অথবা কোনো বিকেলে, কিংবা সাঁজবেলায় আকাশের নক্ষত্র দেখতে দেখতে আমার মনে হত, কতদূরে আমি। ঘাসের ওপর বসে আমরা কখনো হাতে হাত মিলিয়ে অদ্ভুত এক খেলা খেলতাম। এক দুই পাঁচ, তিন সাত চার, এমন ছিল খেলার হিসাবটা। কোথায় হাতের পাতা পড়বে, কোন দিকে, নীচে না ওপরে, না কোমরের কাছে, মাঝে মাঝে ভুল করে ফেললে প্রথম থেকে আবার শুরু করতে হত খেলাটা—এইভাবে এক বিকেলে কেন যে আমার মনে হচ্ছিল, এদেশ ছেড়ে গেলে আমি বাঁচব না। সে আর কোনোদিন পাঁচিলের পাশে এসে র্যাকেট হাতে নিয়ে দাঁড়াবে না, আমিও আর কোনোদিন সাদা বল তার হাতে কুড়িয়ে দিতে পারব না। যখন চেরির জন্য টান ধরে গেছে, ওদেশে থাকারও একটা হিল্লে হয়ে যেতে পারে–চেরিই বলেছিল, ওহ ইন্ডিয়ান।
‘ওহ ইন্ডিয়ান’ কথাটা এত বেশি গেঁথে গেছিল মনে যে সে আর আমি তাদের বাগানে ফুল চোর সেজে ছোটাছুটি করেছি কত বিকেলে।
এক বিকেলে গিয়ে দেখলাম, চেরি নেই।
সে চলে গেছে।
কোথায় গেছে?
তারা যা বলে বুঝি না।
কবে ফিরবে। তাও তাদের ভাষা থেকে ধরতে পারি না। কেমন ভেঙে পড়েছিলাম। না বলে কোথায় গেল। কবে ফিরবে। একবারও তো বলেনি। আবার বলতেও পারে, আমিই ঠান্ডায় তার ইশারা ধরতে পারিনি। বুলেভার্ডে রোজ গিয়ে বসে থাকি। জাহাজ ছাড়ার সময় হয়ে যাচ্ছে। এ-দেশে থাকি না থাকি, যাবার আগে তার সঙ্গে একবার দেখা হবে না ভাবতে পারি না।
গেটে তালা।
দরজা জানালা বন্ধ।
কেউ নেই বাড়িটাতে।
আর আমার কেন যে প্রত্যাশা ছিল, যেখানেই থাক, জাহাজ ছাড়ার আগে ঠিক চেরি চলে আসবে। অন্তত ও-দেশ ছেড়ে যাবার আগে তার সঙ্গে আর দেখা হবে না ভাবতে পারি না।
রোজ যাই। গাছের ছায়ায় বসে থাকি। দূর থেকে কোনো গাড়ি এলে মনে হত বাড়িটার সামনে থামবে। গেট খুলে চেরি তার বাবা মা এবং একজন কাকাও ছিল বোধহয়, তবে সম্পর্কটা সঠিক কি বুঝতে পারিনি।
এভাবে একদিন দেখলাম জাহাজ ছাড়ার নিশান উড়িয়ে দেওয়া হয়েছে।
চব্বিশ ঘণ্টা আর মাত্র আছি এ-বন্দরে।
ভোর রাতে জাহাজ ছাড়বে।
জাহাজ ছাড়ার আগে কিছু কাজ থাকে, ডেক পরিষ্কার করা, ফল্কার কাঁঠ ফেলে ত্রিপল দিয়ে ঢেকে দেওয়া খিল এঁটে দেওয়া চারপাশে—এই সব কাজ যত দেখছি, তত মুখ আমার শুকিয়ে যাচ্ছে। বিকেলে গেলাম। সাঁঝবেলায় ফিরে এলাম। ভিতরে কেন যে এত ছটফট করছিলাম জানি না। অন্তত জাহাজ ছেড়ে দিচ্ছে। আমরা বন্দর ছেড়ে চলে যাব, আর হয়তো জীবনে চেরির সঙ্গে দেখা হযে না। ভাবতেই চোখ ফেটে জল বের হয়ে এল।
এবং কেমন ঘোরে পড়ে গেছিলাম। মাঝরাতে জাহাজ থেকে পালিয়ে ভেসে যাব ভাবছি—এবং ডেক ধরে যাবার মুখেই দেখি পেছনে কে আমাকে অনুসরণ করছে। সারেঙ সাব।
কোথায় যাচ্ছিস?
