কেবল মাঝে মাঝে প্রশ্ন—ডাঙা কবে পাব।
ডাঙার কথা বললেই সারেঙ সাব মুখ গোমড়া করে থাকতেন। ভাঙা কী এত মধুর তিনি যেন বুঝতেই পারেন না। ডাঙা মানেতো জাহান্নামে যাওয়া। নেশা, নয় কার্নিভেলে ঘোড়া জুয়ার ঠেকে আটকে পড়া, আর রাতে পরি হুরির কজায়। তার চেয়ে যেন এই অনন্ত অসীম সমুদ্র তার কাছে খুবই পবিত্রতার কথা বলে। পাঁচ ওক্ত নামাজ তিনি সকাল আর সাঁজবেলায় সেরে নেন। সাইক্লোন থাকলে মেসরুমে মাদুর পেতে, না থাকলে ফল্কার উপর মাদুর বিছিয়ে তিনি যখন ছাড়ান, মাথায় কুরুশ কাঁটায় নকশা তোলা সাদা টুপি, পরনে লুঙ্গি, গায়ে সাদা পাঞ্জাবি এবং মুখে সাদা দাড়ি—যেন কোনও ফেরেস্তা। এই জাহাজ, এই সমুদ্র, এমনকী আরও গভীর নৈঃশব্দে ডুবে যাওয়া প্রাণীকুলের জন্য তাঁর মোনাজাত—আমাকে উদ্বুদ্ধ করে। ঈশ্বর প্রীতি হয়তো মানুষকে কোনো বড়ো জায়গায় নিয়ে যেতে পারে–কিন্তু আমি হঠকারি যুবক, না ভেবেচিন্তে জাহাজে উঠে পড়ায় তিনি খুশি না।
বুয়েন্সএয়ার্স বন্দরে জাহাজ ভেড়ার দিন তিনি আমাকে ডাকলেন। এত বেশি খবরদারি কখনও বিরক্তির কারণ হত। তিনি সোজা বলে দিলেন, জাহাজ ছেড়ে বেশি দূর যাবি না। হারিয়ে গেলে আমি কিছু জানি না।
হারাব কেন চাচা। আমাকে কী ভেবেছেন!
শোন কিছু ভাবিনি। তোর ভালোর জন্যই বলছি। কেউ তোর কথা বুঝবে না। একটা লোকও বাংলা-ইংরেজি কিছু বোঝে না!
তার মানে।
লোকগুলো ইংরেজি জানে না। হাতের ইশারায় কথা বলতে হবে। পারবি। তুইও বোবা, তারাও বোবা। ভাষা না জানলে এটা হতেই পারে।
দূর থেকেই মেঘমালা ভেসে ওঠে আকাশের গায়, বুঝি সামনেই বন্দর। প্রথমে দিগন্ত রেখায় এক টুকরো মেঘ ভেসে থাকে তারপর জাহাজ যত নিকটবর্তী হয় ধীরে মেঘ থেকে যেন বৃষ্টির ফোঁটা আলাদা হবার মতো—বোঝা যায় ঘরবাড়ি, বোঝা যায় জেটি, বোঝা যায়, জাহাজ নোঙর ফেলান আছে। প্রথমে মাস্তুল, পরে চিমনি, আরও পরে মানুষজন।
রাতের বেলাতে আলোর মালা পরে থাকে—ঢেউ ওঠে নামে, জাহাজে ওঠা-নামা করে—আমরা টুইনডেকে শুধু দাঁড়িয়ে থাকি। ওয়াচ না থাকলে, সারা সকাল, অথবা দুপুর এমনকী গভীর রাতেও উঠে যাই উপরে। সামনে ডাঙা। জাহাজিদের কাছে এর চেয়ে বড়ো সুখবর কিছু নেই।
সারাক্ষণ জাহাজের আফটার পিকে, খোলা ডেকে, নয় ফল্কার ওপর বসে থাকা, তাসের আড্ডা। কখনও, কেউ কেউ কোরান পাঠও করেন। যে যার মতো ডাঙার প্রত্যাশায় বসে থাকে।
আমারও মন আনচান করে।
জাহাজ বাঁধাছাঁদা হলে সারেঙ সাব বলেছিলেন, বসে থাকবি কেন। যা ঘুরে আয়। মন হালকা হবে।
আপনি যে বললেন, কথা বোঝে না কেউ।
