বাড়ি ফিরে এলে দিদার এক কথা, ঠিকমতো ডাকবাক্সের ভিতর ফেলেছিস ততা। ঠিকমতোই তো ফেললাম। ঠিকমতোই যাবে। এক গ্লাস জল দাও। খুব তেষ্টা। মিছে কথা বললে কী জলতেষ্টা পায়। তার এত তেষ্টা কেন!
দিদা যত্ন করে এক গ্লাস জল দিল। সে জলটা খেতে গিয়ে বিষম গেল। সারা ঘর জলময় হয়ে গেল। সে শুধু কাশছে। এত প্রবল কাশি যে মুখ ফুটে আর একটা কথা বলতে পারল না। সরল সাদাসিধে এই বৃদ্ধাকে মিছে কথা বলতে গেলে এত কষ্ট হয়, আগে জানত না। আজই সে তা টের পেল। তার চোখ ফেটে জল আসছে। কী নিশ্চিন্ত মুখ। প্রশান্ত চাউনি দিদার। সে সহ্য করতে না পেরে উঠোনো বের হয়ে গেল। মাথার ওপর আকাশ। না হলে দিদার কাছে ঠিক ধরা পড়ে যাবে।
টটনের কুকুর
টটনের বাবা খুব গরিব। কিছু জমিজমা, পুকুর ছাড়া টটনের বাবা মনমোহন বলতে গেলে ফকির। টটনের ভাইবোন মেলা। মা-ঠাকুমা তো আছেনই। জমিজমায় চলে না। প্রথমে কোপটা পড়ল উটনের ওপর। ওর লেখাপড়া বন্ধ। জমির কাজে লেগে গেলে সংসারে দু-পয়সা আসে। গোরু-বাছুর সামলালে মনোমোহনের কাজ হালকা।
টটনের বাবা গরিব বলে, তাকে সবাই ফকিরের ব্যাটা’ বলে। গাঁয়ে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে গেলেও ফকিরের ব্যাটা। অবশ্য টটনের দোষও আছে। যে কেউ ভালোমন্দ খেলে তার খেতে ইচ্ছে হয়। সে হাত পাতে। টটনকে দেখলেই তারা খাবার লুকিয়ে ফেলে।
টটন টের পায়।
এই যেমন নব, ওর বাবার চায়ের দোকান। দোকানে নবও মাঝে-মাঝে বসে। বসলেই লজেন্স-বিস্কুট সরায়। পালিয়ে খেতে দেখলেই টটন ছুটে যাবে, কী খাচ্ছিস রে? তাড়াতাড়ি পকেটে যাই থাকুক লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করে নব।
কিন্তু টটন ছাড়বার পাত্র নয়।
তখন নব বলবে, আন, এক বালতি জল।
সে জল নিয়ে আসে এক বালতি।
তারপর বলবে, কাপ-প্লেটগুলো ধুয়ে রাখ।
টটন খুশিমনেই কাপ-প্লেট ধুয়ে দিলে হয়তো দুটো লজেন্স দিয়ে বলবে, ভাগ ফকিরের
ব্যাটা!
