আমি তটস্থ হয়ে পড়েছিলাম। এমনিতেই বিদেশ বিভুঁইএ কোনো অপরিচিত শহরে একা বের হতে একটা অস্বস্তি আছে। দল বেঁধে বের হওয়া ছাড়া উপায় থাকে না। দুজন আমরা তখন ছুটে পালাচ্ছি। কারণ হাতঘড়ি খোয়া যায়নি—এটাও কম ভাগ্যের কথা না। বন্দরে ঢুকে সেকেন্ড অফিসার বললেন, বাবা, প্লিজ ডোন্ট ডিসক্লোজ ইট টু এনিবডি।
আসলে সেকেন্ড অফিসার চাননি, সবার কাছে বোকা বনতে। জাহাজে কে কতভাবে যে ঠকে আসে ফিগার থেকে! ডাঙার এমনই মোহ। এবং নাবিকরাও কেমন অন্ধের মতো আচরণ করে ফেলে যুবতী নারীর সামান্য সঙ্গ পেলে।
এরপর আর আমার ডারবান বন্দরে বের হওয়া। ক্লা সাবের পাশে বসে মাছ ধরায় মনোযোগ দিয়ে ফেললাম। একদিন দুটো বেশ বড়ো সাইজের গলদা চিংড়ি গেঁথে ফেললাম। ওভারকোট হারিয়ে যে কষ্টে ভুগছিলাম, দটো চিংড়ি শিকারে তার কিছুটা অন্তত লাঘব হয়েছিল এখনও তা মনে করতে পারি। তবে বন্দর ছাড়ার আগে এক সকালে, একজন নিগ্রো এসে আমার ফোকসালে হাজির। তাকে আমি চিনি। জাহাজ থেকে মাল খালাসের সময় সে এজেন্ট অফিসের হয়ে শ্রমিকের কাজ করে গেছে। হাসিখুশি মানুষ। ডেকে উঠেই দু-জ্যাব ভর্তি ভাত নিয়ে মুঠো করে খেত আর বলত ওয়ান ওয়াইফ নো গুড, টু ওয়াইভস গুড। থ্রি ওয়াইভস ভেরি গুড। সে আমার ওভারকোট ফিরিয়ে দিয়ে বলেছিল ডোন্ট মাইন্ড, আই হ্যাভ থ্রি ওয়াইভস।
তবে আমি কেন যে ইমানুল্লা সাবের ওপর মাঝে মাঝে ক্ষেপে যেতাম বুঝতে পারতাম না। আর যারা এনজিন জাহাজি আছে, তাদের ওপর খবরদারি করায় যেন বিন্দুমাত্র তাঁর ইচ্ছে নেই। কাজ কাম শেষে কে কোথায় যায়, কোথায় রাত কাটায় কিছুই জানতে চায় না। জানার নিয়মও নয়।
অথচ আমার বেলায় তাঁর ষোলো আনা মেজাজ।—’এত রাত করে ফিরলি। কার সঙ্গে গেছিলি! কোথায় গেছিলি! কোথায় গেছিলি বল! চুপ করে আছিস কেন।
আসলে কখনো-কখনো রাত হয়ে যেত। দু-চারদিন নেশা করেও গিয়েছি। নেশা করলেই তিনি তার ফোকসালের দরজা বন্ধ করে দিতেন। রাতে খেতেন না। ভান্ডারি নীচে নেমে বলত, যান বনার্জী সারেঙ সাবের গোসা ভাঙান গিয়া। ক্যাম নে খান, বেতমিজ হতে ভালো লাগে!
