কাজল দিদির হয়ে নালিশ জানাবার সময় বলল, মা আমরা আর জন্মে যেন কাগজকুড়ানির মেয়ে হয়ে না জন্মাই। মা আমরা যেন আর জন্মে দুধেভাতে থাকি। আমাদের মা-বাবাকে দ্যাখো। মা বৃষ্টি দাও। গাছপালা মানুষজন সব পুড়ে যাচ্ছে মা। গাছপালা সব জলে ভিজিয়ে দাও। জল না থাকলে যে প্রাণ বাঁচে না মা। পাখি প্রজাপতিরা জল না পেলে মরে যাবে মা।
বল কাজল, তোর দিদির যেন সুন্দর একটা বর হয়। পরিবার পরিজন নিয়ে যেন সুখে ডালভাত খেতে পায়।
শিল্পা যা যা বর চাইল, কাজল তার হয়ে সব বর মেপে নিল দেবীর কাছে।
তারকবাবু অবাক। শিল্পা নিজে কিছু চাইছে না—কাজলকে দিয়ে বলাচ্ছে। তিনি প্রায় যমদূতের মতো কাছে গিয়ে দাঁড়ালেন। তাদের আশ্বস্ত করে বলেন, কী রে শিল্পা কাজলকে দিয়ে দেবীর কাছে বলাচ্ছিস, তুই নিজে বলতে পারছিস না।
শিল্পা কেঁদে ফেলল, আমিও ভালো না বাবু, আমি লুভি, পেটুকে, খালপাড়ের বাবু আছে না, গৌরাঙ্গদা, সে বাদাম ছোলা খাইয়ে শরীরে আমার কি খুঁজে বেড়াত–আমি বাবু আরাম পেতাম। দেবী কেন আমাকে বর দেবেন—আমি অশুচি না! আমি বর চাইলে দেবী রাগ করবে। ঠাকুর-দেবতা ছাড়া আমাদের যে কেউ নেই বাবু।
ঝুমির দুঃখ
সকালবেলায় যে কী হয়, কিছুতেই ঘুম থেকে উঠতে চায় না ঝুমি। বিরক্ত বিরজা সুন্দরী। গজগজ শুরু সক্কালবেলাতেই।
নে ঝুমি। যত পারিস ঘুমিয়ে নে। বেলা কত হল টের পাস না। জীবনেও পাবি না। দ্যাখ তোর কপালে কী লেখা আছে। সোমও মেয়ে, ঘুম তোর ভাঙে না। কবে ভাঙবে। আমি মরলে!
ঝুমি লেপ-কাঁথায় মুখ ঢেকে পড়ে আছে। বুড়ির চোপা শুরু হয়ে গেছে। সে কিছুতেই সাড়া দেবে না। চেঁচাক, চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় করুক তবু সাড়া দেবে না।
বিরজা সুন্দরী সাতসকালে উঠে কে কী করছে, সে চোখ বুজেও টের পায়। আকাশ পরিষ্কার না হতেই উঠে পড়ার অভ্যাস। এক সঙ্গে এক তক্তপোশে শোয়। কাক ডেকে গেলেই, দুগগা দুগগা শুরু হয়ে যায়। উত্তুরে হাওয়ায় দরজা খুললেই ঠান্ডায় টাল মেরে যায় ঘরটা। দরজা খুলে কখন বের হয়েছেন তাও সে জানে। উঠোনে নেমে হাত জোড় করে সূর্যপ্রণাম। তারপর ঘটি নিয়ে কলতলায়। তারপর একখানা বালতিতে গোবর জল। সারা বাড়ি গোবর ছড়া। ঘর থেকে এঁটো বাসন কলতলায় নিয়ে যাওয়ার সময় একবার ডেকে গেছেন, ঝুমি ওঠ। হাত মুখ ধো। তোর মেশোর বাড়ি যেতে হবে। গোছগাছ করে না দিয়ে গেলে এক হাতে পারি। সে সাড়া দেয়নি।
চালাঘরটা গোবর জলে লেপে দেওয়ার সময় আবার ডেকেছে, কত বেলা হল। একটু চা করে আমাকে দে! তুই খা। সাইকেলটা মেরামত না করলে যাবি কী করে। অধরকে বলেছি, ঝুমির সাইকেলটা পাচার হয়ে গেছে। মেরামত করে দিস, খোকার টাকা এলে দিয়ে দেব। ও ঝুমি, কী বলছি, কানে কী যাচ্ছে তোর!
