ইমানুল্লা সাব যেন জলে পড়ে গেছিলেন। আমার দিকে তাকিয়ে বলেছিলেন, একা যাবি! তোর এত সাহস! পরি-হুরির দেশ। বাইন্দা রাখলে আমি কিছু জানি না।
সারেঙ সাব কখনো তাঁর দেশের ভাষায় কথা বলেন। রাগ কিংবা ক্ষোভ অভিমান হলেই মাতৃভাষা বের হয়ে পড়ে। তিনি গুম মেরে গেলে বলেছিলাম ওরা নেবে কেন সঙ্গে বলুন। আমার জন্য ওদের তাড়াতাড়ি জাহাজে ফিরে আসতে হয়। কে আপনার ধমক সহ্য করবে।
দেবনাথ, বন্ধু, অমিয় চলে যাচ্ছিল। সারেঙ সাব তাদের পেছনে ছুটছেন। আমি বসেছিলাম বিমর্ষ মুখে। আঙটায় পিচের বেঞ্চিতে বসে দূরের সমুদ্র দেখছি। গাছগুলি পার হয়ে ছোট্ট মতো পার্কটা পার হয়ে গেলে আমার সমুদ্র। অথচ গাছপালার জন্য দূরের কিছু দেখাও যায় না। ইন্ডিয়া থেকে জাহাজ গেলে যারা পার্কে বেড়াতে আসে, তারা জাহাজে ওঠে কিছু কেনাকাটাও করে। যেমন যারা পুরোনো জাহাজি যারা ব্যাংক লাইনের জাহাজেব সফর করেছে কয়েকবার। তারাই জানে, ময়ূরের পালক কিংবা কাঠের হাতি চওড়া দামে বিক্রি করা যায়।
জাহাজটা মাত্র কয়েক ঘণ্টার জন্য কলম্বো বন্দরে থেমেছিল।
নীচে নৌকার ভিড়। কিনারার লোক কাঠের হাতি, কাঠের বুদ্ধমূর্তি কিংবা ময়ূরের পালকে তৈরি পাখা বিক্রি করতে চলে এসেছে নৌকায় করে। যারা জানে, তারা ঠিক কিনে নেয়। এতে যে দু-পয়সা কামানো যাবে বুয়েন্সএয়ারস বন্দরে গেলে তারা তাও জানে। এবং সেই সব জাহাজিরাই আফটার-পিকে বেশ দোকান সাজিয়ে বসার মতো বসে গেছে। স্প্যানিস নারী-পুরুষের যে কোনো কারণেই এই সব ময়ূরের পালক, কাঠের হাতি, কাঠের বুদ্ধ মূর্তির প্রতি বিশেষ আগ্রহ আছে টের পেলাম। জোড়ায় জোড়ায় উঠে আসছে। দর-দাম করে কিনে নিয়ে যাচ্ছে।
আমি এদের মধ্যে ঘাপটি মেরে বসেছিলাম-ইমানুল্লা সাব ফিরে এসেই ডাকাডাকি শুরু করে দিয়েছিলেন, ওরে বনার্জীরে দেখছ! গেল কোথায়! অ বনার্জী গেলি কোথায় বাবা। যা। জামাকাপড় পালটে নে। সু বুরুশ করে নে। দেবনাথ কিনারায় অপেক্ষা করছে।
সারেঙসাবের এই কাতর ডাক আমাকে খুবই বিচলিত করে তুলত। শেষ পর্যন্ত রাগ পুষে রাখতে পারতাম না। দৌড়ে টুইন-ডেক পার হয়ে গ্যাংওয়ে ধরে নেমে যেতাম—ডাকতাম, দেবনাথদা দাঁড়াও। আমি আসছি।
গাছগুলি পার হলেই, শহরের বড়ো রাস্তা।
ওরা বড়ো রাস্তার পড়ার জন্য হাঁটছিল।
যেদিকে তাকাই চোখ জুড়িয়ে যায়।
কোথাও একটা মেয়ে সাদা ফ্রক আর সাদা প্যান্ট পরে একটা টেনিস বল নিয়ে পাঁচিলে মারছে, আবার ফিরে আসছে বলটা, আবার মারছে। শহরের মাথায় রোদ নেমে আসছে। এ-দেশে এটা শীতকাল না বসন্তকাল আমরা টের পাই না। আমাদের কাছে প্রচণ্ড ঠান্ডার দেশ। কোট প্যান্ট, শালদরাজ কী নেই—তবু সমুদ্র থেকে কনকনে ঠান্ডা বাতাস উঠে আসছে। অথচ মেয়েটা একটা স্কার্ট আর ফ্রক গায়ে নিজের মনে পাঁচিলটার সঙ্গে খেলছে। রাস্তায় কোনো ভিড় নেই। ইতস্তত মানুষের হাঁটাহাঁটি। নর-নারীদের পোশাকেও বিশেষ বাহুল্য নেই। কটনের সার্ট প্যান্ট পরে অনায়াসে ঘুরতে পারছে। আমরা পারছি না।
