কে যে কামড়াল! কুকুরের কামড়ের মতো। অবশ্য এ-নিয়ে ভাবে না। কোথাও ছিল, ঝোপজঙ্গলে পালিয়ে গেছে। তবে বাচ্চা কুকুরটা নয়। কারণ এটা তো ধানের জমিতে ছিটকে পড়েছে। বললে, তরাস লেগে যাবে। মা বলবেন, আরে বলছিস কী! কই দেখি আয় তো। চেঁচামেচি শুরু করে দেবেন।
ছোটোভাই মটর বলল, দাদা, কী সুন্দর না দেখতে। কুকুরটার নামও সে দিয়ে দিল। টুটু।
মটরের মাথা সাফ। বাবা তার স্কুলের পড়া গজব করেননি। টটন এজন্য রাগ পুষে রাখেনি। তার যখন হবে না, আর তার তো বই দেখলেই রাগ ধরে যায়— এত খোলামেলা বাড়ি, গাছপালা, গোরু-বাছুর, জমিতে ফুলকফি-বাঁধাকপির চাষ, এক হাতে বাবা সামলাতেও পারেন না। সে বাবার কাজে লেগে গিয়ে ভালোই করেছে। সংসারের সাশ্রয়। তার নাম টটন, কুকুরের বাচ্চাটার নাম টুটু। টটনের কুকুর টুটু।
বাচ্চাটাকে বাংলা সাবান দিয়ে স্নান করাবার সময় দেখল একটা পায়ে বেশ বড়ো ক্ষত। মাকে দেখাল। মা চুন-হলুদ গরম করে লাগিয়ে দিতেই কুকুরটির আরাম বোধ হচ্ছে টের পেল টটন।
পরদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই মনোমোহন দেখতে পেলেন, একজন কাঁপালিক গোছের লোক, গাছের নীচে বসে আছেন।
মনোমোহন উঠোনে দাঁড়িয়ে সবে সূর্যপ্রণাম করছেন।
আমার কুকুরটা?
মনোমোহন তাকালেন। কাঁপালিক মানুষকে সবাই ভয় পায়, সে কাছে গিয়ে বলল, ‘কিছু বলছেন ঠাকুর?’
আমার কুকুরটা?
কুকুরের কথা শুনে সবাই উঠোন পার হয়ে গাছতলায়।
মটর বলল, এখানে কোনো কুকুর নেই।
আছে। একটা বাচ্চা কুকুর। কালো রং। এক পা খোঁড়া। আরে টুটুর কথা বলছেন? সে দৌড়ে ঘরে ঢুকে বলল, দাদা, টুটুকে নিতে এসেছে।
কে? টুটুকে কে আবার নিতে এল!
টুটু কিছুতেই কোল থেকে নামবে না। মা চেঁচাচ্ছেন, দিয়ে দে বাবা? কার মনে কী আছে কে জানে।
মা ঠাকুর-দেবতাকে ভয় পান, সাধুসন্তের ভয়ে কাবু থাকেন। টটন জানে, যার কুকুর তাকে দেওয়াই ভালো। কি না আবার অনাসৃষ্টি শুরু হবে। সে কুকুরটাকে নামিয়ে দিলেই কুঁই-কুঁই করতে লাগল। যাবে না। কাঁপালিক গোছের লোকটি যেই না টুটুকে খপ করে ধরতে গেলেন, কী হল কে জানে, ওরে বাবা এ তো আগুন রে বাবা। লোকটা ধপাস করে পড়ে গেলেন, না কিছু দেখে ঘাবড়ে গেলেন, বুঝল না। লোকটা চিমটে, ত্রিশূল থলে নিয়ে দৌড়োতে লাগলেন। যেন কেউ ঠেলে ফেলে দিয়েছিল তাঁকে।
সবাই তাজ্জব।
বাবা বললেন, কী হল, পড়িমরি করে ছুটে পালাল কেন? যেন কেউ ঠেলে দিল লোকটাকে। কোনোরকমে প্রাণে বেঁচে গেছে।
টটন বলল না, তারও মনে হয়েছে। পায়ে কীসে কামড়ে দিয়েছিল। তবে দাঁত ফোঁটায়নি। তাই রক্ষে।
টটন বলল, লোকটা মিছে কথা বলছে বাবা। কুকুরটাকে আমি তো নীলপুকুরের পাড়ে পেয়েছি।