ঝুমি সারা দেয়নি।
সে বলতে পারত, এত সকালে উঠে কী করবটা শুনি। রোজ একই কথা কাঁহাতক ভালো লাগে। কিছুই করতে দেবে না। হাত-পা নোংরা হবে। শরীরে গোবরের গন্ধ লেগে থাকবে। সকালবেলায় জল ঘাঁটাঘাঁটি করলে হাতে, পায়ে হাজা হবে। পাত্রপক্ষ দেখতে এলে পছন্দ হবে না।
ঝুমির তখন মরে যেতে ইচ্ছে হবে। পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে শুনলেই তার মাথা গরম হয়ে যায়। কাল রাত থেকেই পাত্রপক্ষর আসা শুরু হয়েছে। সকালে উঠতে হবে। বড়ো মাসিকে খবর দিতে হবে। কত কথা বুড়ির পারব না। তার এক কথা।
তোর ঘাড় পারবে। পারবে না। ঘরের খুঁটি হয়ে থাকতে চান। বলবি, কৃপানাথ খোঁজ দিয়েছে পাত্রের। লেবুতলায় বাড়ি। পাত্রের বাজারে চালের দোকান আছে। একটু বয়স বেশি, দোজবর। তাতে কী কিছু কমতি থাকে পুরুষ মানুষের?
আমি কোথাও যেতে পারব না। খুঁটি হয়ে থাকি আর বাঁশ হয়ে থাকি, পারব না।
এত ভালো পাত্র হাতের কাছে কোথায় পাব। কৃপানাথ বলেছে ঝুমি মাথা। পাতলে হয়ে যাবে।
দিদা, তুমি চুপ করবে।
আমি চুপ করব কেন। কী খারাপ কথা বলছি। পাত্র কী খারাপ কথা!
আবার পাত্রপক্ষ চেঁচিয়ে দ্যাখ কী হয়।
বিরজা সুন্দরী ঘাবড়ে গিয়ে বলেছিলেন, পাত্রপক্ষ বললে তোর এত মাথা গরম করবার কী আছে বুঝি না। চেষ্টা তো কম করছি না। কাকে না ধরেছি। কেউ মাথা পাতে। তোর মামারা তো হাত ধুয়ে বসে আছে। বাপের খবর নিতে গেলে গোপের বাগে যেতে হয়। কে যায়। তার কী মাথায় আছে, মা মরা মেয়েটার হিল্লে করা দরকার। সে কী মানুষ! মরেছি, কী বেঁচে আছি তারও খবর নেয় না।
ঝুমি চুপচাপ চা না খেয়ে বের হয়ে যেতে পারে। মদনের বউর ঘরে গিয়ে বসে থাকতে পারে, কথায় কথায় খাওয়ার ওপর এত রাগ যে, দিদা তখন জলে পড়ে যায়। সে গুম মেরে গেলে তাকে বেশি ঘাঁটায় না।
এই সেদিন ফের আর এক নতুন পাত্রপক্ষ হাজির। সাঁজবেলায় কোথা থেকে হন্তদন্ত হয়ে ফিরে এসেই বলেছিলেন, ছেলেটার সঙ্গে তোর যদি হয় রাজযোটক হবে। বি এ পাস। কিছুদিন মাথা খারাপ ছিল। কেবল বসে বসে কাগজ ছিড়ত। থুতু ছিটাত। খুব মেধা। বি এ পাস সোজা কথা। পড়তে পড়তে মাথা খারাপ। শহরে কোঠাবাড়ি আছে। টাকাপয়সা বাপ যা রেখে গেছে তোদের চলে যাবে। ছেলেটি দেখতেও বেশ। লম্বা দশাসই চেহারা। তোর সঙ্গে মানাবে ভালো। তারপর কেন যে বলেছিলেন, এক গ্লাস জল দে। এতটা রাস্তা, হেঁটে কী আসা যায়! রিকশাওয়ালারা সব নবাব। এটুকু রাস্তা বলে কী পাঁচ টাকার কমে হবে না দিদিমা। তোদের মুণ্ডু, দ্যাখ বুড়ি পারে কী না। হাঁটতে হাঁটতে চলে এলাম। কৃপানাথ নিয়ে গেছিল—শহরে কাজ আছে বলে সঙ্গে ফিরতে পারেনি।