মেজাজ খারাপ হয়ে গেল। সাড়া মুখে তিক্ততা ভেবেছে কী। আমি কোথায় যাচ্ছি, না যাচ্ছি, এতে তার কী দায় থাকতে পারে। আমি মরি বাঁচি, তার কি তাতে আসে যায়।
প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিলাম—আমি যেখানে যাই, আপনার কী তাতে।
আমার কী! তিনি আমার কাঁধে হাত রেখে বলেছিলেন, আমার কিছু না। তোর বাবা-মার কথা ভাবলি না। পালাচ্ছিলি।
তার তখনই মনে হল, কে যেন ডাকছে, দাদারে বাড়ি ফিরবি না।
কত দূর দেশে আমার বাবা-মা, আমার ভাই বোনেরা রয়েছে। আর আমি কবে ফিরব এই অপেক্ষায় আছে। এজেন্ট অফিস থেকে বাবার নামে মাসোহারা যায়। জাহাজ ছেড়ে দিলে সব বন্ধ হয়ে যাবে।
আমি ফিরে এলাম। বাংকে শুয়ে গোপনে অশ্রুপাত। কার জন্য এখন আর সাঠিক মনে করতে পারছি না। বাবা-মা, ভাই বোন, না চেরি।
যাই হোক জাহাজ ছেড়ে দিলে চুপচাপ গ্যালির পাশে বেঞ্চিতে বসে থাকলাম। যতক্ষণ না বন্দর চোখের ওপর থেকে অদৃশ্য হয়ে গেল, বসে থেকে ছিলাম।
কার্ডিফ বন্দর ছাড়ার সময়ও এক পরিস্থিতি। ইমানুল্লা সারেঙ নজর রাখছেন। এমন ভাবলেই আমার মাথা গরম হয়ে যেত সারেঙ সাবের ওপর। কেবল মনে হত আমার ভালোমন্দ দেখার এত দায় কে দিয়েছে আপনাকে। আমি জাহান্নামে গেলে আপনার কি! কিছু বললেই চটে যেতাম। এবং মনে হত, তিনি আপদবিশেষ। জাহাজের কাজকর্ম ছাড়া হয়তো খবরদারি করার কথাও নয়। বন্দরে কে কোথায় রাত কাটায়, জানার তাঁর কোনো অধিকার নেই। আমার বেলায় তাঁর যত নজর। কেমন যেন জেদি হয়ে যাচ্ছিলাম। উচিত শিক্ষা দিতে হবে। যাতে তিনি কখনো আর আমার ব্যক্তিগত কাজেকর্মে নাক না গলান, সেজন্য মরিয়া হয়ে উঠলাম।
বোধহয় সময়টা জুন-জুলাই। প্যাঁচপ্যাচে বৃষ্টি। কার্ডিফ থেকে এই বৃষ্টির মধ্যেই খালি জাহাজ নিয়ে আমরা রওনা হলাম।
কাছাকাছি আর কোনো বন্দরে জাহাজ ধরছে না।
বুয়েন্সএয়ার্স থেকেও আমরা খালি জাহাজ নিয়ে রওনা হয়েছিলাম। ভিক্টোরিয়া পোর্টে মাত্র দুদিনের জন্য থেমেছিল। ব্রাজিলের এই বন্দরটি লৌহ আকরিক রপ্তানির জন্য বিখ্যাত। দু-দিনেই লৌহ আকরিকে জাহাজ বোঝাই। সেখান থেকে টানা সমুদ্র ভেসে গেছি বে অফ বিসকে পর্যন্ত। প্রায় মাসখানেক জাহাজ সমুদ্রে।
কার্ডিফে মাল খালাস। ড্রাই-ডক সারতে বিশ-বাইশ দিন কী বেশি সময় লেগেছিল সঠিক এখন আর মনে নেই।
শুধু মাসখানেক পর আমরা পোর্ট অফ জামাইকা যাব। যেখানে জাহাজের রসদ নেওয়া হবে।
ক্যারাবিয়ান সিতে দু একদিনের জন্য নোঙর ফেলা হবে। জাহাজের চার্টে এমন খবর পেয়ে আমরা বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম। কারণ তারপর কোনদিকে কী নিয়ে রওনা হবে জানি না বলে মন বেশ খারাপ।
