কিন্তু বাচ্চাটা তো টটনের কোলেই ছিল। কামড়াবে কি করে! বাচ্চা কুকুর কামড়াতেও জানে না। লোকটারই বা দোষ কী। তার কুকুর যদি হয়, সে বলতেই পারে, কুকুরটা আমার। আমার বাচ্চা কুকুরটাকে টটন চুরি করে এনেছে। টটন আনতেও পারে। মারের ভয়ে সে কখনো সত্যি কথা বলে না। কিন্তু নিজের চোখের ওপর দেখার পর টটনের গায়ে হাত ভোলা তো দূরে থাক, তোষামোদের বাড়াবাড়ি শুরু হয়ে গেল।
টটনের দিকে তাকিয়ে মনোমোহন বললেন, সত্যি বলছিস, জমিতে পেয়েছিস! বা রে, মিছে কথা বলি কখনো।
না, তুই মিছে কথা আর কবে বললি। ধর্মপুত্তুর, মুখে এসে গিয়েছিল, তবে বললেন না। কারণ কীসে কোন আপদ সৃষ্টি হবে, তা তিনি নিজেও জানেন না। খুবই বিনয়ের গলায় বললেন, বলছিলাম, যার কুকুর তাকে দিয়ে দেওয়াই ভালো।
মাও বললেন, আমি ভেবেছিলাম, পরপর যা হচ্ছে, তাতে কিন্তু কুকুরটাকে সুবিধের মনে হচ্ছে না।
টটনের এক কথা, কুকুরটা কি তোমাদের কামড়ায়, না রাতে ঘেউ-ঘেউ করে? তোমাদের ঘুমের কি ব্যাঘাত হয়, বলো!
না, তা অবশ্য করে না। তোর বুকের কাছে শুয়ে থাকতে পারলেই নিশ্চিন্তি। চোর-ছ্যাঁচোড়ের ভাবনা তার নেই। ডাকাডাকির বিষয়টা কুকুরটা জানেই না। কখনো তো দেখলাম না ঘেউ-করতে। কেবল লেজ নেড়ে এটা-ওটা শুকে বেড়ায়। খাবার পেলে লাফায়। তোকে দেখলেই লাফিয়ে কোলে উঠতে চায়।
তবে! টটনের এক কথা। যার কুকুর তাকে দিয়ে দিতে বলছ কেন? আমি জানিই না কার কুকুর! আর কে নেবে? যে আসে সেই তো পালায়। বলো দেবটা কাকে?
এরপর আর কী বলা যায়, মনোমোহন ভেবে পেলেন না। এবারে শীতের ফসল খুবই ভালো হয়েছে। মা লক্ষ্মী তাঁকে ঢেলে দিয়েছেন। এক কেজি, দেড় কেজি মুলোর ওজন। বাজারে দরও ভালো যাচ্ছে। মনোমোহন এত পয়সার মুখ কোনো শীতের মরসুমে দেখেননি। কুকুরটা আসায় তাঁর যেন ধনে-জনে লক্ষ্মীলাভ।
মানুষের হাতে পয়সা এলে যা হয়, খাওয়াপরার লোভ বাড়ে। মনোমোহনও সেই লোভে শহরে রওনা হবেন। ছেলেমেয়েদের জামা-প্যান্ট, পরিবারের একখানা
ভালো শাড়ি, নিজের দুটো লুঙ্গি, গেঞ্জি, একটা শার্ট কেনার জন্য শহরে যাবেন।
বাবা শহরে গেলে ভালো মিষ্টিও নিয়ে আসেন। টটন-মটর দুজনেই বাবাকে বাস রাস্তায় এগিয়ে দিতে গেল। মোড়ের বটগাছটার নীচে বাস লোকজন তুলে নেয়। বাবাকে তুলে দিয়ে ফিরে আসবে।
অবাক, কুকুরটা কিন্তু সেই থেকে কুঁই-কুঁই করছে কোলে। কেন করছে বুঝছে না। টটনের বুকে লেপটে থাকতে চাইছে না। টটন ছেড়ে দিল। ছেড়ে দিলেই বাড়িমুখো ছুটতে চাইছে। এত দূর থেকে পথ চিনে না-ও যেতে পারে। বাচ্চা কুকুর ছেড়ে দিতেও ভয়। কোথায় কোন কাঁপালিক, কিংবা ব্যাপারী ওঁত পেতে থাকবেন কে জানে! কুকুরটাকে জোরজার করেই যেন নিয়ে যাচ্ছে টটন-মটর।
