আমি পরেছিলাম, কালো সুট। জামার ওপর লাল রঙের পুলওভার। আর গলায় আমার স্কার্ফ জড়ানো।
যাক বেটা দাঁড়িয়ে থাক। রাস্তা হারিয়ে ফেললে আমরা জানি না।
মনে আছে, আমি বলেছিলাম, তোমরা যাও না। একা জাহাজে ঠিক ফিরে যায়।
ফিরেও গেছিলাম।
মেয়েটি গেট দিয়ে দৌড়ে ঢুকে গেলে আমি কিছুটা অস্বস্তিতে পড়ে গেলাম। লোহার গেট-বাড়িটার সামনে কোমর সমান পাঁচিল। সদ্য রং করা মনে হয়। বাড়িটা। সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে ফুল-ফলের বাগান। সব বাড়িগুলিই প্রায় দেখতে একরকম। কোনো বাড়ি থেকে আর একটা বাড়িকে আলাদা করা যায় না। কেবল এ-বাড়িটার বিশেষত্ব বাগানে একটা ইউক্যালিপটাস গাছ আছে। তার সাদা পাতা, সাদা রঙের ডালাপালা দেখলেই আমি ঠিক চিনতে পারব, এ বাড়িটার পাশেই কোমর সমান পাঁচিলের সামনে মেয়েটি দাঁড়িয়ে টেনিস খেলে। একা একা এই টেনিস খেলারই বা কী মজা আমি তখন জানতাম না।
ভয় হচ্ছিল।
দেবনাথদারা চলে গেছেন। বন্দরের জাহাজ, কিংবা মাস্তুলও অদৃশ্য। চলে গেলে ভাববে পালিয়ে গেছে। এটা একজন ভারতীয় নাবিকের পক্ষে শোভা পায় না, এমন মনে হচ্ছিল। অবশ্য জাহাজ পাটার, কিংবা যেখানেই গেছি দোকানে আমাদের দেখলেই এটা-ওটা কেনার পর প্রশ্ন করত, কোথা থেকে এসেছ!
বলতাম, ইন্ডিয়া থেকে।
তারপরই বেশ সমীহ জবাব, আই সি ইউ আর গ্যান্ডি পিপল।
ভারতীয় যে আমরা, তা যেন সে-সময়ে খুবই গৌণ হয়ে গেছিল। গান্ধি পিপল বলেই যেন খারাপ কাজ শোভা পায় না। আর তখনই ভদ্রা জাহাজে ট্রেনিং-এর সময়কার সেকেণ্ড অফিসারের সতর্ক কথাবার্তা শুনতে পাই।
মাই বয়েজ।
তিনি এ-ভাবেই কথা বলতেন।
মাই বয়েজ, তোমরা জান, স্বাধীন হওয়ায় আমাদের দায়িত্ব বেড়ে গেছে। তোমরা জান, জাহাজে নাবিকের কাজ যাঁরা করতেন, তারা অধিকাংশই এখন পূর্ব পাকিস্তানের লোক।
মাই বয়েজ, মনে রেখ, তোমাদের কাজ দেখে যেন জাহাজের কর্তা ব্যক্তিরা খুশি হন। বেঙ্গলি পিপল, লেজি, বাগার, এ ধরনের একটা ধারণা আছে তাঁদের।
এখানে বলে রাখা ভালো, জাহাজে ওঠার পর সবাই আমাদের বাঙালিবাবু বলতেন। পূর্ব-পাকিস্তান থেকে যারাই জাহাজে উঠতেন, তারা সবাই মুসলমান। তাদের থেকে আমরা যে আলাদা, বাঙালিবাবু বলে সেটা যেন মনে করিয়ে দিত? এই নিয়ে মনু, ইমতাজ, আমাদের সঙ্গে কতদিন তর্ক হয়েছে। আমরা বলতাম, তোরা কী, তোরা বাঙালি না! আমাদের বাঙালি বাবু বলিস!
