তবে ডাঙা যে জাহাজিদের পরমায়ু বাড়ায় এটা প্রথম বুঝেছিলাম, কলম্বো বন্দরে নোঙর ফেলার পর রাতের বেলায় নোঙর ফেলল, ভোর রাতে নোঙর তুলে ফেলা হল। প্রায় দশদিন এক টানা জাহাজ থেকে ডাঙার জন্য পাগল হয়ে আছি। আমরা জাহাজিরা ডাঙা দেখার জন্য সারারাত জেগেছিলাম ডেকে। একমাত্র প্রাচীন নাবিকদের কাছে ডাঙা এবং জল যেন সমান। কিন্তু যারা পাঁচ সাত কিংবা দশ সফরের জাহাজি তাদের কাছেও ডাঙা পরমায়ু বাড়ায়। তা না হলে কে সারারাত জেগে ডেকের ওপর বসে থাকে। কলম্বো থেকে জাহাজে রসদ তোলা হয়েছিল।
জাহাজ নোঙর করা, নামার সযোগ থাকলেও নিষেধ–কারণ ভোররাতে জাহাজ ছেড়ে দেবে। শুধু বন্দরের দূরবর্তী আলো এবং কখনো কোথাও লোহার পাত পড়ার শব্দ অথবা জাহাজ ছেড়ে যাবার সময় সাইরেন ছাড়া আর যা শব্দমালা টের পেয়েছি—সে শুধু সমুদ্রের জল এবং তার কল কল আওয়াজ। কিংবা কিছু সমুদ্র পাখির উড়ে যাওয়া, কখনো তারা ডানা মেলে মাস্তুলে বসে থাকলে বাড়ির জন্য মন কী যে খারাপ করত!
বুয়েন্সএয়ার্স বন্দরে ঢোকার সময় এটা আরও বেশি টের পাচ্ছি। আফ্রিকার ডারবান কেপটাউন বন্দরে স্রেফ পাঁচ দিনের বিরতি।
সেখানে পাটের গাঁট নামানো হয়েছে। ডারবান বন্দরে জাহাজ ভিড়লে ইমানুল্লা এসে আমার ফোকসালে উঁকি দিয়ে বলেছিলেন, বনাৰ্জী ওপরে আয়। কথা আছে।
তিনি কখনো তার ঘরে কাউকে ঢুকতে দিতেন না। এমনকী আমাকেও না। কেন এটা করতেন বুঝতাম না। আমাকে ওপরে ডেকে নিয়ে আফটার পিকের পেছনে গেলেন। রেলিঙে ভর করে দাঁড়ালেন।
এমনই যেন সব দৃশ্য দেখতে পাই।
তিনি বেশ গুম হয়েছিলেন। কথা বলছিলেন না। আমি বললাম, কী হল? ডাকলেন কেন?
তুই আবার ছোটোটিন্ডালের সঙ্গে মিশছিস!
মিশলে কী হয়।
না।
বড়োটিন্ডাল যে তার সুনজরে নেই, সেটা যেমন বুঝেছিলাম কার্ডিফ বন্দরে গিয়ে, তেমনি ছোটোটিন্ডালও যে তার কোপে পড়ে গেছে, সেটা বুঝেছিলাম ডারবান বন্দরেই।
তা বলবেন তো কথা বলছেন না কেন! ধুস, বুড়োর যত্ত সব বাতিক। আমি নষ্ট হয়ে না যাই এই এক ভিমরতিতে তিনি ভুগছেন! এ-জন্য মাঝে মাঝেই ক্ষেপে যেতাম।
শোন, তিনি মুখে সুপারি ফেলে বললেন, জায়গাটা ভালো না। রাতে বের হস। ছোটোটিল্ডালের ঘর আছে, এখানটায়। ওর পাল্লায় পড়ে গোল্লায় যাস না।
ঠিক আছে যাব না।
না তোকে যেতে বারণ করছি না। বন্দরের কাছাকাছি থাকবি। ওদিকটায় মাছ ধরতে পারিস। আমার ছিপ নিয়ে যা, বসে না থেকে দু-চারটে সেকরল মাছ ধরে আনলে জাহাজে বেশ ভোজ লাগান যাবে।
আসলে বুঝি, তিনি আমাকে মাছের নেশায় ফেলে দিয়ে ডারবান বন্দরটা পার করে নিয়ে যেতে চান।
এটা আমার মনে আছে জাহাজের খাওয়া বড়ো একঘেয়ে ছিল।
সকালে চর্বি ভাজা রুটি।
দুপুরে ডাল গোস্ত ভাত।
