বন্দরের জলে, হরেক রকমের সামুদ্রিক মাছের আড্ডা থাকে। কারণ জাহাজের উচ্ছিষ্ট খাবার জলেই ফেলে দেওয়া হয়। গভীর সমুদ্র থেকে মাছ যেমন উঠে আসে, তেমনি ভালো মাছ শিকারি হলে বড়ো দু-চারটে গলদা চিংড়িও কপালে মিলে যেতে পারে। এক ঘেয়ে খাওয়া, বৈচিত্র্য খোঁজাই স্বাভাবিক। তাছাড়া ভাত খেকো বাঙালির মাছ যে কী প্রিয় সবারই জানা। বন্দরে জাহাজ ভিড়লেই বঁড়শি নিয়ে কেউ কেউ বসে থাকে। আমিও বসেছিলাম ইমানুল্লা চাচার পাশে। মাছ ভিড়লই না।
কাহাতক ভাল্লাগে। খোঁট দিচ্ছি, উঠছে না। জাহাজ থেকে বন্ধু নেমে যাচ্ছে দেখেই মনটা দমে গেল।
বলেছিলাম, চাচা, বের হচ্ছি।
তিনি বোধহয় বুঝতে পারছিলেন মাছ শিকারের লোভ দেখিয়ে আমাকে আর আটকে রাখা যাবে না। শুধু বললেন, যা। তবে একা বের হস না। পারিসতো মাইজলা সাবের লগ ধরার চেষ্টা কর।
মাইজলা সাব অর্থাৎ জাহাজের সেকেন্ড অফিসার খুবই রসিক মানুষ। জাহাজিদের নেটিভ বলে ঘেন্না পেত্তা করে না। বরং হাই হুই করে একে ডাকে, ওকে ডাকে। দু-একটা হিন্দি বাতও বলতে পারে। যেমন, খানা মিলে গা! ইন্ডিয়ান কারি বহুত আচ্ছা।
অবশ্য সে মাঝে মাঝে আমাদের গ্যালিতে এসে প্রায় চুরি করে গোস্ত ভাত খেতে মজা পেত। তার দেশোয়ালি ব্রাদার অফিসারদের কাছে ধরা পড়ে না যায়, এই ভেবে সবসময় সতর্ক।
হ্যালো বাবা, প্লিজ লুক দেয়ার।
অর্থাৎ সে আঙুল তুলে কেবিনে ঢাকার রাস্তাটার দিকে নজর রাখতে বলত। কেউ বের হয়ে যদি এদিকে চলেই আসে, তবে মুখ মুছে, প্যান্টে হাত মুছে শিস দিতে দিতে নেমে যাবে। কারণ সে জানত, কাপ্তানের কানে খবর পৌঁছে গেলে আস্ত রাখবেন না। ন্যাস্টিম্যান বলে গালাগালি করবেন।
মনে আছে, সে আমাকে বাবা বলেই ডাকত। কারণ এই কথারও ইতিহাস আছে। কলকাতা থেকে জাহাজ ছাড়ার সময়ই আমার প্রতি তার কিছুটা সখ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা ছিল। সবার নাম জানারও কৌতূহল আছে। আমার নাম জিজ্ঞেস করতেই বন্ধু বলেছিল, সাহেব হি ইজ বস। হিজ নেম ইজ বাবা। অর্থাৎ আমার নাম বাবা। সারা সফরই সে আমাকে বাবা বলে ডাকত। খোঁজাখুঁজি করত, হোয়ার ইজ মাই বাবা?
