কেমন সব মরীচিকার মতো, এই আছে এই নেই। কিন্তু বাড়ি থেকে আর কেউ প্রায় বেরই হল না। কিছুক্ষণ পর একটা গাড়ি বের হয়ে গেল। আবছা আলোয় টের পেলাম, গাড়িতে সে আছে।
জাহাজে ফিরতে ইচ্ছে করছিল না।
আমি সাদা টেনিস বল যতবার হাতে দিয়েছি, ততবার সামান্য নত হয়ে বাউ জানিয়েছে।
কেমন ফাঁকা ফাঁকা লাগছিল।
হাজার হাজার মাইল দূরে আমি ঘাসের ওপর শুয়ে আছি। ছোটো ছোটো ভাইবোনদের অনাহার থেকে রক্ষা করার এ-ছাড়া আমার আর কোনো উপায়ই ছিল না।
বাবার বিষণ্ণ মুখ মনে পড়ছে।
মা-রও।
ছোট ভাইরা তখন চারপাশে ঘিরে দাঁড়িয়ে থাকে। তাদের এক কথা দাদারে।
আমি নিজের সঙ্গে নিজে কথা বলি।
দাদারে।
বল।
ফিরবি না! কত রাত হল?
আমার মধ্যে আবার সে জেগে ওঠে—অথচ পিতার একমাত্র প্রথম পুত্র।
আমি উঠে বসি। জাহাজে ফিরে যাই।
গ্যাঙওয়ে ধরে উঠে যাবার জন্য সিঁড়ি ভাঙছি। কেমন ক্লান্ত মনে হত নিজেকে। জাহাজ কবে ফিরবে দেশে কেউ বলতে পারে না। কতকাল এভাবে জাহাজ নিয়ে বন্দরে বন্দরে ঘুরবে তাও জানি না। জাহাজ সমুদ্রে ভাসলেই আতঙ্ক। সেই ওয়াচ, টন টন কয়লা টেনে নিয়ে যাওয়া, রাশি রাশি ছাই হাপিজ করা কাজ সেরে উঠে এসে স্নান আহার, তারপর লম্বা হয়ে শুয়ে পড়া।
কিন্তু কী যে আতঙ্ক ছিল, কিছুতেই ঘুম আসত না।
এই বুঝি উঠে এল ইঞ্জিন রুমে যাদের ‘পরি’ থাকে, তাদেরই কাজ জাগিয়ে দেওয়া, আমার দিনের পরি’ অর্থাৎ ওয়াচ ছিল আটটা বারোটা। রাতেও আটটা বারোটা। চার ঘণ্টা করে কাজ আট ঘণ্টা বিশ্রাম ঠিক তবে কী দিনে, কী রাতে আমার ছিল অস্বস্তি। ওয়াচে যেতে হবে শুনলেই আতঙ্কে মুখ কাল হয়ে যেত।
তবে তিন চারমাসে রপ্ত হয়ে উঠেছিলাম। আগের মতো ওয়াচের আতঙ্কে ভুগতাম না। ডাঙা এলে খুশির জোয়ারে ভেসে যেতাম। শহরের রাস্তা ধরে হেঁটে গেছি, পাহাড়ি বন্দর হলে টিলায় উঠে সমুদ্রে সূর্যাস্ত দেখেছি, আর সব বন্দরেই একটা না একটা মোহে পড়ে গেছি।
ফিরতে বেশি রাত হওয়ায় সারেঙ সাব মুখ গোমড়া করে ফেলেছেন। নিশ্চয়ই দেবনাথদারা এসে সব বলেছে। কোনো তরুণীর টেনিস বল কুড়িয়েছি শুনে সারেঙ সাব নিশ্চয়ই ভেবেছেন ছোড়া হয়ে গেল। কিন্তু তার জন্য এত রাততো হবার কথা নয়। রাস্তা হারিয়ে ফেললে, বন্দরে ফেরা যাবে না এই দুশ্চিন্তাও থাকতে পারে।
আমাকে দেখে তিনি কথা বললেন না। আমি ফেরায় তিনি নিশ্চিন্ত দেখে তাও মনে হল না। কেবল সিঁড়ি ধরে নীচে নামার সময় বললেন, তোর খাবার ভাণ্ডারি ঢাকা দিয়ে রেখেছে। হাতমুখ ধুয়ে খেয়ে এবারে উদ্ধার কর।
