ঠিক আছে, মাথা গরম করবেন না। আমি বের হচ্ছি না। কি খুশি!
বাইর হইতে বারণ করছি। মন-মেজাজ বলে কথা! তা ঘুইরা ফিরা দেখবি। ফাঁইসা যাবি না।
জাহাজে দুর্ঘটনার শেষ থাকে না। ওই তো পাশের জেটিতে কে গ্যাংওয়ের সিঁড়ি থেকে পড়ে গিয়ে জলে ডুবে গেল। নেশা করে উঠতে গিয়ে পা হড়কে গেছে। আমাদের জাহাজ থেকে দুজন বেপাত্তা। আসলে জাহাজ বিলাতে এলেই অনেকে পালায়। আমি না আবার কিছু করে বসি।
এই বনার্জি শোন।
কাছে গেলে বললেন, বড়টিভাল তরে কু-পরামর্শ দেয়!
কুপরামর্শ অবশ্য দেয়। বড়োটিন্ডাল অবশ্য ভাবে এটা তার সৎ পরামর্শ। বড়টিল্ডালের সঙ্গে দেখা হলেই এক কথা, দেশে ফিরা করবাড়া কী। বার্সিগ্রামে আমার খালাত ভাই আছে, তার কাছে চইলা যাও। সে হিল্লা কইরা দিব। লেখাপড়া জানা পোলা তুমি, একবার যখন আইসা পড়ছ ফিরা যাওন ঠিক না। বার্সিগ্রাম যে আসলে ব্লিসিংহাম পরে জেনেছিলাম।
ড্রাই-ডকের সময় বড়োটিন্ডাল দু-দিনের ছুটি নিয়ে বার্সিগ্রামে তার মেমান বাড়িতে ঘুরে এসেছে। মেমান নিজেও এসেছিলেন। কী একটা রেস্তোরাঁর মালিক। বিবি সঙ্গে। মেমসাব। কন্যা সঙ্গে মেমসাব। টিল্ডাল সাব তাঁর বালিকা ভাইঝিটির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবার সময় বলেছিলেন, বামুনের বেটার দশা দ্যাখ। সে তো বাংলা বোঝে না। সে আমার দিকে শুধু তাকিয়েছিল—তার অপরূপ লাবণ্য, এবং কাল চুল, গভীর নীল চোখ কোনও মায়াবী দ্বীপের কথা মনে করিয়ে দেয়। সারা দিন সে আমাকে নিয়েই শহরে ঘুরেছে। কেনাকাটা করেছে। কখনই মনে হয়নি আমি একা। স্টেশনে তাকে তুলে দিতে গিয়ে মনটা এত খারাপ হয়ে গেছিল—কী বলব—যেন সে আমাকে ইশারায় থেকে যাবার আমন্ত্রণ জানিয়ে গেছে।
ওর কথা আমার মনে হয়।
সে পরেছিল সাদা রঙের ভয়েলের স্কার্ট। লালরঙের জ্যাকেট। উরু পর্যন্ত নাইলনের মোজায় পরম স্নিগ্ধতা বিরাজ করছিল। আশ্চর্য ঘ্রাণ শরীরে। বিদেশি পারফিউমের এমন মৃদু সৌরভ এর আগে কখনো টের পাইনি।
ট্রেনটা চলে যাবার পরও আমি স্টেশনে চুপচাপ বসেছিলাম। হঠাৎ আমার মা র দু-চোখ কোথা থেকে যেন উঁকি দিয়ে গেল। চারপাশে ভাই, বোনেরা দাঁড়িয়ে আছে। ডাকছে—দাদারে ফিরবি না। বসেই থাকবি।
সম্বিত ফিরে আসার সঙ্গে সঙ্গে একটা ঝাঁকুনি খেলাম। দেখি সারেঙ সাব পেছনে দাঁড়িয়ে।
বললেন, মন খারাপ!