ওরা কিছুতেই এটা মানতে পারত না। তারাও যে বাঙালি মুসলমান, বাংলা ভাষা তাদের মাতৃভাষা কিছুতেই বুঝতে চাইত না। আরবি ফারসিও নয়, এমনকী উর্দুও নয়, এত্তারে, ওত্তারে যাদের লজ্জা, তারা বাঙালি জাতি সম্পর্কে এত উদাসীন যে মাঝে মাঝে ক্ষেপে গিয়ে বলতাম, তোমাদের মিঞা ত যাবে না। মনে রেখ তোমরাও বাঙালিবাবু।
কেউ কেউ অবশ্য আমাদের যুক্তি ধরতে পেরে চুপ করে যেত।
বলতাম, পাকিস্তানি পাকিস্তানি বলে গেলে! এত দেমাক! আর বাংলা দেশটাকে ভাগ করে পাকিস্তান বানালেই হল। খেজুর গাছ আছে মরুভূমি আছে? আর দেশটা অনেক দূর জানিস। মুসলমান বলেই তারা তোদের সব, আমরা কেউ নয়! আবার কোনোদিন শুনছি ত, এই বাঙালিবাবু চা আছে, চিনি আছে, সিগারেট আছে—বললে কোনো সাড়া পাবি না বলে দিলাম।
তারপর এ নিয়ে তর্ক এত প্রবল হয়ে উঠত যে সারেঙ সাব এসে বলতেন, জাত আবার কিরে। মানুষের গোত্র বিচার মনুষ্যত্ব দিয়ে। তা না থাকলে, বাঙালি হও পাকিস্তানি হও কিছু আসে যায় না।
সারেঙ সাবের সামনে আমরা কেউই তর্ক করতাম না। তিনি বলতেন, যার ইমন নাই, সে হিন্দুও না মুসলমানও না। সে কাফের বুঝলি।
তিনি চলে গেলেই, আমেদ ক্ষেপে গিয়ে বলত, বুড়োর একমাত্র ছেলেটা লন্ডনে নেমে যাবার পর থেকেই কেমন হয়ে গেছেন। শুনলি তো কথাবার্তা। আমেদ আমার দিকে তাকিয়ে বলতেন, তোরই বয়সী। জাহাজে সঙ্গে নিয়ে উঠেছিলেন। জাহাজের কাজ কাম শিখলে সফরে বের হতে পারবে। আর সফর! বিলাতের ঘাটে সেই উধাও হয়ে গেল আর কোনো খোঁজ নেই।
সেদিনই আমি টের পেয়েছিলাম, বুড়ো মানুষটি আমি দেরি করলে কেন এত ক্ষেপে যান। তিনি কী তার পুত্রের কথা ভেবে বিচলিত হয়ে পড়েন। তিনি কী বোঝেন, এই বয়সটাই খারাপ! কী জানি, এত দিন পর জীবনের সে সব রহস্যময়তার কথা ভাবলেও মন কেমন উদাস হয়ে যায়।
যা বলছিলাম, সেকেন্ড অফিসার বলতেন, মনে রেখ, প্রায় দেশে আমাদের দূতাবাস আছে। তাদের সঙ্গে সাধারণ মানুষের কোনো যোগাযোগ থাকে না। তোমরাই হলে আসল, এদেশের পরিচয়— তোমাদের আচরণে এই দেশ সম্পর্কে বিদেশিরা অনুমান করতে পারবে, ভারতীয়রা গরিব, তবে তাদের শালীন আচরণের তুলনা নেই। তোমরা জংলি নও। তোমরা হলে আসল ভারতীয় দূত।
আসল ভারতীয় দূত, এই উক্তি জাহাজে উঠে মনে থাকার কথা না। বিপদে পড়লে মনে পড়ত।
যেমন মেয়েটি না খেলে, বল নিয়ে দৌড়ে পালাল। বেশ সুন্দর জ্যোৎস্না উঠেছিল। বুলেভার্ডে মসৃণ ঘাস, গালিচার মতো। খুব যত্ন নেওয়া হয় ল্যান্ডমেয়ারে কাটা ঘাস হাঁটলেই বোঝা যায়।
দেখাই যাক না কী হয়।
আমি ঘাসের ওপর বসে পড়লাম।
দোতলার কোনো ঘরে কে আলো জ্বেলে দিল। রঙিন কাচের ভিতর এক নারীমূর্তিকে হাঁটাহাঁটি করতে দেখলাম। তারপর অদৃশ্য হয়ে গেল।
