মনোমোহন মাথায় হাত দিয়ে বসে আছেন। তারপর কিছুটা মন শান্ত হলে ডাকলেন, ওগো শুনছ! ওঠো। আমার যে এবার সব যাবে। দ্যাখো কী কাণ্ড! কী করি এখন!
মা দেখলেন। টটনও দেখল। কারও মুখে রা নেই।
মা বললেন, যার ব্যাগ সে ঠিক নিতে আসবে। রেখে দাও। যার জিনিস তাকে ফেরত দেওয়াই ভালো। গরিবের কপালে সুখ সয় না।
বাবা বললেন, সেই ভালো।
টটনও বলল, সেই ভালো।
কিন্তু আতঙ্ক, আবার ব্যাগ নিতে এসে যদি পালায়। তখন তিনি যাবেন কোথায়! থানা পুলিশকে যমের মতো ভয় পান মনোমোহন। আর সেই রাতেই, রাত তখন
অনেক। দুজন তোক বাড়িতে হাজির। টর্চ জ্বেলে বলল, মনোমোহন!
মনোমোহন দরজা খুলে বাইরে বের হলেন না। চুপি দিয়ে বললেন, আপনাদের কিছু হারিয়েছে?
হারিয়েছে মানে! তোমার পুত্র ব্যাগ নিয়ে পালিয়ে এসেছে। দাও। কিছু খোয়া গেলে পরিবারের কেউ বেঁচে থাকবে না। খবর ফাঁস হলেও খুন!
মনোমোহন বললেন, আজ্ঞে না। আমরা কিছু ধরিনি। বলে ব্যাগটা তুলে হাতে দিতে গেলেই, ওরে বাবা রে বলে দৌড়।
কোথায় গেল! মনোমোহন, টটন, মটর হ্যারিকেন নিয়ে লোক দুজনকে খুঁজছে। যত তাড়াতাড়ি ব্যাগটিকে ধরিয়ে দেওয়া যায়। না, কোথাও পাওয়া গেল না। এখন এই ব্যাগ নিয়ে উপায়! কার কাছে যাবে। কাউকে বললেই দশ কান—নানা ঝামেলা। চুরির দায়ে জেল! কী দরকার, যার ব্যাগ তাকেই ফেরত দেওয়া ভালো। কিন্তু লোক দুজন বেপাত্তা। তিনি ডাকলেন, কোথায় গেলেন দাদারা? অগত্যা ফিরে আসতে হল। রাতে কারো ভালো ঘুম হল না।
সকালে শোনা গেল, সড়কের ধারে দুজন লোক মরে পড়ে আছে। গলার নলিতে কোনো জন্তুর কামড়।
বিপাকে পড়ে কুকুরের মালিকের খোঁজে বের হয়ে গেলেন মনোমোহন। কুকুরটা আসার পর থেকে বাড়িতে নানা উপদ্রব। পীতাম্বরই খবর দিলেন, আরে, এই বাচ্চাটা! এটার মা-টা তো লরি চাপা পড়ে মরেছে। রাস্তার কুকুর। বাচ্চাটা নিয়ে এধার-ওধার ঘুরত। বাচ্চাটাই চাপা পড়ত, তবে মার পরান বোঝোই! নিজে ঝাঁপিয়ে পড়ে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়েছে। কেন, কী হয়েছে?
না, কিছু না! তারপর মনোমোহন বললেন, আচ্ছা, ওর জন্য পিণ্ডদান করলে কেমন হয়!
‘কার? কুকুরের!’
পীতাম্বর শুনে অবাক। বললেন, কুকুরের আবার পিণ্ডদান কী?
তোর কি মাথাখারাপ?
তার পরদিন মনোনোহন আরও তাজ্জব। কুকুরের বাচ্চাটা বাড়িতে নেই। কোথাও নেই টটন সারাদিন ডেকে বেড়ায়, টুটু, তুই না বলে-কয়ে চলে গেলি! কোথায় গেলি?
