এমনিতেই জাহাজটা লরঝরে। সাউথ-ওয়েলসের উপকূল থেকে একটানা এতদিন জাহাজটা ভেসে চলতে পারবে কি না সংশয়। প্রায়ই মনে হত জাহাজ বন্দর ধরার আগেই সমুদ্রে ডুবে যাবে। ঝড় সাইক্লোনে পড়লে এটা বেশি মনে হত। এই বুঝি স্টিয়ারিং ইঞ্জিন ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। কারণ আমাদের ঠিক মাথার উপরেই ছিল হালের যন্ত্রপাতির ঘর। ঝড়ে মাঝে মাঝে উদ্ভট সব শব্দ পেতাম। একদিন তো দৌড়ে উঠেও গেছিলাম—দেখি না ক্রাংক ওয়েভগুলো ঠিকমতোই কাজ করছে।
আসলে আমরা যাচ্ছি কান্দি নিউ পোর্টে।
তার আগে পোর্ট অফ জামাইকা থেকে শুধু রসদ তোলা।
জাহাজ ছেড়ে দেবার পর কার্ডিফ বন্দরও অদৃশ্য হয়ে গেল। এ যে গভীর সমুদ্রে জাহাজ। আবার সেই ওয়াচ, কয়লা টানা, ছাই হাপিজ করা, চান, খাওয়া, ঘুম। প্রতিদিন একই দৃশ্য, নীল আকাশ। নীল সমুদ্র। অনন্ত অসীম এই সমুদ্র যাত্রা কবে যে শেষ হবে তাও জানি না।
বুঝতে পারছি, এবারে আমি একটু বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছি। ইমানুল্লা সাবের কাজে নাজিরা যেন ডাইনি। তার সঙ্গে ঘুরে বেড়িয়েছিলাম বলে দু-দিন কোনো কথাই বললেন না।
মাঝে মাঝে সারেঙ সাবের এমন ছেলেমানুষী দেখে আমার হাসি পেত। নাজিরা কি আমাকে খেয়ে ফেলবে। আমি কী সত্যি কোনো বন্দরে হারিয়ে যেতে পারি! হারিয়ে গেলে, তাঁর কী! আর যদি আমার ব্যক্তিগত অভিরুচিতে বারবার তিনি হস্তক্ষেপ করেন তবে রাগ হয় না।
জানি না কেন, অনেকের মতো আমিও ‘ফুল’ নেব জানতে পেরে আবার সারেঙ সাব খাপ্পা।
ছোটোটিন্ডাল করিম মিঞা ব্যাংক লাইনের পুরোনো জাহাজি। সে অনেক খবর রাখে। কারণ নিউপোর্ট থেকে জাহাজ সালফার বোঝাই হয়ে পানামা ক্যানেল অতিক্রম করে আবার দূর সমুদ্রের যাত্রা। পানামা ক্যানেল অতিক্রম করার সময় কে ফুল নেবে, এমন কথাবার্তা আমার কানে এসেছিল। বন্ধুই এসে খবর দিয়েছিল, ছোটোটিল্ডালের ঘরে যা। ডাকছে।
আমি এখন লকার গোছাচ্ছিলাম। মা শীতে কষ্ট পান বলে একটা কম্বল কিনেছি। সেটা যত্ন করে ভিতরে গুছিয়ে রাখছিলাম।
‘ফুল নেব’ এমন খবর যে সারেঙ সাবের মাথা খারাপ করে দিতে পারে আমি জানতাম। অনেক হয়েছে আর না। ঘোমটার তলে খ্যামটা নাচ আর ভালো লাগছে না। জাহাজিরা যা আমিও তাই। অত শুচিবাই জাহাজে উঠলে চলে না।
বন্ধুকে বললাম, যা আমি যাচ্ছি।
আমার ফোকসালে দুটো বাংক।
নীচের বাংকে থাকত বাহার। সে সারেঙের ‘ফালতু’ ছিল। অর্থাৎ অতিরিক্ত কোলবয়। আমাদের সাতজনের একজন। কার কঠিন অসুখ-বিসুখ হলে সে তার হয়ে পরি দিত। অন্য সময় সারেঙ সাবের ফুটফরমাস খাটত বাহার।
