সে আমার হাতে র্যাকেট দেবেই।
আমি খেলব সে বল কুড়োবে। খুব কাছে থেকে বুঝলাম, সে সবে বালিকা বয়স পার করেছে। একজন প্রৌঢ় মতো লোক বের হয়ে এলে তাকে কিছু বলল মেয়েটা। সেও আমার দিকে তাকিয়ে হাতের ইসারায় কিছু বোঝাবার চেষ্টা করল।
তখনই টের পেলাম হাতের ইশারায় কিংবা মুখের অঙ্গিভঙ্গি দিয়ে বোঝাতে না পারলে মেয়েটা আমার কোনো আগ্রহের কথাই বুঝবে না।
খেলার চেয়ে বল কুড়িয়ে আনার আগ্রহ যে বেশি, বোঝাই কী করে।
এ ছাড়া র্যাকেট কি ভাবে ধরতে হয় জানি না। যদিও এটা কোনো সমস্যা নয়–কিন্তু বল ছুঁড়ে মারতে গেলে ফসকে যাবারই সম্ভাবনা বেশি।
খুবই কাঁচা কাজ হয়ে যাবে ভেবে র্যাকেটটা কিছুতেই নিচ্ছিলাম না। জোর করে গছাবেই, অজস্র কথাও বলছে, যার এক বর্ণ বুঝতে পারছি না।
ওর শরীরে ভারি সুঘ্রান।
সামান্য হাওয়ায় ওর বব করা চুলে ঢেউ খেলে যাচ্ছিল। যেন এই যে বালিকা কিংবা তরুণী যাই বলা যাক, তার মুখে সামান্য অভিমানও ফুটে উঠতে দেখলাম।
এত নাছোরবান্দা হলে পারা যায়।
যেন খুশি করার জন্যই র্যাকেট হাতে সাদা বল মাথার ওপর ভাসিয়ে দিলাম।
যা হবার তাই হল।
কোথায় যে গেল বলটা।
ফসকে গেছে। এত জোরে মেরেছিলাম যে র্যাকেটও ফসকে গেল হাত থেকে।
আর আশ্চর্য দেখি মেয়েটা ফুলে ফুলে হাসছে। হা হা করে হাসছে। এত হাসছিল যে আমি খুবই অপ্রস্তুত হয়ে গেলাম।
বয়সের দোষে অপমান বোধ প্রখর।
আমি হাঁটা দিতেই মেয়েটা এসে পেছন থেকে আমাকে জড়িয়ে ধরল।
না এতটা আমি আশা করিনি, সমবয়সী এক তরুণ তার খেলা দেখার জন্য একা একা দাঁড়িয়ে থাকে—এটা তার কাছে কোনো বিস্ময়ের কারণ হতে পারে–কিংবা এপ্রিসিয়েট করছে তার খেলার এটাও ভাবতে পারে—সে যাই ভাবুক, আমি নড়তে পারলাম না।
সে হাত টেনে আমাকে নিয়ে গেল। কী করে র্যাকেট ধরতে হয় দেখাল, কী করে বল ছুঁড়ে দিতে হয় দেখাল। এবং সে আবার হাতে র্যাকেট দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকল, আমি ঠিক মারতে পারি কি না।
র্যাকেটটা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়েছি। আর হাসির খোরাক হতে রাজি না। সে দু হাত নাচিয়ে আমাকে এনথু দিতে চাইছে। আমি যে কী করি!
