খুব কাছ থেকে বুঝলাম, চোদ্দো পনেরোও হবে না তার বয়স। ছোটোটিন্ডাল ক্ষেপে গিয়ে শেষে বুড়িকে নিয়েই অন্ধকারে হারিয়ে গেল।
সারেঙ সাব বললেন, যা, ফোকসালে নিয়ে যা। বসিয়ে রাখ। ঘাটে নামিয়ে দেওয়া যাবে।
মেয়েটির আত্মসম্মান রক্ষার্থে তিনি হয়তো আর কোনো রাস্তা খুঁজে পাননি। আমার ওপর দায় চাপিয়ে রেহাই পেতে চান। সারারাত তো আমি তাকে ডেকে পাহারা দিতে পারি না—অগত্যা আফটার পিকের দিকে হাঁটা দিলাম। আফটার পিকের ওপরে এনজিন এবং ডেক-জাহাজিদের গ্যালি। সঙ্গে মেসরুম। তার পাশ দিয়ে কাঠের সিঁড়ি ধরে নেমে গেলে প্রথমে দু-পাশে পড়বে ডেক সারেঙ এবং এনজিন সারেঙের ফোকসাল। এখানেই দুটো রাস্তা দু-দিকে নেমে গেছে। একটা গেছে পোর্ট-সাইডে অন্যটা স্টাববার্ড-সাইডে যেখানে থাকি আমরা। ইনজিন জাহাজিরা। নীচে নামলেই আমার ফোকসাল।
সে আমাকে অনুসরণ করছে বুঝতে পারছি।
কী যে করি।
ফোকসালে ঢুকে যেতেই দেখি সেও পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
বললাম, কী নাম?
ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। বুঝতেও পারে সব। নাম বলল, লেসি।
এই নারীর সঙ্গে ইচ্ছে করলেই এখন যৌন সংসর্গ করা যায়। সে তার খোঁপার ফুল দিয়ে তা বুঝিয়ে দিয়েছে। উত্তেজিত হয়ে পড়ছিলাম। নিজেকে দমন করতে পারছি না। কী ভেবে এক লাফে সিঁড়ি ভেঙে উপরে উঠে গেলাম। দেখি সারেঙ সাব দরজা বন্ধ করে দিয়েছেন। আমার ওপর মেয়েটির ভার চাপিয়ে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত দরজা বন্ধ দেখেই তা টের পেলাম।
ফোকসালে ঢুকে পড়লাম ফের। বেশ হাপাচ্ছি। মেয়েটিও আমার পাশে বসে পড়ল।
আমার হাত পা কাঁপছে। গলা শুকিয়ে উঠছে। কী যে বিড়ম্বনায় পড়া গেল। জল তেষ্টা পাচ্ছে। কী করব ঠিক করতে পারছি না। তারপরই মনে হল, আমার ত টাকা নেই যৌন সংসর্গ করার জন্য কোম্পানির ঘর থেকে ডলারও তুলিনি। নাম কেটে দিয়েছি বলে তার প্রয়োজনও হয়নি। মেয়েটি টাকার বিনিময় ছাড়া আমার সঙ্গে যৌন-সংসর্গ করবে কেন! যাক বাঁচা গেল।
বললাম, লেসি, তুমি নীচের বাংকে শুয়ে থাক। উপরের বাংকে আমি উঠে যাচ্ছি।
লেসি কথা বলছে না। অপলক তাকিয়ে আছে আমার দিকে। কী করুণ চোখ মুখ! বললাম, চা খাবে?
