তারা ফুল দেবে। মাত্র একটি করে টিউলিপ ফুল। ফুল তাদের চুলে গোঁজা থাকে। জাহাজিরা যে যার পছন্দমতো ফুল নেবে। মাত্র এক ডলার।
এক ডলার তখনকার সময়ে বেশ দাম।
আর এ-সময়ই দেখলাম লক-গেটের দিক থেকে একটা ডিঙি নৌকা ভেসে আসছে।
জাহাজটি থেমেছিল কেন তা অবশ্য তখন জানতাম না। জাহাজটা হঠাৎ স্ট্যান্ড বাই হয়ে গেল।
এখন আর সব ঠিক ঠাক মনেও করতে পারছি না। দুটো কারণ থাকতে পারে। হয়ত কাপ্তান জাহাজিরা নারী সঙ্গ পায় বলে, থামাবার অনুমতি দিতে পারেন, হয়তো দূরবর্তী জাহাজের কোনো সিগনালিং দেখে জাহাজ থেমে যেতে পারে। অথবা, এই জায়গাটায় এলে কোনো কারণে জাহাজকে দাঁড়িয়ে পড়তেই
দেখছি তর তর করে দড়ির সিঁড়ি বেয়ে কারা উপরে উঠে আসছে। জাহাজিরাই হল্লা জুড়ে দিয়েছে। সবাই প্রায় ছুটছিল। প্রাচীন নাবিকেরা শুধু চুপচাপ বসেছিলেন। তাঁরা যাননি। বরং তাঁরা জাহাজিদের গালমন্দ করছিলেন।
দেখছি গাউন পরা কজন নারী।
ছোটোটিল্ডালর মাতববরি শুরু হয়ে গেছে। কেউ বেশি বেলেল্লাপনা করলে ধমক-ধামক দিচ্ছে।
গাউন পরা ক’জন নারী যেন জাহাজটার প্রাণ। বেশ সাড়া পড়ে গেছে। ওরা খোলা ডেকে দাঁড়িয়ে আছে। আমি নিজেও বসে থাকতে পারলাম না। ছুটে গেছি। যারা ফুল নিবে বলে কথা দিয়েছে, তারা বেশ সামনে ঝুঁকে দেখছে।
আমার নামও ছিল। তবে নামটা কাটা। এক একজন যে যার ফুল নিয়ে জাহাজের ঘুপটি অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। আমাদের ছোটোটিল্ডাল মোল্লা, তার চাই সব চেয়ে তাজা ফুল। সেই কিনারার লোকের সঙ্গে দরদাম করে এদের তুলে এনেছে। তার হক আছে। সে সবচেয়ে কচি খুকিটির খোপার ফুল তুলে নিতেই মেয়েটা কেমন কুঁকড়ে গেল!
মেয়েগুলো প্রায় সবাই রদ্দি—ওদের শরীর মুখ দেখে টের পেলাম। মাস্তুলের আলোতে মুখ স্পষ্ট। ঠোঁট ভারি, চুল তোঁকড়ানো। তামাটে রং। কম বেশি সব নারীরাই মাঝারি বয়সের। দু-চারজন যুবতী এবং তরুণীও দলে আছে। ওদের কদর বেশি হওয়াই স্বাভাবিক। কিন্তু সব চেয়ে তাজা তরুণীটিকেই ছোটোটিন্ডাল পাকড়েছে।
ছোটোটিন্ডাল হাত ধরতে গেলে মাথা গোঁজ করে দাঁড়িয়ে থাকল মেয়েটা। পছন্দ নয়। সে তার ফুল ফেরত নিতে চায়। খুবই নিয়মের বাইরে বলে, বুড়ি মতো মেয়েটা ধমকাচ্ছে।
ছোটোটিন্ডাল বেটপ। গোলগাল গাট্টাগোট্টা মানুষ। বয়স পঞ্চাশের কাছাকাছি। এই নরম উষ্ণতা যেন ছোটোটিন্ডালের পাল্লায় পড়লে তছনছ হয়ে যাবে। খুব খারাপ লাগছিল। ইস নাম কেটে দিয়ে কী যে ভুল করেছি। কারণ মেয়েটি আমার দিকে তাকিয়ে ভরসা খুঁজছিল। কিন্তু সারেঙ সাবের জন্য ভরসা দেবার মতো ক্ষমতাও আমার নেই। ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলে। সবাই বুঝতে পারছিলাম। কিছু করার নেই। মনটা দমে গেল। ডেক ধরে ফিরে আসছি। মেসরুম পার হয়ে দেখি সারেঙ সাব দাঁড়িয়ে আছেন। আমাকে একা দেখে বেশ আশ্বস্ত।