সে এসে এবার র্যাকেটটা আমার হাত থেকে তুলে দিল। কী ভাবে ধরতে হয় দেখাল। বল লুফে মারতে হয় কী ভাবে তাও দেখাল। টেনিস র্যাকেট এত ভারী তাও আগে জানতাম না। দেখিওনি। খুব বেশি ব্যাডমিন্টন খেলেছি কলেজে। দু যাকেটের আকাশ পাতাল তফাত। কজির জোর না থাকলে হয় না।
তারপর আমি আবার মিস করলাম।
সে আবার দেখিয়ে দিল।
একবার সত্যি লেগে গেল।
আর মেয়েটা হাততালি দিয়ে আমাকে চিয়ার্স করল।
এই হল আমার মরণ।
আমাদের জাহাজ বুয়েন্সয়ার্স বন্দরে বোধহয় মাসখানেক ছিল। পাটের গাঁট নামানো, তারপর মাল বোঝাই হবার সময় আচমকা বন্দরে শ্রমিক ধর্মঘট।
জাহাজ টানা একমাসই বন্দরে লেগে থাকল। আর ক্রমে আমি চেরির ঘনিষ্ঠ হয়ে গেলাম। তার নাম চেরি। একদিন সে হাতে করে ফল এনে দেখাল। একবার আঙুলে ফল দেখায়, একবার আঙুল বুকে ঠেকায়। একদিন সে ইশারায় বোঝাল, আমার জাহাজ দেখতে আসবে। কিন্তু আমি যে সেকশনে থাকি, তা খুবই অপরিষ্কার, তাকে এনে কোথায় বসাব এই দুশ্চিন্তায় মাথা খারাপ। সারা সকাল বাংক পরিষ্কার করলাম। বিছানার চাদর কেচে ফেললাম। নোংরা পোষাক সব লকারের এক কোনায় কাগজ দিয়ে মুড়ে ফেললাম। সারেঙ সাবকে বলে বাংকে রং লাগালাম। বাংকে সাদা রং। তারপর কসপের কাছ থেকে একটা পুরোনো কম্বল এনে গালিচার মতো মেঝেতে বিছিয়ে দিলাম। আমার সাফসুতরোর ব্যাপারে এত মনোযোগ দেখে সব জাহাজিরা বেশ তাজ্জব বনে গেছে। বনার্জীর এই সুমতি–তার তো কিছুই ঠিক থাকে না। হপ্তার পর হপ্তা সমুদ্রে এক জামা-প্যান্ট পরে কয়লা টানি। ঘাম বসে গিয়ে শক্ত খড়খড়ে প্যান্ট। সারেঙ সাব দেখলে শুধু প্যান প্যান করেন। বলেন, তোর ঘেন্নাপত্তা নেই। দোতলাটায় আমরা দুজন থাকি। উপরে থাকে বাহারুদ্দিন। ওকে বাহার বলে ডাকি। গরমের সময় সমুদ্রে সে লোক ফোকসালে হয় গামছা নয় তোয়ালে পরে থাকে। খালি গা। তবে বুয়েন্সএয়ার্সের প্রচণ্ড ঠান্ডায় লুঙ্গি পরলেও, ওপরে পুলওভার গায়ে দেয়।
ওকে নিয়েই ঝামেলা।
ওর সতরঞ্জি শতছিন্ন। নানা জায়গায় সেলাই করা। কৃপণ স্বভাবের। ওর ফুটো কম্বল এবং মোটা কাঁথা এখুনি কোথায় যে রাখি। একমাত্র সারেঙ সাব যদি রাজি হন।
সারেঙ সাব রাজি। একজন কয়লাওয়ালার পেটি তার ঘরে রাখা খুব সম্মানের না। তবু সে জাহাজে আসবে শুনে সারেঙ সাব কেন যে আমার সম্মান রক্ষার্থে নিজেই দায়িত্ব নিয়ে ফেললেন। বাটলারের কাছ থেকে ফুলদানি পর্যন্ত চেয়ে আনলেন। এক গুচ্ছ মিমোসা ফুল ফুলদানিতে রাখলাম। প্রায় পূজা-পার্বণের মতো ঘরটাকে সাজিয়ে ফেললাম।
আমরা ইশারায় ততদিনে কথা বলতেও শিখে গেছি। দুটো একটা ইংরেজি সেও জেনে নিয়েছে। সে এলে কফি সার্ভ করা হল। এক প্লেট বিরিয়ানি দেওয়া হল। সে খেয়ে খুব খুশি। সর্বাগ্রে সঙ্গে সে ইশারায় কথা বলার চেষ্টা করছে। তাকে আমি ইঞ্জিনরুমে নামিয়ে সব ঘুরে ঘুরে দেখিয়েছি।
সেও আমার তার গাড়ি করে এক বিকেলে এভিতাতে নিয়ে গেল। এভাপেরনের সমাধিক্ষেত্র দেখলাম। কী শান্ত আর নির্জন। বড়ো বড়ো গাছের ছায়ায় নায়িকা এভাপেরনের সমাধি। গাড়ি করে দূর দূর থেকে লোক আসে। সেখানে আমি আর চেরি ঘাসের ওপর চুপচাপ শুয়ে থাকতাম। পাখিরা সমুদ্র থেকে উড়ে আসত। যেন এক মায়ায় জড়িয়ে যাচ্ছিলাম চেরির সঙ্গে। তার মা বাবা একদিন আমাকে জাহাজ থেকে নিয়ে গেল। আমরা খাওয়াদাওয়া সেরে সে দেশের বিখ্যাত আপেলবাগান দেখতে বের হয়ে গেলাম।