আর বাসে ওঠার সময়ই মনে হল মনোমোহনের, তাঁর কোঁচা ধরে কে টানছে। তিনি পা-ঝাড়া দিলেন। বললেন, কে রে? কেউ তো নেই। কাছেই টটন-মর্টর দাঁড়িয়ে আছে। বাচ্চাটাও টটনের কোলে। কেবল কুঁই-কুই করছে। ছটফট করছে।
আবার পা ঝটকা দিলেন। তাঁর কাপড় ধরে কেউ টানছে। মনে হল, কোঁচা ধরে টানছে। ভারি তাজ্জব ব্যাপার তো! তিনি নেমে পড়লেন। মনে সন্দেহ। বাস কণ্ডাক্টর বললেন, ‘আরে উঠবেন তত উঠুন।’ কিন্তু উঠতে গেলেই কোঁচা ধরে কে যেন টানছে। যেন এবার কিছুতে পা কামড়ে ধরল। মনোমোহন নেমে গেলেন বাস থেকে। চারপাশে তাকালেন। কেউ নেই। কে তবে পায়ে এত জড়াজড়ি করছে।
বাসটা ছেড়ে দিল।
বিকেলে খবর পেলেন, বাসটা দুর্ঘটনায় পড়েছে। বাসসুদ্ধ লোক নয়ানজুলিতে। সকালেই খবরের কাগজে পড়লেন, বাস দুর্ঘটনায় পঁয়ত্রিশজনের মৃত্যু। ভাগ্যিস মনোমোহন বাসে যাননি। তিনি কুকুরটার দিকে তাকিয়ে রইলেন। মাকে ফিসফিস করে বাবা কী বললেন, টটন বুঝল না।
দুদিনও পার হয়নি। টটন জমিতে বাবার ভাত দিতে গেছে। সঙ্গে কুকুরের বাচ্চাটা।
ফেরার সময় ঝোপজঙ্গলে ঢুকে যাওয়া তার স্বভাব। এদিকটা খুবই শুনশান। বড়ো বড়ো সব গাছ আর জঙ্গলে ভরতি। শিশু গাছই বেশি। রাজরাজড়ার পতিত জায়গা। জঙ্গল খুব বাড়ছেই। তবে শীত শেষ হয়ে যাচ্ছে বলে, ঝোপজঙ্গলের পাতাও ঝরে গেছে। গরিব মানুষেরা কাঠকুটোর জোগাড়ে জঙ্গলে এবারে ঢুকে যাবে। সেও কতবার মরা ডাল, শুকনো ডালপাতা মাথায় করে বাড়ি নিয়ে গেছে। জঙ্গলটা ঘুরে দেখার একটা মোহ আছে। সেই মোহে পড়ে এমন একটা তাজ্জব কাণ্ড দেখবে সে আশাই করেনি। দুজন যণ্ডামার্কা লোক কী নিয়ে টানাহ্যাঁচড়া করছে। মারামারি করছে। একজন অন্যজনকে ছোরা দেখিয়ে ব্যাগ কেড়ে নিতে চাইছে। ধুন্ধুমার কাণ্ড। জঙ্গলের মধ্যে অকারণ ব্যাগ নিয়ে মারামারি তার পছন্দ না। আর দেখল, তখনই লম্বামতো লোকটা বেঁটে মতো লোকটাকে মাটিতে ফেলে গলা টিপে ধরেছে। ব্যাগটা পড়ে আছে একপাশে।
সে বুঝল, তাকে দেখতে পেলে রক্ষে নেই। সে দৌড়ে পালাল। কুকুরের বাচ্চাটাও তার পিছু ধরেছে। সড়কে উঠে বেমালুম তাজ্জব বনে গেছে। কাউকে কিছু বলারও সাহস নেই, বাড়িতে নালিশ হবে এবং বাবা ধরে পেটাবেন। ‘আবার জঙ্গলে ঘোরাঘুরি! বলেছি না, জায়গাটা ভালো না।’
সে বাড়ি এসেও চুপ। সে জঙ্গলে ঢুকলেই মা খাপ্পা হয়ে যান।
কিন্তু পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনোমোহনের মাথায় হাত। বারান্দায় ব্যাগ। কার ব্যাগ, কী আছে, চেঁচাতেও পারছেন না। কার মুণ্ডু কেটে ব্যাগে ভরে রেখে গেছে তাও জানেন না। যা দিনকাল, খুনখারাপি জলভাত। কোনোরকমে ব্যাগের মুখ খুলে উঁকি দিতেই মাথার ঘিলু হজম। তাঁর চোখ ছানাবড়া। জড়োয়া গয়নায় ভরতি ব্যাগ। দামি পাথরটাথরও আছে।