পরে কেন যে নিজেরই খারাপ লাগত—বাংক থেকে উঠে পড়তাম। সিঁড়ি ভেঙে ওপরের ফোকসালে যেতাম। সারেঙ সাব একা একটা ফোকসালে থাকেন। একটা কাঠের পেটি বাংকের নীচে। একটা হুকা ঝোলানো বাংকের কোনায়। একটা বড়ো এনামেলের হাড়ি দড়ি দিয়ে বাঁধা। এবং সেটা ছাদের আংটায় ঝোলানো। তাতে রাব ভর্তি। তামাকের বস্তা আছে। বস্তা দিয়ে তামাক পাতা খুব যত্নের সঙ্গে জড়ানো। লকারে তার কী থাকে জানি না। আমি নেশা করে ফিরলে তার সেদিন কোরান পাঠ শুরু হয়। যেন আমার গুনাহ তিনি কোরান পাঠ করে স্পষ্ট করে দিতে চান। নামাজ শেষ করে দুলে দুলে পাঠ শুরু হবে, আর তখনই জাহাজে সবার এত কথা হয়ে গেল।
আর তারা এসে আমার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ত। কিংবা যায় সঙ্গে যাই, সেও অপরাধী সাব্যস্ত হত। এমন হয়ে গেল শেষে যে কেউ আমাকে ডাঙায় সঙ্গেই নিতে চায় না।
তাদেরও দোষ নেই।
কারণ সারেঙ সাব আমার চেয়ে তাদের বেশি তড়পাবেন। হারামজাদা, বেয়াকুবের দল, নিজেরা জাহান্নামে গেছিস বলে, সেদিনের ছেলেটাকে নষ্ট করে দিচ্ছিস।
বুয়েন্সএয়ার্স বন্দরেও সেই ঘটনা। আমি যেতে চাইলে কেউ সঙ্গে নিতে চায় না।
আর তখন সারেঙ সাব নিজেই হন্তদন্ত হয়ে উপরে উঠে আসতেন!—এই দেবনাথ যা-বনার্জীরে নিয়া যা!
দেবনাথও ছেড়ে কথা বলে না, দেখুন সারেঙ সাব, দেরি টেরি হলে তেড়ে আসতে পারবেন না।
যা, তোরা মাথা গরম করিস কেন যে বুঝি না। যা। বনার্জীরে নিয়া যা। ডাঙায় ঘুরে বেড়াক। মনটা পরিষ্কার থাকব।
দেবনাথ বলত, আমি বারণ করেছি। তোমার তড়পানি কে এত সহ্য করে।
যা বাবা। রাগ করিস না, বনার্জীরে নিয়া যা। বনার্জী বসে থাকলি ক্যান। যা।
তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলত, কিরে যাবি না! জাহাজে বসে বিকালটা কাটাবি কী করে! একা একা ভালো লাগবে!
শহরটা বড়ো বেশি সাজানো গোছানো। আমাদের জাহাজ জেটিতে বাঁধলে টের পেলাম, সামনে গাছের সারি। প্রকাণ্ড বড়ো বড়ো গাছ। গাছগুলো আমার চেনা নয়। ওক গাছ-টাছ হবে। নাও হতে পারে। প্রায় শ-খানেক গাছ সার দিয়ে লাগানো। গাছের নীচে সব কিনারায় লোক এসে জড় হয়েছে। জাহাজ থেকে নামলেই শহরে ঢুকে যাওয়া যায়। লেন্দ্রো অ্যালেন জায়গাটা বেশি দূরও নয়। শহরের জাঁকজমক এলাকা ওটাই। জেটি থেকে আধ কিলোমিটার রাস্তা হবে না। অনেক বন্দরে গেছি, কিন্তু একেবারে বন্দর বুকে নিয়ে একটা শহর গড়ে উঠেছে, এটা আর কোথাও দেখিনি। কোনও কাস্টম চেকিং নেই। জাহাজ থেকে নেমে দু-পা হেঁটে গেলেই শহর। কার্নিভেল। আর ফুলের সব দোকান। ফলের দোকান। যখন খুশি নেমে যাওয়া যায়—যখন খুশি ফেরা যায়। আর যুবতীরা এক একজন যেমন মিষ্টি আপেল হাতে নিয়ে হাঁটছে। আপেলের মতোই গায়ের রং। এবং সরস, কী নারী কি পুরুষ সবাই কী সুন্দর দেখতে। চোখ নীল, চুল নীলাভ, গায়ের রং গোলাপি এবং রং বেরঙের স্কার্ট, জ্যাকেট, দামি গাড়ি, বাড়ির পাশে ফুলের বাগান, তকতকে ঝকঝকে।
এই শহরে নেমে না খেতে পারলে আমি মরেই যাব। হঠাৎ ক্ষেপে গিয়ে বলেছিলাম, আমি একাই যায়। দেবনাথদা তোমরা যাও।