সেই বাবা যখন ডারবানে জাহাজ ভিড়তেই নেমে পড়ার জন্য আকুল এবং আমি কোনো ফাঁদে পড়ে না যাই বন্দরে সেই আতঙ্কে সারেঙ সাব যখন কাবু তখন আমার প্রিয় পুত্র অর্থাৎ আমারই বাবার বয়সী মানুষটির সঙ্গে যাবার কথা শুনে এক পায়ে খাড়া হয়ে গেছিলাম।
জাহাজ থেকে নামার সময় সারেঙ সাব বললেন, সাহেব ওকে কিন্তু ফেলে এস না।
নো নো। হি মাস্ট কাম ব্যাক। ডোন্ট বি ওরি।
মনে আছে আমায়, ডারবানে তখন হাড় কাঁপানো শীত। এত শীত যে আমরা দুজনই ওভারকোট পরে বের হয়েছিলাম।
বন্দর থেকে জেটি এলাকা পার হয়ে রাস্তায় পড়তেই ছিমছাম ঘরবাড়ি। পার্ক। দৈত্যের মতো সব নিগ্রো পুরুষ রমণী। কী পুরুষ, কী রমণী কারো মাথায় প্রায় চুল নেই বললেই হয়! মনে হয় টাক মাথা। কোঁকড়ানো চুল থাকলেও ঘন নয়, খুব পাতলা। ইতস্তত বিক্ষিপ্ত রোয়া ধান পোতার মতো কেউ যেন চুল টাকের যত্রতত্র পুঁতে রেখেছে। সৌখিন নিগ্রো মেয়েদের মাথায় সবারই প্রায় স্কার্ফ বাঁধা। শীতের জন্যও হতে পারে। আবার টাক আবৃত করার জন্যও হতে পারে।
এতকাল পর অবশ্য মনে করতে পারছি না, প্রথম দিনই কি না, না দু-পাঁচদিন পরে তিন নিগ্রো নারী ছিনতাইকারির হাতে পড়েছিলাম! মনে আছে ট্রলি বাস চেপে ইন্ডিয়ান মার্কেটের দিকে যাচ্ছিলাম। যাবার সময় দু-পাশের পার্কে দেখেছিলাম লেখা আছে, নাই ইউরোপিয়ান। এগুলো লেখা থাকে কেন পরে জেনেছিলাম। ভাষাটা যে ওলন্দাজ ভাষা তাও সেকেন্ড অফিসারই বলে দিয়েছিলেন। পার্কে, বাসে সর্বত্র এধরনের লেখা দেখে ঠিক করে নিতে হবে কার কোথায় জায়গা। কে কোন পার্কে ঢুকতে পারবে, কে ট্রলি বাসের নীচের বা উপরের তলায় উঠে যাবে।
বর্ণবৈষম্য কী প্রবল কদিন বন্দরে ঘুরেই টের পেয়েছিলাম।
সাঁজবেলায় আমরা বন্দরে ঢুকব বলে শটকাট করতে যাচ্ছি—এদিকটায় কিছু বস্তি অঞ্চল, কালো মানুষের বসবাস, নিজের সঙ্গে কিছুটা যেন আত্মীয়তাও অনুভব করছিলাম—কারণ এ দেশে আমি তাদের সমগোত্রীয় কাজেই আমার ভয় ডর কম ছিল।
সেকেন্ড অফিসার বললেন, এদিকটায় না ঢুকলেই হত। তার চেয়ে লিউস্ট্রিট ধরে চল যাই।
আমি ঠিক বুঝলাম না, কেন এ কথা তিনি বলছেন। কোনো উপদ্রবে পড়িনি। আর তখনই তিনজন নিগ্রো যুবতী। তিনজনই আমাদের চেয়ে উঁচু এবং লম্বা।
বিশাল এই তিন যুবতী আমাদের ওভারকোট ধরে বলেছিল, হাউ মুচ।
তার মানে হাউ মাচ। তার মানে কত দাম।
আমরা জানতাম, এইসব বন্দরে শহরে নাবিকরা পুরোনো কোট ওভারকোট কিংবা গরম জামাকাপড় বিক্রি করে টু পাইস কামায়। সেকেন্ড অফিসার এমন তিন যুবতীকে পেয়ে খুব খুশি। সে প্রায় দেখলাম মজেই যাচ্ছিল। দু-একটা ফাজিল কথাবার্তাও হয়ে গেল। আর ঠিক সে সময়ে দুই যুবতী আমাদের এমন আলিঙ্গনে আবদ্ধ করল যে আমরা বুরবকের মতো কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না সাঁঝবেলায় রাস্তার উপর—এটা তাদের কোনো আদব কায়দা কিনা অন্তরঙ্গ হবার তাও বুঝছিলাম, এই যখন অবস্থা তখন তৃতীয় যুবতী হাতের ওভারকোট দুটো টেনে নিয়ে অন্ধকারে উধাও হয়ে গেল। আর বাকি দুজনও সঙ্গে সঙ্গে দৌড়ে পালাল।
