জল সে দেয়নি। তার মাথা গরম। পাগল ছাগল বা যা পাওয়া যায়। ভেবেছে কী! সে গুম হয়ে বলেছিল কিছুক্ষণ। তারপর বলেছিল, জল নিয়ে খাও। কে বলেছিল যেতে।
ঝুমির সঙ্গে পাত্রপক্ষের কথাবার্তায় বিরজা সুন্দরী কখনও মাথা গরম করেন। অনেক সময় ঝুমির সামনে পাত্রপক্ষের কথা তুলতেও আতঙ্ক বোধ করেন। কত যে সম্বন্ধ এল। ঝুমি সামান্য প্রতিবন্ধী। একটু খুঁড়িয়ে হাঁটার স্বভাব। বিরজা সুন্দরী আর কী খুঁত আছে বোঝেন না। লোক আসে, দেখেও যায়, কী সুন্দর চোখ ঝুমির। হাতে পায়ে লাবণ্য ঝরে পড়ছে। সেই ঝুমি এক গ্লাস জল না দিলে যে পাপ হবে, তাও বোঝে না। বিরজা সন্দরী সব সয়ে গিয়ে, নিজেই জল ভরে খেয়েছিলেন। ঢকঢক করে জল খেয়ে বলেছিলেন, মাথাখান তার তো ঠিকই আছে দেখলাম। আমার সঙ্গে কী সুন্দর কথা বলল। মাথার দোষ সেরে গেছে। একটাই দাবি—আইন পাস করলে বিয়ে।
ঝুমি চৌকাঠে হেলান দিয়ে শুনছিল। ঘরে একখানা হ্যারিকেন জ্বলছে। দাওয়ায় কুকুরটা শুয়ে আছে। চালাঘরটায় একটা কুপি জ্বলছে। বাড়িটা অন্ধকারে ডুবেছিল। তারকের মার গলা পাওয়া যাচ্ছে। দিদার খবর নিতে এসে সেও বসে গেছে। ঠিক, বুড়ি পাত্রের খবর নিতে যাওয়ার সময় সাত কাহন করে সবাইকে বলে গেছে। সম্বন্ধ এলেই বুড়ির যেন বেশি দুটো হাত-পা গজায়।
তারকের মা এক মুখ জর্দা মুখে পান চিবাচ্ছিল। আর চর চর কথা বলছিল।
কথা হল!
হল রে মা! আমার হলে তো হবে না। ওর মেসো মামারা দেখুব বলে কথা, সাত মণ ঘি না পুড়লে হয়!
কোনো দাবি দাওয়া!
দাবি দাওয়া আর কী করবে? বললাম, মা মরা মেয়েটাকে উদ্ধার করেন। ঝুমি আমার শরীর দিয়ে পুষিয়ে দেবে।
থামবে! চেঁচিয়ে উঠেছিল ঝুমি।
শরীর দিয়ে পুষিয়ে দেবে কথাটা কত অশ্লীল, দিদা বোঝেন না। ঝুমার জ্বালা ধরে যায়। তারকের মা সবিধের নয়, সম্বন্ধ না হলে কেচ্ছা ছড়াবে। দিদা কেন যে বোঝেন না। তার ঘর থেকে বের হয়ে যেতে ইচ্ছে হচ্ছিল। কোথায়ই বা যাবে। মদনদা বউকে নিয়ে বেথুয়াডহরি গেছে। দুই মামির বাড়ি জমি পার হলে। ইলেট্রিকের লাইট এয়েছে এই গরিমাতেই মামিদের পা পড়ে না মাটিতে। সেজমামি টিভি কিনেছে, আগে সন্ধ্যা হলেই ছুটে যেত। এখন আর তার তাও যেতে ইচ্ছে করে না।
তুই ঝুমি ফোঁস মনসা—কোনও কথা বলা যায়! কথায় তোর এত বিষ, ওঝার খোঁজে আছি, আসুক, বিষ কী করে নামাতে হয় তখন টের পাবি।
সে উঠে পড়েছিল। উঠোনে কাঁঠালগাছ, তার ছায়ায় একা দাঁড়িয়ে ছিল কিছুক্ষণ।
তুই আবার কেথায় গেলি! আলো নিয়ে উঠোনে বের হয়ে এসেছিলেন বিরজা সুন্দরী। তারকের মাও বের হয়ে এসেছে। তারকের মা বলল, যা ঘরে যা। অশান্তি করিস না। খোঁজখবর না নিয়ে তো আর কথা পাকা হচ্ছে না।
ছেলে কী করে কাকিমা?
