ঝুমি আর পারে!
সে লেপ কাঁথা সরিয়ে কথা এড়িয়ে উঠে গেল। কলপাড়ে গিয়ে হাতমুখ ধুল। যাপার গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় নেমে বলল, দিদা তুমি কী আরম্ভ করলে সকালে উঠে বলত।
কী আবার আরম্ভ করলাম।
এমন মুখে তাকিয়ে থাকলেন বিরজা সুন্দরী যে ঝুমি কী বলবে আর ভেবে পেল না। চোখে এক অপার্থিব শূন্যতা—যা দেখলে বড় কষ্ট হয় তার। কতদিন থেকে সে যেন সত্যি দিদার গলার কাঁটা হয়ে আছে। এত উচাটনে থাকে যে, মাঝে মাঝে মনে হয়, বুড়ির না শেষে মাথা খারাপ হয়ে যায়। হয়ে যে যায়নি তাই বা কে বলবে—তা না হলে বড়ো মামাকে চিঠি লিখবে ভাবতে পারে! কে না কে— তার স্বভাব চরিত্র কেমন, সেখানে গিয়ে ফের পাগলামি শুরু হতে পারে। মামি পছন্দ করবেন কেন! কোনও অপরিচিত লোককে, কেউ বাড়িতে রেখে জামাই আদরে খাওয়াবে দিদাই ভাবতে পারে।
তা দিদার কথা ভেবে হাসিও পাচ্ছিল, আবার কেন যে কান্না পাচ্ছে।
সে আখায় খড়কুটো জ্বেলে চা করে দিল দিদাকে। চা খেয়ে দিদার মাথা ঠান্ডা হয়। ঠান্ডায় কুঁকড়ে আছে। আগুনের পাড়ে বসে বিরজা সুন্দরী তার স্বপ্নের কথা শুরু করে দিল।
তোর দাদু, বুঝলি, তোর দাদুর বাবা, মানে আমার শ্বশুর, আমাকে কোথায় দেখেছিলেন জানিস?
কোথায়!
আমাদের এক শিষ্য বাড়ি। দেখেই পছন্দ। বাবা আমার সেকেলে মানুষ, শিষ্য বাড়িতে দেখলে তো হবে না। বাড়ি গিয়ে দেখতে হবে। শ্বশুরমশাই তাতেও রাজি। কোনও বরপণ দিতে পারবেন না, তাতেও রাজি। আমার গরিব বাবার কন্যাদায়, কী বুঝে যে তোর দাদুর বাবা বলে ফেললেন, দেখুন বেয়াইমশাই, কন্যাটি আমাদের রত্ন—যদি দোষ না ধরেন বলি, তুলে নিয়ে না হয় স্বগ্রামে নিয়ে যাব। সেখানেই বিয়ে হবে। ব্যাণ্ড পার্টি বাজিয়ে একটা মিছিল বুঝলি, পালকিতে আমি আর আমার ছোটো বোন সরণি। অচেনা জায়গা, অদেখা মানুষ তারাই তো শেষে নিজের হয়ে গেল! তুই এত ঘাবড়ে যাস কেন বল তো, খোকাকে বুঝিয়ে বললে, ও বুঝবে না মনে করিস।
আমি কিছু জানি না।
এটা তোর রাগের কথা ঝুমি। ইস চায়ে মিষ্টি দিসনি! মাথা দেখছি তোরও ঠিক নেই।
তোমার পাল্লায় পড়লে কারও মাথা ঠিক থাকে! তুমি কৃপাদাকে নিয়ে চলে গেলে। বড়োমাসি বলেছে না, ও একটা ঠক জোচ্চোর—ঘটকালি করে খায়, ওর পাল্লায় পড়বে না।
আরে নিজ চোখে বাড়িঘর দেখে এলাম, মিছা কথা হবে কেন।
সে যা ভালো বোঝ করো।
তুই তবে চলে যা। কল থেকে দু-বালতি জল তুলে রেখে যাস। সাইকেলে চলে যাবি। এক ক্রোশ রাস্তা কতক্ষণ লাগে বল। তোর ঠেটা স্বভাব, যেখানে যাবি উঠতে চাস না। আসার সময় বাজার হয়ে আসিস। ভালো মাছটাছ পেলে আনবি। কৃপানাথকে খেতে বলেছি। গরিব মানুষ, এক ডাকে সাড়া দেয়। আমার আর কে আছে বল! সত্যি দিদার কেউ নেই। শেষে সেই পালকি সুন্দরী আজকের বিরজা সুন্দরী। সবাই উড়ে চলে গেছে। খোঁজখবরও বড়ো একটা কেউ রাখে না। দুই মামা, পাশেই বাড়ি করে আলাদা থাকে, তাদের যে দিদা পেটে ধরেছে এখন দেখলে, তাও মনে হয় না। তাকেও উড়িয়ে দেবার মতলবে কত ফন্দি মাথায় নিয়ে যে ঘুরছে।
বড়োই কাতর অনুরোধ। যা দুটো রুটি করে দিচ্ছি, খেয়ে চলে যা। আমার কী কষ্ট আর কেউ বোঝে।
ঝুমি এখানটাতেই বড়ো দুর্বল বোধ করে। কিন্তু তার তো ইচ্ছে হয় না যেতে। কোনো মেয়ে কবে তার পাত্রপক্ষের খবর দিতে মাসির বাড়ি যায়, সে জানে না।
সে সাইকেলে বড়ো মাসির বাড়ি রওনা হলেই টিটকারি, কী রে ঝুমি মাসির বাড়ি যাচ্ছিস?