এতে সে কিছু মনে করে না। তার বাবা ফকির, গরিব আর ফকিরের তফাতই বা কি? তা ফকিরের ব্যাটা বললে সে খুশিই হয়।
খুশিতে সে আরও দু-একটা ফাউ কাজ করে ফেলে।
পাড়াপ্রতিবেশীরাও টটনকে দেখলে ফাউ কাজ করিয়ে নেওয়ার তালে থাকে।
গাছ থেকে আম পাড়।
সে আম পেড়ে দেয়।
একটা আম হাতে দিলেই খুশি।
সাইকেলটা সাফ কর। কাদা মুছে ফেল।
টটন সাইকেল ন্যাকড়া দিয়ে ঝকঝকে করে ফেললে—দশটা পয়সা। হাত পেতে নেবে আর দেখবে। কোথায় যে রাখবে! জামা নেই গায়ে। প্যান্টের পকেট ছেঁড়া। যা রাখে সবই পড়ে যায়। সেই টটন একদিন জমিতে বাপকে ভাত দিয়ে ফেরার সময় এক কাণ্ড। কোথা থেকে একটা কুকুরের বাচ্চা ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে বাবুর অনুসরণ করছে।
সে রেগে যায়। সে গাল দেয়, ফকিরের ব্যাটা আমার লগ ধরলি! যা। আমার পকেটে কিছু নেই।
টটনের ধারণা, কুকুরের বাচ্চাটা সেয়ানা। খাবারের লোভে তার লগ ধরেছে। পকেটে যে কিছু নেই, তাও নয়। লেড়ো বিস্কুটটি সে পেয়েছে পীতাম্বরের দোকান। থেকে। একটা বিস্কুট দিয়ে তাকে মেলা ফাউ কাজ করিয়ে নিয়েছে। এতে সেও খুশি, পীতাম্বরও খুশি। তার সেলাই-কলের দোকান। ঘর ঝাঁট দেওয়া থেকে খাবার জল কল থেকে তুলে দিয়ে এসেছে।
বাচ্চা কুকুরটা ঠিক টের পেয়েছে। সে যেমন টের পায় তাকে লুকিয়ে কে কখন কী খায়। সে তো মাত্র একবার লেড়ো বিস্কুটের খানিকটা ভেঙে নিয়েছে, তারই ভেতর নজর পড়ে গেল! ভাইবোনেরা পর্যন্ত টের পায় না। পেলেই হেঁকে ধরে। আর তুই কোথাকার ফকিরের ব্যাটা টের পেয়ে গেলি! ধাঁই করে একটা লাথি কষাল। কুকুরটা ফুটবলের মতো কিছুটা উড়ে গিয়ে পড়ে গেল। কুঁই-কুঁই করছে। সঙ্গে সঙ্গে টটনের মনে হল, পা-টা কে যেন খামচে ধরেছে! পা-টা সরিয়ে নিল। টটন বেশ ঘাবড়ে গেছে।
সে হাঁটা দিল। আমবাগানের ভেতর থেকে দেখল, কুকুরটার লজ্জা নেই। আবার পায়ে-পায়ে ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে হাঁটছে। তার পিছু নিয়েছে। আর পারা যায়। বিস্কটের খানিকটা ভেঙে দিয়ে বলল, নে। খবরদার আর পা বাড়াৰি না। নুয়ে সে পা দেখল। পায়ে দুটো দাঁত ফোঁটাবার দাগ। কীসের দাগ, বুঝল না। কে শোনে কার কথা! কুকুরটা ল্যাংচাতে-ল্যাংচাতে ফের তার পিছু পিছু আসছে। যত দেয়, তত কুকুরটা ল্যাংচায়। আর কুঁই-কুঁই করে। উটনের মহা মুশকিল। বাড়ি গিয়ে উঠলে মায়ের তেজ, নিজের খেতে ঠাঁই নেই শঙ্করাকে ডাকে!
মায়ের দোষ নেই। বাবা না আনতে পারলে দেবেন কোত্থেকে। তবে একবার বোঝাতে পারলে, তার মায়ের মতো মা হয় না। যদি বুঝে যান—তখন মা নিজেই ডাক খোঁজ করবেন। আরে নিজে খেলি, কুকুরটাকে দিলি না। ভগবানের দান, যাবে কোথায়?
তা কুকুরটাকে দেখে মাও কেমন খুশি। বাবা জমি থেকে ফিরে বললেন, কুকুরটার ঠ্যাং ভাঙল কে? ল্যাংচাচ্ছে। তোমার ছেলের কাজ নয় তো!
টটন রাস্তায় দাঁড়িয়ে সব শুনতেই দৌড়ে গেল। বাবার মেজাজও কুকুরটিকে দেখে অপ্রসন্ন নয়। বাবা-মা খুশি থাকলে সেও খোশমেজাজে থাকে। সে বলল, কী পাজি এটা, মাঠ থেকে লগ ধরেছে। কিছুতেই যাবে না। আমার সঙ্গে বাড়ি উঠে এল। লাথি মারলাম। তাও না। অবশ্য লাথি মারার সময় কে যেন খামচে দিয়েছিল। সে-কথা বলল না।
খামচে দিয়েছিল, না কামড়ে দিয়েছিল—সে তা ঠিক মনে করতে পারছে না। তবে গোড়ালির জায়গাটা লালায় ভেজা মনে হয়েছিল। দাঁতের কামড়ও। তবে শুধু দাগ। কামড় জোরে বসায়নি রক্ষে।
