তিনি আরও বলেছিলেন, তোর বয়সটা ভালো না।
আমি তাঁর পাশে বসে থাকতাম। জাহাজের নানাবিধ গল্প বলতেন। বলতেন তাঁরা চায় পুরুষের জাহাজি। তাঁরা বাধা দিলেন, সিটি লাইনের সারেঙ। তিনি নিজেও আমার বয়সে জাহাজে উঠে এসেছিলেন।
এবং তিনি যখন বুঝতে পারলেন, আমি নাছোরবান্দা তখন একদিন বলেই ফেললেন, ঠিক আছে, আমার জাহাজ আসছে, ওতে যাবি। বলে তিনি কিছুক্ষণ চুপচাপ আমার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকলেন!
তারপর কী ভেবে বলেছিলেন, জাহাজটা কয়লার জাহাজ। ধকল খুব। পারবি!
‘আমার তখন এক কথা, পারব।
‘ওয়াচে তিন টন কয়লা খায় কসবিটা।
ওয়াচ অর্থাৎ চার ঘণ্টায় তিন টন কয়লা যায়। কসবিটা কে বুঝতে অবশ্য কষ্ট হয়নি—আসলে জাহাজটাকেই তিনি কসবি হয়তো বলেছেন। কসবি কথাটা মন্দ কথা। এটাও বুঝেছিলাম। জাহাজটাকে তিনি কখনও ইলিশের বাচ্চা বলে গাল পাড়বেন। যেন জাহাজ না, একটা আস্ত শয়তানের বাচ্চা। এবং দুজন মাত্র সারেঙ আছেন, যারা এই শয়তানের বাচ্চার মেজাজ ঠান্ডা রাখতে পারে।
এমন একটা জাহাজে তিনি আমাকে নিতে অবশ্য শেষ পর্যন্ত রাজি হলেও, মুখে তার প্রায়ই দুশ্চিন্তার রেখা ফুটে উঠতে দেখতাম। জাহাজিদের ওপরওয়ালা বলতে সারেঙ। তার সুপারিশ থাকলে জাহাজ পেতে অসুবিধা হয় না। শিপিং অফিসে মাসখানেক যাতায়াত করেই তা টের পেয়েছিলাম।
যেদিন জাহাজ এল, তিনি ডেকে বললেন, ভেবে দ্যাখ, যাবি কি না! পরে দোষ দিতে পারবি না।
বললাম তো পারব। আমি নিজের ওপর কিছুতেই আস্থা হারাতে রাজি না।
তিনি আমাকে বলেছিলেন, লরঝরে জাহাজ। সারাদিন ঠায় খাটুনি। বন্দরে গেলেও রেহাই পাবি না। স্মোকবক্স পরিষ্কার করতে জান কয়লা হয়ে যাবে।
তাঁর ওপর মাঝে মাঝে তখন থেকেই আমি বিরক্ত। বড়ো বেশি ভাবনা! আমি তার কে, এমন মনে হত। এই যে তিনি বুয়েন্সএয়ার্স বন্দর ধরার আগে বললেন, যাবি। বের হবি। না বের হলে চলবে কেন! ডাঙায় নামলে জাহাজিদের আয়ু বাড়ে–হাড়ে হাড়ে এটা টের পেয়েছি জাহাজে থেকে। দিনের পর রাত, রাতের পর দিন, শুধু জল আর জল। নীল আকাশ। সমুদ্রে ঝড় থাকুক, সাইক্লোন থাকুক, ইঞ্জিন চালু রাখতেই হবে। চালু রাখতে না পারলেই মরণ। কয়লা টেনে ‘সুটে’ ফেললে ফায়ারম্যানদের কাজ শুরু। চকাচক বেলচায় কয়লা তুলে মারছে। ফার্নেসডোর খুলে দিলেই আগুনের হলকায় মুখ লাল। কয়লা মেরে, যাগ দিয়ে টেনে, কয়লা উলটেপালটে আঁচ ভোলা। এয়ারভালভ খুলে দিলে হাওয়ায় আগুন আরও তখন ঝলসে ওঠে। কেবল বেলচায় কয়লা হাকড়ানো—তিনটে বয়লার, তিনটে করে ফার্নেস বয়লারে কয়লা খাচ্ছেতো খাচ্ছেই। আর পোর্টসাইডের ক্রশ বাংকারে টানা চারঘণ্টা আমার কাজ। লম্ফ জ্বালিয়ে কোনো প্রাচীন গুহাবাসীর মতো অস্পষ্ট অন্ধকারে টানা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কয়লা ভরছি। হুইলের গাড়িতে, সুটে এনে ফেলছি। বয়লার থেকে ছাই টেনে ফেললে, জল দিয়ে নেভাচ্ছি— অ্যাসরিজেকটারে আবার ছাই তুলে স্টোকহোলড পরিষ্কার করে দিতে হচ্ছে। ওয়াচ শেষে বিধবস্ত।
