যদি সারেঙ সাব ক্যানেলে কোনো নারী জাহাজে তোলার অনুমতি না দেন, তবে আমিই তার জন্য দায়ী।
ছোটোটিন্ডাল বলল, এই নাও টাকা। হবে না।
বাদবাকি বলল, কেন হবে না। সারেঙ কী ভেবেছে।
আমি বললাম, ঠিক আছে দাও। এবারে সারেঙ সাব হয়তো রাজি হয়ে যাবেন। গিয়ে বল, বনাৰ্জী ফুল নেবে না বলেছে।
জাহাজ তখন লেমন-বেতে ঢুকবে। আর দু-দিন বাকি। আমি পড়লাম মহাফাঁপড়ে।
ছোটোটিন্ডাল এসে বলল, না, সারেঙ সাবের এক কথা হবে না।
আমিও চোটপাট শুরু করে দিলাম, কেন হবে না। অন্য জাহাজে কি হয়ে থাকে! জাহাজিদের মেজাজ মর্জি বুঝতে হবে না। আমিতো ফুল নেব না বলেছি। তবে আর আটকাচ্ছেন কেন!
ছোটোটিন্ডাল বলল, তুই একটু বুঝিয়ে বললে হবে। জানিস গরিব গুরবো মেয়েগুলোর এই একটা উপার্জনের পথ। জাহাজিদের কছে টিউলিপ ফুল বিক্রি করে কিছু পয়সা রোজগার করে। ওতেই ওদের চলে। দুটো খেতে পায়। জাহাজ দেখলে, কত আশা নিয়ে থাকে।
বিষয়টা আমার কাছে তখনও খুব যে পরিষ্কার ছিল বলতে পারব না। আসলে ভেবেছিলাম, ওর ফুল বিক্রি করতে উঠে আসা। জাহাজ প্রশান্ত সাগরে পড়ার আগে আবার নেমে যায়। ফুল নিয়ে ডেকে সামান্য রং রসিকতা হতে পারে—কিংবা কারও গরজ থাকলে, সহবাসও হতে পারে—তবে এ-নিয়ে জাহাজিদের মাথা ব্যথা থাকার কথা না। কাপ্তানেরও না। কাপ্তানতো সব সময় চান, জাহাজিরা কিনারায় এনজয় করুক। বরং না করলেই দুশ্চিন্তায় কারণ—অনন্ত অসীম সমুদ্রে জীবন। হাতে নিয়ে ঘোরাঘুরি, একটু বেচাল না হলে চলবে কেন!
বাধ্য হয়ে উঠে পড়লাম। সারেঙ সাবের দরজায় টোকা মারতেই তিনি দরজা খুলে দিলেন। সব শুনে বললেন, যা খুশি কর। আমার কি। ইমান কে-কার রক্ষা করে। বন্দরে নেমে কে কোথায় যাস আমার জেনে দরকার নেই। আমার তোদের সঙ্গে কাজ নিয়ে কথা। কাজ পেলেই হল।
আসলে এ ব্যাপারে সারেঙ সাবেরও কোনো এক্তিয়ার নেই, না করার। দীর্ঘ সমুদ্র সফরে কোনও জাহাজি বন্দরে না নামলেই ভয়। একঘেয়ে সমুদ্রযাত্রায় কেউ কেউ পাগল পর্যন্ত হয়ে যায়। তাদের নেমে ফুর্তিফার্তা না করলে এটা বেশি হবার কথা। তবে জাহাজিদের বলতে গেলে সর্বময় কর্তা সারেঙ সাব। তাকে সমীহ না করলে জাহাজিদেরও ইজ্জত থাকে না। তিনি অনুমতি দিতেই সবাই হা হা করে লাফিয়ে সিঁড়ি ধরে উপরে উঠে গেল। শিস দিল কেউ। কেউ রাত দুপুরে রঙের জব নিয়ে বসে গেল। ডুবাডুব বাজনা আর সমস্বরে গান। মুহূর্তে জাহাজিদের চেহারাই পালটে গেল।
দু-দিন বাদে সাঁঝবেলায় দেখি সারেঙ সাব আমার ফোকসালে উঁকি দিয়ে কী দেখছেন। আমি উঠে বসলাম। তিনি সাধারণত অন্য ফোকাসালে ঢোকেন না। উঁকিও দেন না। একমাত্র দরকারে আমার ফোকসালে গলা বাড়িয়ে কথা বলেন। তার দেশে চিঠি লেখার প্রয়োজন হলে এটা করে থাকেন।
বললাম, কিছু বলবেন চাচা?