পরদিন সেজে গুঁজে একাই বের হয়ে গেছিলাম। যেন হেঁটে গেলেই দেখতে পাব একটা ইউক্যালিপটাস গাছ দাঁড়িয়ে আছে। পাচিলের পাশে সাদা সাদা খাটো ফ্রক গায়ে টেনিস খেলছে। রোজই কেন যে মনে হত, আজ হয়ত গিয়ে তাকে দেখব না।
ঠিক দূর থেকে দেখলাম গাছটা।
কিন্তু কেউ খেলছে না।
তবে কী আমার মতো একজন অপরিচিত তরুণের বল কুড়িয়ে দেওয়া পছন্দ নয়।
তা ছাড়া মারধর করবার জন্য দলবল নিয়ে বাড়ির ভিতর সে ঘাপটি মেরে নেই ত। এমনও মনে হত।
মনটা দমে গেল।
জাহাজে ফিরে যাব ভাবছি। যদি সত্যি গেট খুলে ওরা ছুটে আসে। মেরে ছাল চামড়া তুলে দিতে পারে। এ-সব যখন ভাবছিলাম, তখনই দেখি মেয়েটা গাছের নীচ দিয়ে ছুটে আসছে। এক হাতে র্যাকেট অন্য হাতে টেনিস বল।
আমাকে দেখে মিষ্টি করে হাসল। তারপর বলটা ওপরে ছুঁড়ে দিয়ে সার্ভ করতেই আমার সব সংশয় জল হয়ে গেল। না, আমাকে সে খারাপ লোক ভাবেনি। আমি যে জাহাজি তাও বুঝতে পেরেছে। কারণ আমার চেহারা এবং পোশাকে দুর সমুদ্রের ঘ্রাণ আছে মেয়েটি বোধ হয় টের পেয়েছিল।
সেদিন সে ইচ্ছে করেই দেরি করেছিল, না টানে-টানে আমিই সকাল সকাল জাহাজ থেকে নেমে গেছিলাম মনে করতে পারছি না। কেবল মনে আছে দুধে আলতা রং তার। চোখ কালো, চুল নীলাভ। মুখে তার আশ্চর্য দেবী মহিমা।
সে সেদিন ইচ্ছে করেই বল বেশি মিস করছিল, আর আমি দৌড়ে দৌড়ে তার বল কুড়িয়ে দিয়ে যখন কৃতার্থ হচ্ছিলাম, তখনই একবার র্যাকেটটা বগল দাবা করে আমার দিকে এগিয়ে এল। মিষ্টি হেসে কী বলল, তার এক বর্ণও বুঝলাম না।
তবে আমি বললাম, ইয়েস সি সেলর।
কী বুঝল সেই জানে।
আবার বল নিয়ে সার্ভ করল। পাঁচিলে ঠেকে বল ফিরে আসছে, ডান হাত বাঁহাতে সে বল পাঁচিলে ফিরিয়ে দিচ্ছে। একটা বলও মিস করছে না।
আমি বোবার মতো পাশে দাঁড়িয়ে তার এই মজার খেলা দেখছি।
সে যে কী বলল!
আমার ভালো লাগছিল না। আশ্চর্য সে একটা বলও মিস করছে না। মিস না করলে আমার আর থেকে কাজ কী। আমি তো তার বল কুড়িয়ে দেবার জন্যই দাঁড়িয়ে থাকি। বোধহয় ভিতরে কোনো অভিমান কাজ করে থাকতে পারে। আমি হাঁটা দিচ্ছিলাম, আর তখনই-হুই। শিস দেবার মতো আমাকে উদ্দেশ্য করে কিছু যেন বলল।
কাছে গেলে দেখি সে র্যাকেটটা আমার দিকে এগিয়ে দিচ্ছে। বলটাও।
আমি যে এ-ব্যাপারে একেবারে আনাড়ি মেয়েটা বোধহয় জানে না। তাও ভাবতে পারে সাদা বলের প্রতি এত যখন আগ্রহ, তখন আমারও খেলার ইচ্ছে আছে। সে আমার হাতে র্যাকেট তুলে দিতে এলে সরে দাঁড়ালাম বললাম, নো নো।
তারপর বললাম, আই নো নাথিং অফ দিস গেমস।
আমার কথা সে কিছুই যে বুঝতে পারছে না, হাব ভাবেই বোঝা গেল।