সে সাড়া দেয় না।
কী রে ঝুমি কোনও খবর বুঝি এসেছে!
সে সাড়া দেয় না।
সাইকেল চালিয়ে যায় ঠিক, সবাই জানে সে মাসির বাড়ি যাচ্ছে পাত্রপক্ষের খবর দিতে।
দিদা বোঝেই না, একটা মেয়ের পক্ষে এটা কত অসম্মানের কথা! লজ্জার কথা।
সে সাইকেলে উড়ে যেতে থাকলেই টের পায়, দিদা খবর দিয়ে বেড়াচ্ছে।
ও ঠানদি ঝুমি কোথায়!
আর কোথায় রে ভাই। পাত্রপক্ষের একটা খবর পেলাম। ওর মাসি-মেসোকে খবর দিতে বললাম। সেখানে গেছে। আমার আর কে আছে, যাবে। তার তখন শুধু কান্না পায়। সাইকেলে সে যায় ঠিক, তবে সে গোপনে কাঁদেও। আজ তার কী যে মনে হল, সে কিছুতেই খবরটা দেবে না ঠিক করল। দিদার মাথা খারাপ হতে পারে, তার তো মাথা খারাপ হয়নি।
কিছুটা রাস্তা গিয়ে মনে হল, না গেলে অথর্ব শরীর নিয়েই বুড়ি হাঁটা দেবে। সে আর কী করে। মাসি-মেসোকে খবর দিয়ে সোজা চলে এল। বড়ো মাসি গেল, মেসো গেল পাত্রপক্ষের বাড়ি। তারাও ঝুমিকে দেখে গেল।
খুবই পছন্দ।
তার কিছু ভালো লাগে না। সে যে কী করে!
চিঠিটাও লেখা হয়ে গেল। ইনল্যান্ডে ইনিয়ে বিনিয়ে দিদা বড়ো মামাকে লিখেছে, এটা আমার শেষ কাজ বাবা। অমত করিস না। চিঠিটাও ঝুমিকে ডাকবাক্সে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। ক্ষোভে দুঃখে তার চোখে জল এসে যায়।
চিঠিটা পেলেই মামির মুখ গোমড়া হয়ে যাবে। চিঠিটা পড়লেই ক্ষেপে যাবে মামি। মামা বেচারা মুখ গোমড়া করে বসে থাকবে। কিছু বলতে পারবে না।
গাছপালার ছায়া পার হয়ে অন্তহীন এক পথ চলে গেছে মনে হল তার। চিঠিটা দুবার বের করল ব্লাউজের ফাঁক থেকে। মনটা তার ভার হয়ে আছে। মামিমা ঠিকই টের পাবে, চিঠি ঝুমিই ডাকবাক্সে ফেলেছে। এত বেহায়া মেয়ে—ভাবতেই পারে। তার জন্য দিদা খাটো হয়ে যাবে। সে চিঠিটা দেখল। চারপাশে তাকাল। খালি মাঠ। স্কুল ছুটি। অদূরেই আছে ডাকবাক্স। ফেলার আগে কেন যে মনে হল, এ চিঠি মরে গেলেও ডাকবাক্সে ফেলতে পারবে না। দিদার করুণ মুখখানিও ভেসে উঠল। চিঠিটা ছিঁড়ে হাওয়ায় উড়িয়ে দিতেই তার সমস্ত ভার যেন লাঘব হয়ে গেল।
