সালাফার নিয়ে আবার পাড়ি দিতে হবে দূর সমুদ্রে। মাসখানেক, কি তারও ওপর জাহাজ ক্রমাগত সমুদ্রে ভেসে চলবে। কেবল লিখলেন যেতে আমরা পানামা ক্যানেলের দু-পাশের ডাঙা দেখতে পাব। এছাড়া শুধু দিনরাত সমুদ্র, নীল আকাশ, ঝড় জল আর মাঝে মাঝে সমুদ্র পাখিদের ওড়াউড়ি দেখা।
জাহাজ পোর্ট অফ সালফার থেকে দড়ি-দড়া খুলে দিল। মোহনা থেকে জাহাজ ভেসে পড়েছে সমুদ্রে। জাহাজের পেছনে উড়ে আসছে সব সমুদ্রপাখি। ডানা সাদা, হলুদ ঠোঁট কবুতরের মতো দেখতে বিশাল আকারের পাখিগুলি টানা কতদিন যে জাহাজের পেছনে উড়ে চলবে আমরা জানি না।
কখনো-কখনো দু-এক জোড়া পাখি আমাদের জাহাজের মাস্তুলে এসেও বসে থাকত। তাদের সঙ্গে আমরা কথাও বলতাম—বেশ আছ তোমরা, তোমার নারী তোমার পাশেই বসে আছে, উড়ছে। ঢেউ-এর মাথায় বসে সমুদ্রে ভেসে যাচ্ছে। তোমাদের হিংসা হয়। এমনই কথাবার্তা হত পাখিরা এসে মাস্তুলে বসে থাকলে।
জাহাজ তখন গভীর সমুদ্রে। খুব একটা ঝড়ঝাপ্টা নেই। কাজ সামাল দিতে কষ্ট হয় না। অবলীলায় কাজ কাম সেরে শিষ দিতে দিতে সিঁড়ি ভাঙতে পারি। উঠতে পারি বোট-ডেকে। শরীর দানবের মতো মজবুত হয়ে উঠেছে। হাতে পায়ের পেশি শক্ত হয়ে গেছে। সমুদ্র আমাকে অজ্ঞাতেই তার মতো সহনশীল করে নিতে পেরেছে। স্বাধীন হতে শিখিয়েছে। আমার ব্যক্তিগত অভিরুচির ওপর কারও খবরদারি একদম আর সহ্য করতে পারছি না।
এক রাতে সারেঙ আমাকে ডাকলেন। তিনি সেদিন আমাকে নিয়ে উপরে উঠে গেলেন না। দরজায় ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে। খোপকাটা লুঙ্গি পরনে। মাথায় সাদা টুপি। গায়ে ফতুয়া।
তিনি বললেন, তুই নাকি ফুল নিবি বলেছিস!
নেব বলেছি।
সারেঙ সাবের মুখ থম থম করছে ক্ষোভে দুঃখে। তিনি বললেন, তুই নিবি!
হ্যাঁ নেব।
তুই নিবি বলতে পারলি। তোবা আল্লা! বলে সারেঙ সাব দরজা বন্ধ করে দিলেন মুখের ওপর।
নীচে এসে দেখি বন্ধু আমার ফোকসালে বসে চা খাচ্ছে।
বন্ধুকে দেখেই ক্ষেপে গেলাম। আসলে আমি সারেঙ-এর তপ্লিবাহক, আমার বেশিদূর যাবার ক্ষমতা নেই কারণ সারেঙ সাব যখন ডেকে পাঠিয়েছেন, আমার ক্ষমতার দৌড় শেষ—এবং এসব ভেবেই সে মজা পাচ্ছিল, কিংবা মজা দেখার জন্যই আমার ফোকসালে ঢুকে বসে আছে। বললাম, তুই এখানে কেন!
না দেখতে এলাম, সাধু পুরুষের কী সাধ যায়।
না পেরে বললাম, কেন ফুল নিতে পারি না!