বিকেলে চর্বি ভাজা রুটি।
রাতে আবার ডাল, আলুভাজা, গোস্ত।
এই ছিল নিত্যদিনের খাবার। বরফঘরের বাসি পচা মাংস—বিস্বাদ, কিন্তু এমন যমের খিদে পেত যে শুধু ডাল দিয়েই সব ভাত তোলা হয়ে যেত।
কাজেই জাহাজিরা বন্দর পেলে, মাছ শিকারেও যায়। যেমন ইমানুল্লা সাব জাহাজে ওঠার সময় দুটো আলাদা কাঠের পেটি তুলে এনেছিলেন। একটা পেটিতে জাল তৈরি করার সুতো, আর একটা পেটিতে কয়েক রকমের ছিপ। ছিপগুলো ছিল, মাছ ধরার জন্য এবং তিনি বন্দরে গেলেই ছিপ ফেলে জাহাজের আফটার পিকে বসে থাকতেন। কখনো ছোটো ছিপ। কোন বন্দরে, কী ছিপ ফেললে, কোন মাছ পাওয়া যায় তিনি তা এত জানতেন যে আমরা অবাক হয়ে যেতাম।
জাহাজে ওঠার পর প্রথম ডারবান বন্দরে টের পেলাম, তিনি আমাকে হুকুম করছেন, বনার্জী, যা বাটলারের কাছ থাইকা, লিস্টি মিলাইয়া জিনিসগুলি নিয়া আয়।
বাটলার হাসান খুবই সেয়ানা লোক সে জানে, ডেক সারেঙ আর এনজিন সারেঙকে হাতে রাখতে পারলে, জাহাজিদের রেশন মারতে পারবে। গোস্ত ওজনে চুরি করতে পারবে, চিনি, টোবাকো সব চুরি করা সম্ভব শুধু দুই সারেঙ হাতে থাকলে। এ-জন্য ইনামও দেয়, যেমন জাহাদের অফিসারদের রেশনেই শুধু ডিম আছে—ডিম নয় শুধু, এক এলাহি ব্যবস্থা খাদ্য তালিকার। ইংলিশ মেনু। সকালে ওরা ব্রেকফাস্ট করার পর প্রায়ই দেখতাম পকেটে আপেল নিয়ে বের হয়ে আসত ডেকে। কাজ করত আর আপেলে কামড় বসাত।
তাদের খাওয়া দাওয়ার বহর দেখলে আমাদের জিভে জল আসত। চিফ কুক, সেকেন্ড কুক আট দশ জন অফিসারের খাদ্য তালিকা মেনু মাফিক তৈরি করতে গলদঘর্ম। আর আমাদের ইঞ্জিন ভান্ডারি এক হাতে সব সামলায়।
মনে আছে অফিসারদের মধ্যে একজনও বাঙালি ছিলেন না। এমনকী ভারতীয়ও নয়। ব্যাংক লাইনের জাহাজ অফিসাররা হোম থেকে উঠতেন। পরে জেনেছিলাম, অধিকাংশই ওয়েলসের বাসিন্দা।
অফিসারদের হরেকরকমের খাদ্য তালিকার বহর এবং আমাদের একঘেয়ে খাবার নানা কারণে জাহাজিদের মনে ঈর্ষার উদ্রেক করত। সারেঙই পারতেন সব সামলাতে। এবং এজন্য সারেঙকে হাতে রাখার নৈতিক দায়িত্ব বাটলারের। দুই সারেঙ অফিসারদের মেনু থেকে ফল ডিম আলাদা করে পেতেন। এছাড়াও যখনকার যা।
সুতরাং ডারবান বন্দরে ইমানুল্লা সাব আমার হাতে যে লিস্টি ধরিয়ে দিয়ে বলেছিলেন, যা নিয়ে আর সেটা নিশ্চয়ই হরেক কিসিমের খাবার—যেমন কিসমিস লবঙ্গ জায়ফল। এগুলি কখনো যদি কোনো অনুষ্ঠানে হত, যেমন ইদের পরবে বিরিয়ানি করার জন্য পাওয়া যেত। আমার ধারণা ছিল, তেমনই কিছু। কিন্তু আশ্চর্য সারেঙ সাব ওসব দিয়ে একসঙ্গে আদা এবং চিনির গাদ মিশিয়ে জাফরান দিয়ে মাছের চাড় তৈরি করে বলেছিলেন, বসে যা। পাঙ্গাস মাছ গাঁথতে পারিস কি না দ্যাখ।