সিঁড়ি ধরে যে বোট ডেকে উঠে যাব তার পর্যন্ত ক্ষমতা থাকত না।
এবং এভাবেই বুঝেছিলাম, ইমানুল্লা সারেঙ আমার ভালো চান। কয়লা টানতে টানতে বমি করছি হড়হড় করে খবর পেয়ে জাহাজের বাংকারে তিনি ছুটে এসেছেন, দাঁড়িয়ে থেকেছেন, কখনও নুনজল এগিয়ে দিয়েছেন—নুনজল খেলে সি-সিকনেস কমে, এটা জানি, কিন্তু তিনি অন্য কাউকে ডেকে দেননি। বলেননি, ঠিক আছে, তুই যা। এনামুলকে পাঠাচ্ছি।
কোল-বয় আমরা মাত্র সাতজন।
দুজন করে আমাদের ওয়াচ।
পোর্ট-সাইডের বাংকারে মনু অর্থাৎ মৈনুদ্দিন। আসলে সে আমার ওয়াচের জুরিদার।
চারঘণ্টার ওয়াচে যতই আমি বিপাকে পড়ি না কেন, সারেঙ সাব অবিচল।
তার এক কথা, সব জাহাজে কি আমি থাকব। অভ্যাস হোক। তিনি চাইতেন, জাহাজে যখন উঠেই পড়েছি, তখন জাহাজের ধকল আমাকে মেনে নিতেই হবে।
অবশ্য জানতাম না, কার পরামর্শে মনু এসে আমার বাংকারে ঢুকে বলত, আরে বনার্জী সুট যে খালি হয়ে গেছে।
আমি তখন হয়তো ক্লান্ত। অবসন্ন। লোহার বাংকারে বেলচা মাথায় দিয়ে শুয়ে আছি। নীল জামা প্যান্ট কয়লার ভুসো কালিতে মাখামাখি। মুখ ভুসো কালিতে কয়লা খাদের মজুরের মতো। কয়লা টানা ছাড়া জীবনে যেন আর কোনো কাজ নেই আমার। এ জন্য জন্মেছি, এ জন্য বড়ো হয়েছি—ভাবলে তখন বিপন্ন বোধ করতাম। মাঝে মাঝে নিজের ওপর আস্থা হারালেই বেলচা ছুঁড়ে মারতাম কয়লার ওপর। তারপর চিৎপাত হয়ে পড়ে থাকলেই মনু এসে কয়লা টেনে দিত আমার হয়ে।
আমার খারাপ লাগত। উঠতাম। বলতাম, তুই যা। তোর ‘সুট’ কে ভরবে!
সে বলত, পয়লা সফরে পারবি কেন! পেটে তোর বিদ্যার জাহাজ, একাজ তোকে দিয়ে হয়!
এটা ঠিক জাহাজিরা প্রায় সবাই নিরক্ষর। তারা দেশে খত পাঠাবার সময় লেখাপড়া জানা আদমির খুবই কদর দেয়। দু-একজন চিঠি লেখার মতো বিদ্যা পেটে নিয়ে উঠলে, জাহাজিদের কাছে সে মাস্টার। তার প্রতি আলাদা সম্মান। আমি এ-জন্য সবার কাছেই সমাদর পেয়ে থাকি। ডেক আর এনজিন জাহাজি মিলে ষাট পঁয়ষট্টি জন জাহাজে উঠে এসেছিলাম—অনেক মুখ হারিয়ে গেছে কিন্তু বড়োটিন্ডাল, ছোটোটিন্ডাল, সারেঙ সাব কিংবা আমাদের দেবনাথ, অমিয়, হীরেনের কথা এখনও মনে করতে পারি। মনু আমার জুরিদার—তার কথাও মাঝে মাঝে ভাবি। এতদিন পর কে কোথায় জানি না। কারও খোঁজও রাখি না।
