এখন আর দিনক্ষণের হিসাব মাথায় নেই। শুধু কিছু ঘটনা, কিছু মুখ এই অপরাহ্ন বেলায় মনে পড়ে কিংবা কোনো দৃশ্য। বড়ো একঘেয়ে সমুদ্রযাত্রা। জাহাজে উঠে এটা আরও বেশি টের পেয়েছিলাম।
যেমন ড্রাই ডকের সময় ঘরে বসে গল্পগুজব, বিকেলে বেড়ানো—তখন তো জাহাজিদের হাতে কোনও কাজ থাকে না। খাও দাও ফুর্তি করো। আমার কপালে ফুর্তি বিষয়টা ছিল একটু অন্যরকমের। যে পারিবারিক পরিমণ্ডলে মানুষ তাতে শত হঠকারিতা সত্ত্বেও কোনো নারীর ঘরে রাত কাটানো দুঃস্বপ্নের শামিল।
অথচ ইচ্ছে করত। দুরারোগ্য ব্যাধির আতঙ্ক ছিল তীব্র। যে যার মতো বের হয়ে গেলে আমি কার্ডিফ-ক্যাসেলের পাশ দিয়ে হাঁটতাম। সারা বিকেল, কখনো সন্ধ্যা হয়ে যেত, কত উঁচু পাঁচিল পাথরের মনে হয় গ্রানাইট পাথরে তৈরি প্রাচীন কোনো পুরাতত্ত্ব আমাকে ধাওয়া করত। ফাঁক পেলেই পাঁচিলের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতাম। কোনো দোকানে ঢুকে টুকিটাকি জিনিস কিনতাম। কাউন্টারে কোনও যুবতী থাকলে তার সঙ্গে দু-দণ্ড কথা বলার জন্য বসে থাকতাম—কখন তার হাত খালি হবে। অপ্রয়োজনে ফলের দোকানে ঢুকে ফল কিনতাম-কারণ তরুণী আমারই বয়সী। সে বুঝত কি না জানি না, সে আমাকে দেখলেই হাই করে ডাকত।
একজন গরিব বামুনের ছেলের পক্ষে এটা ছিল বিপজ্জনক খেলা। তবু মনে হত যাই। বসি, তার ব্যস্ততা দেখি। কথা বলুক না বলুক, কাউন্টারে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকারও স্বভাব ছিল আমার। অগত্যা শেষ বেলায় কিছু কেনা কাটাসে ভারি যত্নের সঙ্গে দুটো আপেল দেবার সময় বলত, গুড-নাইট সেলর।
অথবা কোনো অপরাহ্ন বসে থাকতাম, বন্দরের লাগায়ো পাহাড়ি উপত্যকায়। বসে থাকলে, অনেক জাহাজ এবং দূরের নীল সমুদ্র চোখে ভেসে উঠত। নৌবাহিনীর জাহাজ দেখতে পেতাম, ঘোরাফেরা করছে। আর রংবেরঙের হাজার হাজার পাখির ওড়াউড়ি। কিচির মিচির শব্দ, কখনো রাত হয়ে যেত। সমুদ্রে চাঁদ উঠত। নক্ষত্ররা জেগে থাকত মাথায় উপরে। কখনো বেশ রাত হয়ে যেত ফিরতে। ইঞ্জিন সারেঙ ধমক দিতেন, ব্যাটারে কোনখানে গ্যাছিলা! এত রাইত হইল ফিরতে। মন্দ জায়গায় যাও নাইত!