বিরজা সুন্দরী বললেন, কিছু করে না। আইন পড়তে চায়। একটাই দাবি কলকাতায় রেখে আইন পড়াতে হবে। তা আমার খোকাকে লিখলেই হবে। দুটো তো বছর, দেখতে দেখতে কেটে যাবে। আইনটা পাস করিয়ে দিতে লিখব। থোকা আমার কথা ফেলতে পারবে না।
তারকের মা সব খবরই নিয়ে চলে গেল। মাঝে মাথা খারাপ ছিল। এখন ভালো আছে। সুস্থ আছে। বি. এ. পাস। ঝুমি কিছু পাস না করা মেয়ে, বি, এ, পাস ছেলে পাওয়া কত কঠিন, তাও স্বীকার করে চলে গেল!
দেখুন মেয়েটার ভাগ্য যদি খোলে। নিয়তি বলে কথা। উঠোনে দাঁড়িয়েই বিরজা সুন্দরী আর তারকের মার কথা হচ্ছিল। ঝুমি ঘরে ঢুকে, ঠাকুরের ফটো থেকে ফুল বেলপাতা সরিয়ে সিল্কের কাপড় দিয়ে তারকেশ্বরের ফটো ঢেকে দিল। এই কাজগুলি করলে মনে সে শান্তি পায়। জ্বালা থাকে না। কে কী বলছে শুনতেও তার ভালো লাগে না। রাতে সামান্য ভাত করে নিলেই হয়। দিদা দুধ রুটি খান। সে চালাঘরটায় ঢুকে আটা মাখতে বসে গেল।
বিরজা সুন্দরী তারকের মাকে কিছুটা রাস্তা এগিয়ে দিতে গেছেন। কুকুরটা দিদার পিছু নিয়েছে। সে একা। পাটকাঠি জ্বেলে খড়কুটো আখায় ঢুকিয়ে দু-হাঁটুর মাঝে মুখ গুঁজে দিয়েছিল।
বিরজা সুন্দরী ঢুকতেই সে টের পেল, দিদার কথা শেষ হয়নি। নিজে নিজেই বকছেন। বয়স হলে এই বুঝি হয়। সারাদিন প্যাচাল ছাড়া থাকতে পারেন না। তা রাজি হয়ে এলাম। বলে এলাম, আমার বড়ো পুত্র খুবই বিবেচক মানুষ, মার কথা ফেলতে পারবে না। আপনার ছেলে আমাদেরও ছেলে। একটা চিঠি লিখতে হবে, তোর মেসোকে দিয়ে। বুঝলি ঝুমি, সকালে তোর বড়ো মাসিকে খবর দিবি। ওরা দুজনে যেন চলে আসে। তোর সেজমামাকেও আসতে বলবি। সবাই পরামর্শ করে একখানা চিঠি লেখা দরকার। আমার বড়ো পুত্রের কোনও অভাব আছে! ঠাকুর চাকর, মেলা ঘর। দোতলার একখানা ঘর না হয় ছেড়ে দেবে। দুটো তো বছর। বুঝিয়ে লিখলে ও মাথা পাবে। ওর তো এক কথা, সব করব মা, কিন্তু পণ দেব না। আরে বাবা, পণ ছাড়া বিয়ে হয়! পণ না দিলে মেয়ের ইজ্জত থাকে—তা তুই তোর কথাও রাখ, মার কথাও রাখ। পণ চায়নি, আইন পড়তে চেয়েছে। পরের ছেলেকে পড়ালে পুণ্য হয়। খোকা নিজেও তো পরের বাড়িতে মানুষ। তোর রাঙাকাকা না নিয়ে গেলে, তোর রবরবা থাকত কোথায়! পরের ছেলে লোকে মানুষ করে না! ঝুমির ভবিষ্যৎ বুঝবি না।
ঝুমি কোনও কথা বলেনি। যায় কথা ফুরিয়ে যাওয়ার কথা, তারই এখন কত রাজ্যের কথা। সকালে ঘুম থেকে উঠেই শুরু হয়েছে, সকালে উঠে সাইকেলটা অধরের দোকানে নিয়ে যাবি। পানচার ঠিক করে নিবি। আমার হাতের কাজ এগিয়ে চলে যাবি মেসোর কাছে। থেকে যাস না আবার। বড়ো মাসির কী! বোঝে, আমার কষ্ট বোঝে। আদর করে পাঁচ পদ খাওয়ালে, এটা ওটা দিয়ে ভরে রাখলেই কী শরীর বোঝে!