সারেঙ সাব আমার পেছনে সিঁড়ি ধরে নামছেন। কাঠের সরু সিঁড়ি। একজনের বেশি নামা যায় না। তিনি হঠাৎ কেন যে বসেছিলেন, আজও তার রহস্য স্পষ্ট নয়–কারণ আমি তালিকায় ছিলাম না, তবু কেন যে বলেছিলেন, কি রে পছন্দ হল না।
যেন মজা করছেন।
পছন্দ অপছন্দের চেয়েও আমার মনে হচ্ছিল এরা রুগ্ন। অর্থাভাব প্রচণ্ড। হত দরিদ্র হলে যা হয়। না হলে এত কম বয়সে একজন কিশোরী জাহাজে উঠে আসে! ঠোঁট ভারি হলে কী হবে, ভারি মিষ্টি দেখতে।
আর এসব সময়ে কেন যে আমার মা-র কথা বেশি মনে পড়ত, ভাইবোনদের কথা বেশি মনে পড়ত-কিছু তখন ভালো লাগত না। বাংকে এসে চুপচাপ শুয়ে পড়লাম।
জাহাজটা ভোর রাতের দিকে সামনের লকগেটে গিয়ে পড়বে। এই সাত-আট ঘণ্টা উষ্ণতায় ভরিয়ে রাখবে জাহাজিদের। শুয়ে শুয়ে এ-সবই ভাবছিলাম।
আর তখনই দেখি সারেঙ সাব নিজেই চলে এসেছেন। মানুষের মনে কখন যে কি উদয় হয়, কে যে কি ভাবে না হলে সারেঙ সাব আমাকে এসেই বা খবরটা দেবেন কেন।
এই ওঠ। মেয়েটা কাঁদছে।
কাঁদছে কেন!
কে জানে! যা একবার। জাহাজে আবার ঝামেলা না হয়।
তারপর সারেঙ সাব নিজেই সব কেন যে খুলে বলেছিলেন, তার মাথামুণ্ডু বুঝছি না। বললেন, ছোটোটিন্ডাল নাছোরবান্দা। মেয়েটা কিছুতেই রাজি নয়। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে। আয়তো দেখি। এত ভালো কথা না! ছোটোটিন্ডাল বুড়িকে শাসাচ্ছে। অফিসাররাও বাদ নেই। নিজেদের ঘরে লকগেট থেকেই মেয়েমানুষ তুলে নিয়েছে। নেটিভদের কাণ্ড-কারখানা দেখতে হবে ভয়ে এলি-ওয়ের দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।
কাছে গিয়ে হতবাক। সত্যি ফুঁপিয়ে কাঁদছে মেয়েটা। একদম নড়ছে না। নড়ানো যাচ্ছে না। শত হলেও এ-সব যৌন অভ্যাস মানুষের গোপনেই থাকবার কথা। আর তখন একটা ছোটো পরির মতো মেয়ে যদি ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে, শেষে আবার কোন কেলেঙ্কারিতে পড়ে যেতে হবে কে জানে! মেয়েটা তার খোঁপার ফুল কিছুতেই ছোটোটিন্ডালকে দেয়নি।
আর আশ্চর্য তখন কিনা সারেঙ সাব আমার দিকে তাকিয়ে বলছেন, দেখতো ফুলটা তোকে দেয় কিনা! চেয়ে দেখ।
আমি কেমন বিব্রত বোধ করছিলাম। আমার নামেতো কোনো টাকা জমা নেই। আমার কাছে কোনো ডলারও নেই। আমি কী করব বুঝতে পারছিলাম না।
সারেঙ সাবই বললেন, চেয়ে দেখ না। দাঁড়িয়ে থাকলি কেন?
আরও অবাক, হাত পাততেই মেয়েটা চুল থেকে ফুল খুলে আমার হাতে দিয়ে দিল। লজ্জায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়ে আছে। একজন বালিকার স্বভাব যেমন হয়ে থাকে—সবার সামনে সে যেন কিছুতেই আর মুখ তুলে তাকাবে না।