পারবি না কেন! পারবি। তবে শেষ পর্যন্ত পারবি কি না জানি না। সারেঙ সাব মাথার ওপর আছেন ত।
সবই কেমন বিদ্রুপের মতো শোনাচ্ছে। আমি বললাম, ঠিক আছে, যা। এখন আমি শোব।
ওপরের বাংক খালি দেখে বন্ধু আমার ফোকসালে চলে আসবে বলেছিল। কিন্তু সারেঙ সাব রাজি হননি। রাজি না হবার কারণ পরে বুঝতে পেরেছি। দেশের খত কতজনার আমি লিখে দিই। দরকারে সারেঙ সাবের। আমার ফোকসালে অন্য কেউ থাকলে অসুবিধা। খতে কত ব্যক্তিগত কথা থাকে। এসব কথা দশকান হলে মন্দ ব্যাপার। সারেঙ সাব সেই ভেবেই হয়তো বন্ধুকে আমার ফোকসালে উঠে আসতে দেয়নি। এখন বুঝতে পারছি না দিয়ে ভালোই করেছেন। ইচ্ছেমতো দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়তে পারি। পেছনে লাগার কেউ নেই।
তাছাড়া বন্ধু এলে লকারটার ভাগ দিতে হত। জাহাজে আস্ত একটা ফোকসাল, একটা লকার একজন জাহাজির ভাবাই যায় না। লকারটা পুরো আমার। ওতে আমার কোট-প্যান্ট, কিছু গরম জামা কাপড়, রেশনের কনডেনসড মিল্ক, চা, চিনি, আর মার জন্য তুষের মতো নরম কম্বলটা আছে।
বন্ধুও দেখি বেশ ক্ষেপে আছে। বলল, সারেঙ সাবের এটা বাড়াবাড়ি। আমরা কী ভূত! এ ভাবে পারা যায়। তারপর বলল, তুই বুঝিয়ে বললে হয়তো রাজি হবে।
আমি আবার কী বুঝিয়ে বলব। কিছু বলতে পারব না। যা।
মাথা গরম করছিস কেন। সবাই আশা করে আছে।
থাকুক। আমি পারব না। ওঠ আমার বাংক থেকে। ওঠ বলছি। আচ্ছা তুই কিরে, ঘড়ি দেখে বললাম, দুটো ঘণ্টাও নেই, পরিতে যেতে হবে। একটু শুতেও দিবি না।
ওর কেন জানি কোনো ভ্রূক্ষেপ নেই। সে বাংকের নীচ থেকে একটা টব বের করে গবাগুব বাজাতে থাকল। আর গান। ওর গলা ভাল, হঠাৎ এত প্রসন্ন হবার কারণ কি বুঝতে পারলাম না। সে কী ভেবেছে কে জানে যাই হোক মনে আছে গাইছিল, ও ফুল তুমি ফোট না ক্যানে, ফুলরে আমার কেশের চুল।
আসলে গানটি যে বাংলা সিনেমার, কবি’ বই এর বুঝতে কষ্ট হল না। গানটি হবে, কালো যদি মন্দ তবে, কেশ পাকিলে কান্দ ক্যানে। সেই সুরেই গাইছিল শুধু শব্দ কিছু, কিছু কেন প্রায় সবটাই পালটে দিয়ে ফুলের লাইনে চলে এসেছে। কেশের লাইনে আর থাকেনি।
ওর গান শুনে আমিও হেসে ফেলেছিলাম।
তখনই যেন বন্ধু সাহস পেয়ে গেল। বলল, জানিস সারেঙ সাব ক্ষেপে গেছেন। বলছেন, না কেউ জাহাজে উঠতে পারবে না। ছোটোটিন্ডালকে ডেকে ফতোয়া জারি করে দিয়েছেন।
বুঝলাম, ছোটোটিন্ডাল তালিকায় আমার নাম রেখেই ভুল করেছে। আমি না থাকলে, তালিকাটিতে তার আপত্তি ছিল না। পানামা খালে কে উঠে এল, কে নেমে গেল, তা নিয়েও বোধ হয় ভাবতেন না। সারেঙ সাব হুকুম জারি করে দিয়েছেন। ক্যানেলে কাউকে তোলা যাবে না।
রাত দশটা বেজে গেছে। রাত বারোটায় আমার ওয়াচ। বন্ধুর কী বুদ্ধি সুদ্ধি নেই বসেই আছে। উঠছে না! আর তখনই দেখি ছোটোটিন্ডাল দলবল নিয়ে এসে হাজির। আমার মতো ওরাও সবাই ফুলের গাহেক।