ঘাড় কাত করে জানাল, খাবে।
বোসো।
লকার খুলে দুধ চিনি চা বের করে উপরে উঠে গেলাম। গ্যালিতে দু-গ্লাস চা বানালাম। তারপর গ্লাস দুটো হাতে নিয়ে নীচে নেমে এলাম। নামার সময় শুনতে পেলাম, ইমানুল্লা চাচা কোরান পাঠ করছেন ফোকসালে। তখনই কেন যে এক অপার্থিব পৃথিবীর খোঁজ পেলাম ভেতরে। মনে হল শরীরই সব নয়। অর্থের বিনিময়ে কেউ এ-কাজ করলে প্রেম ভালোবাসা কিংবা জীবনের রহস্যময় উষ্ণতা মরে যায়।
নীচে নেমে ওকে চা দিলাম। পাউরুটি দিলাম। খুব আগ্রহ নিয়ে খাচ্ছে। তার হাঁটুর ওপরে গাউন উঠে এসেছিল। সে বার বার পাতলা গাউন টেনে হাঁটু ঢেকে দেবার চেষ্টা করছে। চোখের মণি দুটোতে আলো পড়ায় তাকে বড়োই মায়াবী মনে হচ্ছিল—কিংবা কোনো দূরবর্তী সংকেত-অথচ আমি তার সঙ্গে সারাক্ষণ বাড়ি ঘরের গল্প করলাম।
লেসি জানাল, তার বাবা নেই। মা থেকেও নেই। কোন এক খামারে কাজ করত। সেখান থেকে নিখোঁজ। মেয়েটির ধারণা, অভাবের তাড়নাতেই মা কোথাও চলে গেছেন। ভাইবোনদের দুটো পেট ভরে খেতে দেবার জন্য সে এও লাইনে নতুন এসেছে। লোকটাকে দেখে ওর ভয় ধরে গিয়েছিল বলে কাঁদছিল।
সবারই আজ কিছু না কিছু উপার্জন হবে অথচ লেসিকে শুধু হাতে ফিরে যেতে। হবে। লেসির দুর্ভাগ্যের কথা ভেবে ভীষণ খারাপ লাগছিল।
আমার নিষ্ক্রিয় কথাবার্তায় লেসি বোধ হয় অস্বস্তি বোধ করছিল। দরজা –র বার দরজার দিকে তাকাচ্ছিল।
আমি মাথা নীচু করে বললাম, তোমার ছোটো ভাইটার কত বয়স?
জানি সে আমার কোনো কথা শুনতে চায় না। শোনার আগ্রহ নেই। ভাই-এর কী বয়স শোনানোর জন্য জাহাজে উঠে আসেনি। সে খুবই চঞ্চল হয়ে উঠছিল। আমার দিকে তাকিয়ে বলল, দরজাটা বন্ধ করে দিন না।
না।
কেন না।
না। বলছি তো।
আমি বন্ধ করে দিচ্ছি।
না।
কেন যে এত একগুঁয়ে হয়ে উঠেছিলাম, আজও তার সঠিক ব্যাখ্যা পাই না। বরং হাসি পায়, আমার পাপবোধের কথা ভেবে। নাকি তার কোনো ব্যাধি আছে এই ভয়ে কাছে যাইনি! অথচ এত সুন্দর যে নারী, যে যৌন-সংসর্গের বিনিময়ে পয়সা রোজগার করতে এসেছে তাকে আমি সত্যি ঘৃণা করছি। তা ত নয়। বরং আমার মনে হয়েছে এমন নারী জীবনে সত্যি দুর্লভ। অথচ আমি কেমন বিপাকে পড়ে গেছি। পাপ-পুণ্য কি বুঝতে পারছি না। কোম্পানির ঘর থেকে টাকা তুলে রাখলেও হত। অন্তত যৌন সংসর্গ না করি হাতে টাকাটা দিতে পারতাম। তাও আমার সম্বল নেই।
লেসিও মরিয়া হয়ে উঠেছে। বলছে, আমার কোনো অসুখ নেই। মা মেরির দিব্যি। বলে সে দাঁড়িয়ে গাউন খুলে ফেলতে গেলে আমি অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলাম।
তুমি রাগ করছ?
মুখ না তুলেই বললাম, না।
তবে আমাকে দেখছ না কেন? দরজা বন্ধ করে দিলাম। দেখছি তো!
না, তুমি দেখছ না। তুমি আমার কিছুই দেখছ না। প্রায় আমাকে ঝাঁকিয়ে দিয়ে বলল, কেন তবে ফুল নিলে। বল কেন নিলে। আমাকে কেন অপমান করলে! ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল।
কী বলি! সত্যি ফুল নেওয়ার অর্থই তো গ্রহণ করা। আমি লেসির দিকে না তাকিয়েই বললাম, তুমি খুব সুন্দর। গাউনটা পরে ফেল। আমারও ভাইবোন আছে। তাদের বাঁচাবার জন্য এতদূরে জাহাজে কাজ নিয়ে চলে এসেছি।