বাহারের মেজাজ বেশ দরাজ উঠেই টের পেয়েছিলাম। সে নীচের বাংকটা আমাকে ছেড়ে দিয়েছিল। উপরের বাংকে শুলে ঝড় সাইক্লোনে ঘুমোতে বেশি অসুবিধা। বেশি ওঠানামা করে বাংক। সে আমার সুবিধার দিকটা সব সময় নজর দিত। আমার টোবাকো কিংবা চিনি রেশনে সেই তুলত। সিগারেট খাওয়ার অভ্যাস ছিল না। সেও ধূমপায়ী ছিল না বলে আমাদের টোবাকো জমে যেত। এবং কিনারায় সে টোবাকো তিন গুণ দামে বিক্রি করে আমার প্রাপ্য কড়ায় গণ্ডায় মিটিয়ে দিত। এই করে আমাদের হাতে অতিরিক্ত পয়সা এসে গেছিল। যার জন্য সহজেই একটা দামি কম্বল কিনে ফেলতে পারলাম। ঘাটে জাহাজ গেলে কোম্পানির ঘর থেকেও কিছু পয়সা তোলা যায়। সব মিলিয়েই কম্বল কেনার পয়সা জোগাড় হয়ে গেছিল। ফন্দিটা জুগিয়েছিল বাহারই। সেই বাহার কার্ডিফ বন্দরে হাওয়া হয়ে যাওয়ায় পুরো ফোকসালটা আমার একার দখলে এসে গেছিল।
আমরা তখন মিসিসিপি নদীর মোহনার সামান্য ভিতরে ঢুকে গেছি।
সেই এক ফুলের খবর। করিম টাকা পয়সা তুলছে।
যত শুনি তত নারীসঙ্গ পাবার জন্য মনটা উতলা হতে থাকে। বারবার সারেঙ সাব নিষেধ করলেন, ছোটোটিল্ডালের ফাঁন্দে যেন না আটকে যাই।
কেন যে এটা সারেঙ সাবের বাড়াবাড়ি মনে হচ্ছিল এখন ভাবলে কষ্ট পাই।
সে যাই হোক, নিউপোর্ট আমরা নামতে পারলাম না। পোর্ট অফ সালফারেও না। কাপ্তান সারেঙ সাবের কাছে খবর পাঠালেন, কিনারায় আমরা যেন কেউ না নামি।
আমেরিকার দক্ষিণ মুল্লুক এটা।
বর্ণবিদ্বেষ প্রবল। কিছুদিন হল কালো সাদায় দাঙ্গা হয়ে গেছে। ভারতীয় জাহাজিদের নামার ব্যাপারে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে গেল।
এতেও হয়ত মনটা আরও বেশি উৎক্ষিপ্ত হয়ে গেছিল। গোপনে ছোটোটিন্ডালের হাতে ফুলের দাম একবারে পৌঁছে দিলাম।
এত কাছে ডাঙা। জেটি পার হলে বড়ো বড়ো তেলের পিপে রোদে ঝলমল করছে। শহর এলাকা একটু দূরে। তবু বোট ডেক থেকে নারী পুরুষের ফারাক বুঝতে পারে। আমরা বন্দি জীবন প্রায় যাপন করছি। কাঁহাতক সহ্য হয়।
আমার সঙ্গে সেকেন্ড অফিসারের কিছুটা গোপন দস্তি আছে জাহাজিরা জানে। তার সঙ্গে ইচ্ছে করলে নেমে যেতে পারি। কারণ আমি এমনিতেই বেস ফর্সা। জাহাজে উঠে সমুদ্রের নোনা হাওয়ায় রঙ আরও খুলে গেছে। সাহেবের স্বজাতি বলে চালাতে কষ্ট হবার কথা নয়। ইচ্ছে করলে নেমে যেতে পারি। ঘুরে আসতে পারি। কিন্তু ওই যত গেড়ো ইসানুল্লা সারেঙ। তার চোখে ফাঁকি দেওয়া কঠিন। আর কিনারায় নেমে যদি শেষে ধরা পড়ে যাই তবে আর এক কেলেঙ্কারি। সাত পাঁচ ভেবেই পোর্ট অফ সালফারেও নামা হল না।
আর এতে নিজের ভিতরে সেই চিরন্তন নাবিকের নেশা যে আরও পাক খেয়ে উঠছে বুঝতে কষ্ট হত না। তা না হলে বোধহয় এত মরিয়া হয়ে উঠতাম না।