কোনো সাড়া পাওয়া যায় না। সাড়া আর পায়নি।
টিউলিপ ফুল
কার্ডিফে আমরা বিশ-বাইশ দিন ছিলাম। নাকি তারও বেশি। এতকাল পর ঠিক মনেও করতে পারছি না। আমাদের জাহাজ তো কার্ডিফ বন্দরেই ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছিল। মাল খালাস করার জন্য জাহাজ ছিল ড্রাইভে আর আমরা পোর্টের কাছাকাছি লম্বা একটা টিনের চালায় উঠে গেছিলাম। তিন-চারদিন ছিলাম।
না! বোধহয় আরও বেশি।
স্মৃতি ধূসর হয়ে আসছে। ঠিক মনে করতে পারছি না। অস্বস্তি হচ্ছে ভেবে, ড্রাই ডক করাতে কতদিন সময় লাগার কথা। সাতদিন, দশদিন, না দু-দিনেই শেষ করা যায় কাজটা।
অবশ্য তিন দশক আগে একরকম, এখন অন্যরকম। আমি ছিলাম কয়লা জাহাজের নাবিক। জাহাজের তিনটে বয়লার হাইমাই করে সমুদ্রে রাক্ষসের মতো কয়লা গিলত। এখনতো শুনছি, কয়লায় আর জাহাজই চলে না। হয় মোটর ভেসেল, নয় ডিজেলে চলে।
আমাদের সময় মোটর ভেসেলে নাবিকের কাজ পাওয়াটা সৌভাগ্যের প্রতীক ছিল।
আর আমার তো ছেঁড়া কপাল। পড়বি তো পড়বি এমন জাহাজে, যার সব কিছু লরঝরে বোট-ডেকে উঠতে কতবার যে রেলিঙ খসে পড়েছে। ডেরিক ভেঙে পড়েছে। ইনজিন-রুম চিপিং করতে করতে হয়রান হয়ে গেছি। কখনও বালকেভে চিপিং করার সময় দেখি ফুটো। সমুদ্রের নীলজল দেখা যায়। দৌড়ে উঠে গেছি ইঞ্জিন রুম থেকে। সারেঙকে খবর দিয়েছি। তিনি ছুটে গেছেন মেজমিস্ত্রি লেসলির কেবিনে। মেজমিস্ত্রি তড়াক করে লাফিয়ে নেমে এসেছেন। অন্ধকারে টর্চ মেরে দেখে আবার দু-লাফে সিঁড়ি ডিঙিয়ে সোজা বড়োমিস্ত্রির কাছে। বড়োমিস্ত্রি কাপ্তানের ঘরে। কাপ্তান ইনজিন-রুমে নামছে, নাবিকেরা জড় হয়েছে টুইন-ডেকে। আতঙ্কে সবার মুখ কাল। কারণ ফুটো দিয়ে জল ঢুকে যেতেই পারে।
কশপ, ইনজিন-সারেঙ আর লেসলি তিনজনে মিলে কোনোরকমে জোড়াতালি দিয়ে বলে গেলেন নো চিপিং। সাদা খড়ি দিয়ে দাগ কেটে দিলেন। জাহাজ বন্দরে না ভেড়া পর্যন্ত চিপিং বন্ধ। চকখড়ির দাগ দেওয়া জাহাজটার দিকে যেতেও তখন ভয় করত। জং ধরে ভিতরে খেয়ে গেছে। বালকেভের প্লেট খুলে আবার লাগানো এবং আমার যতদূর মনে আছে ড্রাই ডকের সময়ই কাজটা সেরে ফেলা হয়েছিল।
দিনক্ষণের হিসাব দূরে থাকুক, রাস্তার নাম, বাড়ির নাম, ক্যাসেলের নাম কিছুই মনে নেই। মনে রাখার বাসনাও ছিল না। একজন অভাবী তরুণের কাছে জীবন তখন ছিল ভারি ক্ষুধার্ত।
সুতরাং কতদিন ছিলাম কার্ডিভ সঠিক বলতে পারব না। আমাদের ভাঙা জাহাজের দুর্গতি দেখলে আমার চোখেই জল চলে আসত। একবার তো পোর্ট মেলবোর্নে টানা তিন মাস। বড়ো বড়ো অক্সিজেন সিলিন্ডার, দিনরাত হাতুড়ির ঘা, খোলের প্লেট কেটে নতুন প্লেট বসানো, রিপিট মারা কত না হঠকারির তাণ্ডব চলত জাহাজটাতে। কেবল দেখতাম খুলে নেওয়া হচ্ছে, কেবল দেখতাম ঘেঁড়া কাথার ওপর সেলাই ফোঁড়াই হচ্ছে। ক্রম বাংকারে মেরামত, বয়লার-চক তুলে নতুন চক বসানো, হুড়মুড় করে কিনার থেকে মিস্ত্রিরা শকুনের মতো খাবলে খুবলে খাচ্ছে জাহাজটাকে। টানা তিনমাস, না আরও বেশি! না তাও মনে নেই।