আমি যেখানে যা কিছু দেখি কেমন অবাক হয়ে যাই। নীলচে রঙের বব করা চুল, মুখ আপেলের মতো মসৃণ, শরীরে বোধ হয় আশ্চর্য সুবাস আছে। আমার বয়েসী এই মেয়েটা এখানে আছে ভাবতে কেমন অবাক লাগে।
ইচ্ছে হত কথা বলি।
কিন্তু সাহস হত না।
দেবনাথদা ডাকলেন, এই তুই কিরে! কি দেখছিস! কোনো লাভ নেই।
সত্যি কোনো লাভ নেই। তবু দেখার জন্য মনের মধ্যে একটা টান জন্মায় কেন বুঝি না। ওদের পছন্দ হচ্ছিল না।—এই হা করে দেখছিস দেবনাথদা চিৎকার করে বলল, হারামজাদা কী দেখছ বুঝি না!
আসলে আমি কী দেখছিলাম, ওর স্তন! কারণ ভারী স্তন খেলতে গিয়ে দুলে উঠছিল—ওর থাই এত মসৃণ, যেন হাত দিলে মোমের মতো পিছলে যাবে।
শুধু পিছলে যাবে, না আরও কিছু যেমন জংলার অন্তর্গত সেই নিদারুণ ভূমি— আমি কী তার আঁটো প্যান্টের ভিতর সেই আকস্মিক হতচ্ছারা তরুণকে খুঁজছিলাম। যার মধ্যে আছে অন্তহীন এক অন্তর্গত খেলা। কেমন যেচে বন্ধুত্ব করতে ইচ্ছে হচ্ছে। সে যদি পড়ে যেত, তাকে তুলে দিতাম। তার এই নমনীয়তা আমাকে আকর্ষণ করতেই পারে।
আর তখনই সাদা বলটা মাথার ওপর দিয়ে ফসকে গেল। আমি দৌড়ে গেলাম। বলটি কুড়িয়ে আবার তার কাছে দিলাম। বলটি দিলে সে সামান্য হেসে কিছুটা জানু নত করে আমার কাছে বোধহয় কৃতজ্ঞতা জানিয়েছিল।
আমি নড়ছিলাম না।
দেবনাথদার হুঙ্কার, মর বেটা। হারামজাদা তুমি শালা ঈশ্বরের পুত্র। কেউ তোমাকে কিছু বলতে পারে না। তোমার নিন্দা শুনলে সারেঙসাব কথা ঠিক রাখতে পারেন না।
কিরে যাবি?
এই যাচ্ছি দাদা।
রাস্তাগুলি এত চওড়া যে ইচ্ছে করলে যেন ফুটবলও খেলা যায়। এটা বন্দরে ঢোকার রাস্তা, গাড়ি-টারি কম। আর তা ছাড়া এই প্রশস্ত রাস্তায় ইচ্ছে করলেই বেগে গাড়ি চালানো যায় না। কারণ সামনে সমুদ্র। বিচের দিকে যারা যায়, তারা এদিকটায় গাড়ি পার্ক করে যায়। পাশের মাঠে বেশ গাড়ির ভিড়।
আমি দাঁড়িয়ে আছি ওর থেকে প্রায় দশ গজ দূরে। এই সব রাস্তাকেই বুলেভার্ড বলে কিনা জানি না। মাঝখানে গাছপালার সারি। কোনো গাছে হলুদ রঙের ফুল ফুটে আছে। সমুদ্রের হাওয়ায় ফুলের ওড়াউড়ি ছিল বেশ। কেন যে তরুণীকে ফেলে শহরের ভিতরে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল না। কেন যে দাঁড়িয়ে থেকে তার সঙ্গে খেলার অংশীদার হতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কেমন নেশার মতো পেয়ে বসেছিল— আর দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিলাম, আবার একটা বল মিস করলে সুযোগ পেয়ে যায়।