আমি হাসতাম। পিতৃতুল্য তিনি। একদিন তো এনজিন-ভাণ্ডারির উপর খাপ্পা। বাঁধাকপিতে বিটের টুকরো ডুমো ডুমো করে কেন দিয়েছে। বনার্জি খাইব কী দিয়া! যাও মিঞা! ডাল আলুভাজা দিয়া খাইব! তুমি কি চাও পোলাডা না খাইয়া মরুক। তুমি খাইতে পারবা রোজ রোজ।
আমরা মাত্র পাঁচ-সাতজন হিন্দু জাহাজি। বিফ খাই না। সপ্তাহে দু-দিন মটন রেশনে থাকে। বাদবাকি দিনগুলি বিফ। আমার হিন্দু সতীর্থরা পাঁচ-সাত সফর দেওয়া নাবিক। তাদের আটকায় না। আমার আটকায় কারণ এটাই আমার প্রথম সমুদ্র সফর।
আসলে আমি কেন এত একা ছিলাম, এবং নির্জনতা পছন্দ করতাম এখন বুঝি। হইচই ধাতে একদম নেই। ভালো আড্ডা দিতে পারি না। সংকোচ, এই বুঝি ধরা পড়ে গেলাম। তবু মানুষের তো কিছু চাই। সমুদ্রে আমার দিনরাত ছিল একটাই ভাবনা, আবার দেশে কবে ফিরে যাব। ফিরতে পারব কিনা, এও ছিল ভয়। তাপ্পি মারা জাহাজে উঠেছি, দৈব দুর্বিপাক যেন হাঙরের মতো সবসময় ঘোরাফেরা করত। ক্রস বাংকারে কয়লা টানছি, এক চাকা হুইলের গাড়িতে কয়লা ভরছি, ধুলো ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন, শ্বাস নিতে কষ্ট-বারবার বোঁট-ডেকে উঠে বুক ভরে শ্বাস নিতাম। সমুদ্র দেখতাম—বড়ো নিস্তরঙ্গ। জাহাজ যাচ্ছে, জলকেটে প্রপেলার জাহাজের গতি তৈরি করছে। রেলিঙে ঝুঁকে দাঁড়াতে ভয় পেতাম। পড়ে গেলে প্রপেলার আমাকে ছিন্নভিন্ন করে দেবে। মাংসের টুকরো এবং রক্তের ঘ্রাণ পেয়ে গভীর সমুদ্র থেকে উঠে আসবে হাঙরের ঝাঁক। তাদের কোনোটার পেটে আমার হাত, আমার পা, কিংবা মুণ্ডু। আমি তাদের পেটের বাসিন্দা হয়ে গেছি এমনও মনে হত কখনও। রেলিঙে ভর করে দাঁড়াতে ভয় করত।
দেশে ফেরার পর বন্ধুদের একটাই প্রশ্ন, বন্দরে নারীসঙ্গ করেছি কি না।
আমি হাসতাম।
বলতো লাভ নেই। ইচ্ছে ছিল, পারিনি।
আর বললে, বিশ্বাসই বা করবে কেন। জাহাজে সফর করতে বের হয়ে কোনো নারী সংসর্গ হয়নি, এটা যেন বন্ধুদের বিশ্বাসের বাইরে। কী করে বলি, ইমানুল্লা বলে একজন মাথার ওপর ছিলেন জাহাজে। জাহাজে ফিরতে দেরি হলে গ্যাংওয়েতে পায়চারি করতেন। দুশ্চিন্তায় অস্থির হয়ে পড়তেন। আমি ফিরে এলে তার প্রশ্ন, কই গ্যাছিলি। এত রাত করলি!
আর বল না চাচা, সামোয়ার পিকনিক গার্ডেনে চুপচাপ বসেছিলাম। কী করে বোঝাই ডাঙা মানুষের কত প্রিয়। গাছপালা, পাখি এবং সুন্দরী বালিকার মুখ আমাকে টানে। জাহাজে ফিরতে ইচ্ছে হয় না। ফিরলেইতো রং বার্নিশের গন্ধ। চিফ কুকের গাফিলতিতে মাংসপোড়ার গন্ধ। আমার যে ওক উঠে আসে।
এমন কথায় তিনি কেন যে ক্ষেপে যেতেন বুঝি না। প্রায় তেড়ে মারতে আসার মতো!
কেন মরতে আইছিলা জাহাজে। কেডা কইছিল আইতে ভালো লাগব ক্যান! কার ভালো লাগে। তাই বইলা, এত রাতে ফিরবি। চিন্তা হয় না!
আচ্ছা চাচা অযথা রাগ করছ কেন বলত!
কই গেলি ক। আমি ছাড়ম না। জাহান্নামে যাইতে চাস। কণ্ঠ তুই। আমি কেবল ঘর-বার হইতাছি। রাস্তাঘাট ভালো না। তর বুদ্ধি সুদ্ধি কবে হইব। কিছু হইলে …
কী হবে!
কী হয় না জাহাজে! কত দেখলাম, ঘিলু চিবাইয়া খায়। রাস্তা খুঁইজা পায় না। পরি হুরির দেশ—মাথা ঠিক রাখন সোজা কথা! জাহাজ থাইকা যদি পালানোর চেষ্টা করস পুলিশ দিয়া ধইরা আনমু! আমার নাম ইমানুল্লা। আল্লার বান্দা। তারে ছাড়া কারে ডরাই ক!