বেশি দূরে যাস না। দেবনাথ বনার্জীকে নিয়ে যা। আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ডাঙায় পা রাখলে জাহাজিদের আয়ু বাড়ে।
ডাঙায় পা রাখলে জাহাজিদের আয়ু বারে এটা হাড়ে হাড়ে টের পেয়েছি। জাহাজ কলকাতা থেকে ছাড়ার পর কী যে ঝড়ঝঞ্ঝা, সমুদ্র উথাল-পাতাল, কলার খোলের মতো বে অফ বেঙ্গলে জাহাজের পিচিং-তারপর কী অমানুষিক কষ্ট, চারঘণ্টার ওয়াচ দিতে পাঁচ ঘণ্টা লেগে যায়, কাজ শেষ করতে পারি না—কয়লা টেনে ফেলছি ‘সুটে’, আর হড়হড় করে নেমে যাচ্ছি। জাহাজের দুলুনিতে মাথা তুলতে পারছি না। তবু ‘সুটের মুখের দিকে সতর্ক নজর। কারণ মুখ থেকে কয়লা নেমে গেলেই, স্ট্রোকহলভে হাইহাই হয়ে যায়। তিনটি বয়লার কেবল কয়লা গিলছে। স্টিম পড়ে যাচ্ছে। টন টন কয়লা পুড়িয়েও স্টিম ধরে রাখা যাচ্ছে না। ঝড়ের দরিয়ায়, আমার মতো পয়লা সফরের জাহাজির যে প্রাণান্ত হবে যেন এটা প্রথমে টের পেয়েছিলেন সারেঙ সাব।
কিছুতেই তিনি সঙ্গে নিতে রাজি না।
জাহাজ পাচ্ছিলাম না।
হাতে ‘সি ভি সি’ নিয়ে রোজ শিপিং অফিসে ‘মাস্তারে দাঁড়াচ্ছি। জাহাজ আসছে, ক্ল্যান লাইন, সিটি লাইন, বি আই কোম্পানির জাহাজ। জাহাজের সফর সেরে ফেরা জাহাজিরা নেমে যাচ্ছে। নতুন জাহাজি রিক্রুট হচ্ছে। আমিও সেই আশায় মাস্তারে দাঁড়াচ্ছি রোজ। আমার চোখ মুখ দেখছে। নলি’ দেখছে। সমুদ্র সফরের কোনো অভিজ্ঞতা নেই। শরীরে বামুনের রক্ত। কিংবা শরীর শক্ত কিংবা ঋভু নয়, যে জন্যই হোক, বুড়ো কাপ্তান কিংবা যুবা চিফ ইঞ্জিনিরার কারও আমাকে পছন্দ নয়—পারবে না, ভালো করে দাঁড়ি-গোঁফ ওঠেনি ছেলের, সে আর কতটা কাজ পারবে। বমি টমি করে অসুস্থ হয়ে পালাবার জন্য মরিয়া হয়ে উঠবে। এমনও ভাবতে পারে। যাই হোক রোজ মাস্তার দেওয়াই সার যখন, এবং মাসখানেক ধরে শিপিং অফিসে যাচ্ছি, বুড়ো মানুষটা লক্ষ করে থাকতে পারে।
তিনিই একদিন ক্যান্টিনে ডাকলেন, এই যে ব্যাডা রোজ আইসা লাভডা কি! পারবা না। জাহাজের মার মার কাট কাট সহ্য করতে পারবা না! দড়িয়ায় পানি সহ্য হইব না। কেডা তোমারে বুদ্ধি দিছে, জাহাজে যাইতে!
কী বলি, বুদ্ধিটা যে কারও নয়, বুদ্ধিটা যে আমারই এবং একজন উদ্বাস্তু পরিবার এ-দেশে এসে জলে পড়ে যাবার পর, আমিই যে একমাত্র বাবার সক্ষম পুত্র তার কাজ বসে থাকা নয়, যা হয় করে কিছু উপার্জন করা এ-সব একে একে তিনি জানতে পারলেন বলেছিলেন, করবি। জাহাজে গেলে না, পাক হয়ে যাবি। না-পাক অর্থ কী পরে বুঝেছিলাম। পাক কথার অর্থ পবিত্র, না-পাক মানে অপবিত্র।