তিনি বললেন, শুয়ে থাকলি। উপরে উঠে যা। পানামা ক্যানেলে জাহাজ ডুকে যাচ্ছে। কী করে জাহাজটাকে টিলায় তুলে দিচ্ছি দেখবি না!
আমি বুঝি তিনি আমাকে নিয়ে বিশেষ ভালো নেই। তাঁর অহরহ দুশ্চিন্তা। একজন নতুন জাহাজিকে এ-ভাবে দমিয়ে রাখা সুবিবেচনার কাজ কি না তাই নিয়েও দ্বন্দে পড়ে গেছেন। তাঁর অশ্বস্তি বুঝি। বললাম, যাচ্ছি।
তাঁর মুখ ভারি প্রসন্ন হয়ে গেল। বললেন, যা বাবা যা। শুয়ে থাকিস না। শুয়ে থাকলে মন খারাপ থাকে।
সারেঙ সাবের কথা ভেবে আমার চোখ জলে ভারি হয়ে গেল।
আসলে, শুয়েছিলাম-ডাঙা দেখলে বাড়ি ঘরের জন্য মন বড়ো বেশি খারাপ হয়ে যায়। এতক্ষণ ওপরেই বসেছিলাম। দুটো লকগেট পার হবার পর কিছুই কেন জানি না ভালো লাগছিল না। একটার পর একটা লক গেটে ঢুকে জাহাজ যেন সিঁড়ি ভাঙছে। জাহাজ উপরে উঠে যাচ্ছে ক্রমে। সামনে বিশাল কৃত্রিম হ্রদ। পাহড়ের উপত্যকায় এই কৃত্রিম হ্রদের সৃষ্টি জাহাজ পারাপারের জন্য। গাছপালা কোথাও দ্বীপের মতো ভেসে আছে।
জাহাজ কাপ্তানের জিম্মায় নেই। জ্যোৎস্না রাত। দূরের জলরাশি এবং পাহাড়ের ছোটোখাটো ঢিবি চোখে পড়ছিল।
জাহাজ পাইলটের জিম্মায়। সে খাড়ি ধরে জাহাজ নিয়ে যাচ্ছিল।
ডেকের ওপর বসে মনে হচ্ছিল, জাহাজটা যেন পুৰ-বাংলার বর্ষাকালে নদী মাঠ কিংবা গ্রাম গঞ্জ ফেলে চলে যাচ্ছে। এখানে ওখানে ঝোপ জঙ্গল, টিলা, কলাগাছ, কচুগাছ। বুনো ফুলের গন্ধ পর্যন্ত পাচ্ছিলাম ডেকে বসে। এই প্রথম দেখলাম জাহাজের সার্চ লাইট জ্বলছে।
আর কেন যে সে-সময় বাড়ির কথা, মা-বাবা, ভাইবোনের কথা ভেবে চোখে জল চলে আসছিল। মনটা এতই দমে গেছিল যে আর বসে থাকতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। নীচে নেমে শুয়ে পড়েছিলাম। সারেঙ সাবের বোধ হয় সতর্ক নজর এড়াতে পারিনি। তিনি সিঁড়ি ধরে নেমে আমাকে শুয়ে থাকতে দেখে ঘাবড়ে যেতে পারেন।
অগত্যা আবার উপরে যেতে হল। ভাণ্ডারির গ্যালিতে ভিড়। কেউ আর নীচে নেই। একমাত্র এনজিন রুমের পরিচালকরা নীচে কয়লা হাকড়াচ্ছে। জাহাজের স্টিম খুব বেশি দরকার ছিল না। বড়ো বেশি টিমে তালে জাহাজ চালানো হচ্ছে।
উঠে দেখলাম, আমাদের আগে যে জাহাজটা যাচ্ছিল, ওটা সামনের ঝোপ জঙ্গল টিলার-ওপাশে হারিয়ে গেছে। কেমন স্বপ্নের মতো দূরাতীত ছবি—মগ্ন হয়ে যেতে হয়।
মেসরুমের পাশে একটা বেঞ্চিতে বসে আছি। আর সব জাহাজিরা আমার পাশে বসে গল্পগুজব করছে। তারা সবাই অপেক্ষা করছে, কখন ফুলওয়ালিরা সব উঠে আসবে।