না না।
ওঠ। চল। মন খারাপ করিস না। দেখবি দেখতে দেখতে দিন কাইটা যাইব।
সেই থেকে তিনি সতর্ক হয়ে গেলেন। বড়োটিন্ডালের সঙ্গে তাঁর অসাক্ষাতে কথা বললেই ক্ষেপে যান তিনি।
সম্ভবত আমি কার্ডিফে গেছিলাম জুন-জুলাইয়ে।
দু-পাঁচদিন বেশ রোদ, হালকা মেজাজ মানুষের—সুন্দর মনে হয়েছে মানুষের ঘরবাড়ি। ঘোরাঘুরিও মন্দ চলছিল না। তারপর টানা বিশ-বাইশ দিন সূর্যের মুখ দেখাই গেল না। প্যাঁচপ্যাচে বৃষ্টি। টিন্ডাল ডাকলেই টের পাই সারেঙ সাব একবার ঠিক উঁকি দিয়ে গেছেন।
টিল্ডাল বলেছিল, কি রে যাবি? তিন চার মাস পুলিশের চোখে ধুলা দিয়া থাকতে হইব। কইরা ব্যবস্থা খালাত ভাইসাব করে দিব কইছে।
যদি রোদ থাকত এবং ঝলমলে আকাশ কিংবা এত শীতের কামড় না থাকত হয়তো থেকে যেতাম। আর যখন জানতে পারলাম, সূর্যের মুখ দেখা সৌভাগ্যের সামিল, তখনই মনটা দমে গেল। চোখের উপরতো দেখছি শুধু সারাদিন ঝিরঝিরে বৃষ্টি। টানা বিশ-বাইশ দিন এমন দুঃসহ অভিজ্ঞতায় পর আর পালাবার ইচ্ছে হয়নি। বড়োটিন্ডালতো একদিন খোদ ভাইঝিকে নিয়ে ফের হাজির। জাহাজে মেয়ে উঠে এলে চাঞ্চল্য দেখা দেয়। কিন্তু বড়োটিন্ডাল গোমড়ামুখো মানুষ, বেয়াদপি একদম পছন্দ না। তাঁর ভাইঝি নাজিরা আমাদের সঙ্গে খেলল। গল্প করল, জানাল—যদি যেতে চাই, তার বাবা ব্যবস্থা করে দেবে। তার বাবার লেখা একটা চিঠিও সে আমাকে দিল। তখনই কেন যে শুনতে পাই, দাদারে বাড়ি ফিরবি না।
না আমার পালানো হয়নি।
আসলে মন্দ কপাল। ঘরমুখো মন, এই যে জাহাজে ভেসে পড়েছি শুধু একটি দুর্গত পরিবারকে রক্ষা করার জন্য। অন্তত আমার তখন এমন অবস্থা মুরুবিবর জোর নেই কলোনিতে থাকি, গরিব মানুষের ঘরে টিউশনি জোটে না, কোনোরকমে, আই এ পাস যুবক—অর্থাভাব, কিছু একটা করতে হয়।
কিছু একটা করতে হয় বলেই জাহাজে উঠে পড়। তার আগে হালিশহরে ট্রেনিং, ভদ্রা জাহাজে ট্রেনি, জাহাজে ওঠার ছাড়পত্র, সি ভি সি সংগ্রহ এতসব করার পর জাহাজ।
পাঁচ-সাত মাসও হয়নি। সেই কবে কলকাতা বন্দর থেকে জাহাজে উঠেছি। যেন কতকাল আগে, যেন কোনো পূর্বজন্মে ঘটনাটা ঘটেছে, এ জন্মে আমি নাবিক, এই অস্তিত্ব ছাড়া আর কিছু টের পাই না। আঠারো-উনিশ বছর বয়সের যুবক স্বপ্ন দেখতে ভালবাসে, সমুদ্রে ঘুরে বেড়াবে, এমন স্বপ্ন দেখতে ভালোই লাগত। জাহাজে উঠে টের পেলাম, বাড়ির কথা মনে হলেই মন খারাপ হয়ে যায়।
কলম্বো হয়ে ডারবান, কেপটাউন। মাস দুই লেগে গেছিল। এক নাগাড়ে মাসখানেক সমুদ্রে, শুধু জল আর জল-ইঞ্জিন রুম থেকে উঠে আসছি, ওয়াচ শেষ, বিধবস্ত। ঝড় সাইক্লোন, ডেকের ওপর কয়লা, জাহাজ দুলছে, তবু কয়লা টেনে নিয়ে যেতে হবে ইঞ্জিন রুমে। কখনো রক্ত বমি-নিস্তার নেই। জাহাজে মার মার কাট কাট লেগেই থাকত। সি-সিকনেস বড়োই কঠিন আপদ। সব সামলে সমুদ্রে ঘোড়সওয়ার আমি কখনই ভেঙে পড়ি না।
