিশ্বাস হচ্ছে না!
এত দামি কম্বল! আমি যে তোমাকে কিচ্ছু দিতে পারলাম না।
বললাম, কেন ফুলইতো দিয়েছ। এর চেয়ে সুন্দর পবিত্র আর কী থাকতে পারে। একজন পুরুষতো নারীর কাছে এর চেয়ে বেশি কিছু পেতেও চায় না।
দেখি লেসি কাঁদছে। কম্বলে মুখ লুকিয়ে হাউ হাউ করে কাঁদছে।
এই অপরাহ্ন বেলায় আজকাল মেয়েটির মুখ কেন যে এত বেশি মনে পড়ছে তাও জানি না। যৌন সংসর্গ না করলেও সেদিনই জীবনে প্রথম যৌন সম্ভোগ কী টের পেয়েছিলাম। অপরাহ্ন বেলায় তাও মনে করতে পারি।
টেলিপ্রিন্টার
সে প্রথমে একটা হাই তুলল। তারপর এক গ্লাস জল চাইল রাখহরির কাছে। এসে বসতে না বসতে তিনটি ফোন—একজন জানতে চেয়েছে রাজীব রাজনীতিতে সত্যি আসছে কি না। একজন কাটোয়ার ট্রেন দুর্ঘটনা—অন্যজন। বিয়েটা কেমন হবে। তিনটি প্রশ্নই একজন মানুষকে পাগল করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। সে, সে-জন্য পাগল হবার হাত থেকে রক্ষা পাবার জন্য তখনই জবাব দিয়েছিল—জানি না। খবরের কাগজে এমন জবাব দিলে চাকরি যাবার কথা। কিন্তু ফোন তো—কোনো সাক্ষ্য নেই। একজন আবার ত্যাঁদড় বেশ—নাম জানতে চায়। সে এড়িয়ে যাবার জন্য বলেছে আমি একজন সাব-এডিটর। তারপর ফোন ছেড়ে দিয়েছে।
এক গাদা বাসি কাটা খবর টেবিলে ডাঁই করা। আগে একটা মর্নিং শিফট ছিল। সকালে একজন এসে যা গাঁথার গেঁথে দিত, যা রাখার ওয়েট চাপা দিয়ে রেখে যেত। নুন শিফটে ডাকের কাগজ বের হয়। লোড শেডিং বলে একটার আগেই পাতা ছাড়ার নির্দেশ। সে ঘড়িতে দেখল সাড়ে দশটা। মর্নিং শিফট উঠে গেছে, লোকজন কম। কম লোজন দিয়ে গুছিয়ে কাজ করানোর জন্য, এর চেয়ে ভালো পন্থা ছিল না। সাড়ে দশটার মধ্যে সবাই চলে আসবে। সবাই বলতে আর একজন। চার জনের শিফট। একজনের অফ একজন দেশে গেছে। বলে গেছে আসতেও পারে নাও পারে। ক্রিডে রেপের খবর—আবার কোথায় রেপ! বাকিজন আসার আগে রেপের খবরটি দেখার তার ভারি উৎসাহ জন্মাল। বিহারে বালিকা ধর্ষণ। পুলিশ ফুসলিয়ে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছে। বালিকার বয়স সতেরো। সতেরো বছরের বালিকা কথাটার মধ্যেই সে কেমন ধর্ষণের ঘ্রাণ পেল। সতেরো বছর বয়েস মেয়েদের পক্ষে সবচেয়ে বড়ো সুসময়। সুঠাম শরীর এবং গ্রীবা সহ নারীর জ্যান্ত এক ছবি তখন দুলছিল চোখে। এই বয়েসটাও যে নারীর কামুক গন্ধে গলিত শবের মতো পচে থাকে, নিজের বাপকে দেখে সে টের পেত না। তার নিজের মেয়ের বয়স এগারো। ছেলের বয়স কুড়ি। সে ছেচল্লিশ বছরের। সে যখন বিয়ে করে, বউ-এর বয়স ছিল মোলো। যোলো আর চব্বিশ-বাবা বলেছিল, খুব মানানসই। এখন তার বিশ বছরের ছেলে বাইরে থাকে। মাননসই এই কথাটায় তার চোখের উপর একটি আখাম্বা ষাঁড় এবং পুষ্ট গাভীর অবয়ব ভেসে উঠতেই আবার ফোন’সুকেশ বলছ?
কিছু কিছু গলার স্বর তার ভারি চেনা। ফোন তুললেই বুঝতে পারে কার গলা। শাশুড়ি ঠাকুরুনের ফোন।–বাবলা বাড়ি এসেছে!
না তো!
আসেনি!
না তো। এই তো সেদিন গেল। এখন তো ছুটি নেই।
অঃ। তোমরা ভালো আছো?
হ্যাঁ মা, ভালো আছি।
নন্দিতা?
ভালো।
একদিন তোমরা এসো!
যাব। সুকেশ ভুলেই গেছিল, তিনি ভালো আছেন কি না জানা হয়নি। পৃথিবীর সবাই সে ভালো আছে কি না জানতে চাইবে—আর সে কারও ভালো থাকার কথা জানবে না সে হয় না। খুব গাঢ় গলায় বলল, মা, আপনি ভালো আছেন!
হ্যাঁ বাবা চলে যাচ্ছে।
সুকেশের কিছু খারাপ স্বভাব আছে, সে এটা বুঝতে পারে। নন্দিতার মাকে সে যে গাঢ় গলায় কথাটা বলল, সেটা পেরেই কতটা মেকি বুঝতে মনে অসহিষ্ণুতা কাজ করে। আসলে সে তখন নিজেকে যা খুশি তাই গাল দেয়। সে ফোন ছেড়ে দিয়ে বলল তুমি ভণ্ড না পায়। তারপর চিক করে সরু রগে কেমন একটা ঝিনঝিন শব্দ শুনতে পেল-কেমন আর্ত প্রশ্ন—বাবলা বাড়ি এসেছে? কেন বাবলার দিদিমার বাবলা সম্পর্কে এমন জরুরি প্রশ্ন! বাসি খবরের কাগজে যে কোথায় এক ছোট্ট চিরকুটের মতো সংবাদ—কার্জন পার্কে নিহত দুজন যুবকের একজনের লাশ এখনও শনাক্ত হয়নি। এখনও মানে-কতদিন! শনিবার পুলিশ কার্জন পার্কে গুলি চালিয়েছে। গেল শনিবার তো! সামনের রিপোর্টারটিকে বলল, গেল শনিবারে পুলিশ গুলি চালিয়েছিল কার্জন পার্কে? রিপোর্টারটি—এইমাত্র এসেছে, জরুরি খবর একটা লিখে দিয়ে আবার বের হয়ে যাবে, চিফ-সাহেবের পাখাঁটি ভালো ঘোরে। একটু ঠাণ্ডা হয়ে নেওয়ার জন্য বসেছিল। মুখের ঘাম মুছল রুমালে সে। বলল, নতুন কোনো খবর আছে?