সে যা হোক, কুকুর নিয়ে আর কেউ পরে কথা চালাচালি করেনি। জবরদস্ত কাঁপালিক কোন সুবাদে বাড়িতে হাজির, কী করেই বা জানলেন, টুটু মনোমোহনের বাড়ি গিয়ে উঠেছে তাও তারা বুঝল না। তবে কুকুরটার মধ্যে কিছু একটা আছে। মা তো একেবারে চুপ। বাবা বললেন, দ্যাখ, যেন পালিয়ে না যায়। কী আবার বিপদে পড়ব বুঝতে পারছি না।
টুটুকে নিয়ে শীতকালটা মজারই ছিল। ভালো খেতে পেয়ে নাদুসনুদুস, গড়িয়ে গড়িয়ে হাঁটে। সর্বক্ষণ টটনের সঙ্গে। সে জমিতে গেলে টুটু জমিতে, সে ঝোপজঙ্গলে ঘুরে বেড়ালে, সঙ্গে টুটু। সে যা পায় সবই দুজনে ভাগ করে খায়।
একদিন এক ছাগলের ব্যাপারী বাড়ি হাজির। সেও বলল, তার কুকুর হারিয়েছে। এই বাড়িতেই আছে।
বাবা রেগে গিয়ে বললেন, ‘কুকুর হারালেই আমার বাড়ি! এ তো আচ্ছা ঝামেলা।’ সোজা জবাব, না, এখানে কুকুরটুকুর নেই।
আছে। আপনি জানেন না। মিছে কথা বলছেন।
আরে, মিছে কথা বলব কেন! বলছি কারো কুকুর আমার বাড়ি আসেনি। আমাদের কুকুর ছাড়া অন্য কোনো কুকুর আমাদের বাড়িতে নেই।
ওটাই আমার। দেখান। বলে পাঁচখানা বগল থেকে নিয়ে হাতের ওপর ঘোরাতে থাকল।
টটন কোথা থেকে এসে শুনেই খাপ্পা। সে টুটুকে বগলে তুলে গাছতলায় দৌড়। ব্যাপারীকে বলল, এটা?
হ্যাঁ, এটা। এটাই আমার কুকুরের বাচ্চা! আর যায় কোথায়। পাঁচনটাচন ফেলে লোকটা চিত হয়ে পড়ে গেল। আর্ত ডাক, বাঁচান কর্তা। আমারে খেয়ে ফেলল। যেন লোকটাকে কেউ আক্রমণ করছে। পা ছুঁড়ছে, হাত ছুঁড়ছে-গড়াগড়ি খাচ্ছে। এক হাতে কাপড় সামলাচ্ছে, অন্য হাতে পাঁচন দিয়ে আক্রমণ—যেন সামাল দেওয়ার চেষ্টা করছে।
টটন, তার বাবা, মা এমনকী, দু-একজন প্রতিবেশীও হাজির। আর দেখল, লোকটা প্রাণভয়ে দৌড়োচ্ছ। বলছে, ওরে বাবা রে, আমাকে কামড়ে দিল রে!
টটন, বাবা, প্রতিবেশীরা অবাক। লোকটার পা থেকে রক্ত চুইয়ে পড়ছে।
মনোমোহনের মাথা ঘুরছে।
কুকুরের বাচ্চাটার দিকে মনোমোহন তাকালেন। ওটা তো টটনের কোলেই আছে। কেমন ত্রাসে পড়ে গেলেন। বাচ্চাটাকে রাখা উচিত-অনুচিতের কথাও ভাবছেন। কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস নেই।
মনোমোহনের ছেলেকে প্রশ্ন না করে পারলেন না, নীলপুকুরের কাছে কোথায় পেলি?
জমিতে। ওই সেখানে করদের জমিতে। পাশটায় হোগলা বন আছে, বন থেকে বের হয়ে এল।
মনোমোহন জানেন, নীলপুকুরের বেলগাছটা ভালো না। দোষ পেয়েছে। ওঁর ধারণা ছিল যদি বেলগাছটার নীচে কুকুরের বাচ্চাটাকে পায়, তবে গাছের দোষ কুকুরেও বর্তাতে পারে। রাতেবিরেতে কেউ বড়ো গাছটার নীচ দিয়ে আসে না। গাছটায় নীরদা গলায় ফাঁস দিয়েছিল। কিন্তু জমিতে পাওয়া গেলে গাছের দোষ দেওয়া যায় না! খুব বেশি বলাও মুশকিল। কে আবার অদৃশ্যলোক থেকে তাকেই আক্রমণ করবে। কিংবা কামড়াবে। ব্যাপারী তো ছুটেই পালাল, সবাই দেখেছে গোড়ালি থেকে, হাঁটুর নীচ থেকে চুইয়ে রক্ত পড়ছে। কুকুরে কামড়ালেই এমনটা হওয়ার কথা।
